• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
আমরা কবে মানুষ হবো

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

আমরা কবে মানুষ হবো

  • হারুন-আর-রশিদ
  • প্রকাশিত ১৪ মে ২০১৯

দেশে আজ অসৎকর্ম বেগবান; অপরদিকে সৎকর্ম শ্লথ। এ মুহূর্তে একটি বৃহৎ প্লাটফর্মের মাধ্যমে সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরিতে সবার ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা উচিত। সেই প্লাটফর্মের কাজ হবে জাতিকে নৈতিক মোটিভেশন দেওয়া। নারী ও শিশুর ওপর বলাৎকার শ্লীলতাহানি— অবশেষে আগুনে পুড়িয়ে না ফেরার দেশে পাঠিয়ে দেওয়া। সাগর-রুনি, তনু, মিতু এবং হালের রাফিকে পৈশাচিক পদ্ধতিতে পুড়িয়ে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। যারা এসব খুনে জড়িত, তারা মানুষ নয়— পশুর চেয়েও অধম। প্রথম তিনটির বিচার হয়নি, রাফি খুনের বিচার আলোর মুখ দেখবে কি-না সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে জাতির কাছে। গোল্ডেন বা ডিজিটাল বাংলাদেশের এমন কুৎসিত চেহারা দেশের ভাবমূর্তিকে তলানিতে নিয়ে গেছে। নারী ও শিশুদের দেহ নিয়ে এখন শুধু ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজ জড়িত নয়। বিদ্যাপীঠের নামিদামি শিক্ষকরাও জড়িত। প্রতিদিন পত্রিকার লিড নিউজ হয়ে এসব খবর বের হচ্ছে। সমাজ সুস্থ পথে হাঁটছে না অসুস্থ পথে হাঁটছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশে সচেতন মানুষের চরম দুর্ভিক্ষ চলছে। কারণ তাদের মুখে প্রতিবাদের ভাষা নেই। পবিত্র কোরআন শরিফে আছে, নারী ও শিশুর শ্লীলতাহানিরা জাহান্নামের বাসিন্দা। বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ, যেখানে ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান, তাদের ধর্ম ইসলাম। ইসলাম অর্থ শান্তি। কিন্তু বাংলাদেশে দেখছি অশান্তি। এতদিন জানতাম আগুনে বাড়িঘর পোড়ে। এখন দেখছি অগণিত মানুষ আগুনে পুড়ে না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছে। পত্রিকায় এসেছে পরীক্ষার প্রশ্ন ও নোটবই দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় এক বছর আগে থেকেই নুসরাত জাহান রাফিকে কুপ্রস্তাব দিয়েছিলেন মাদরাসার অধ্যক্ষ এম এম সিরাজ-উদ-দৌলা। সেই প্রলোভনে সাড়া না দেওয়ায় রাফির আজ এই পরিণতি। মাদরাসার অধ্যক্ষ অন্য মেয়েদেরও উত্ত্যক্ত করতেন।

যৌন হয়রানি বাংলাদেশে এখন নিত্যদিনের চলমান ঘটনা। আমরা কেন বুঝতে পারছি না যে, আমাদের অপকর্মই আমাদের অবক্ষয়। নৈতিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করার জন্য ১০ মিনিট সময় ব্যয় করার মতো কি সচেতন মানুষের অভাব পড়েছে দেশে! নিজ নিজ ধর্মের আদর্শের নীতি-মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম সম্পর্কে জাতিকে অনুপ্রাণিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বাংলাদেশ হেরে যাবে। ১৭ এপ্রিল ২০১৯ এ ধরনের একটি খবরে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে সাত দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়। এরপর তার চুল কেটে গালে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের এ ঘটনা রেকর্ড করা হয় মোবাইলে। এ কাহিনী প্রকাশ না করতে দেওয়া হয় হুমকি। ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রামের সদরঘাটে। একই তারিখে ফটিকছড়িতে ঘটে আরেকটি ঘটনা। গভীর রাতে ঘরে ঢুকে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ছুরির আঘাতে হত্যা করা হয়। সারা দেশে চলা আন্দোলন প্রতিবাদের মধ্যে কমছে না ধর্ষণ, যৌন হয়রানির মতো ঘটনা। কুলাউড়ায় এক যুবতীকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে গণধর্ষণ করেছে ৭ দুষ্কৃতিকারী। ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ভিডিও রেকর্ড করে পুনরায় ডাকে। না এলে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়ক শিক্ষকের বিচার দাবিতে আন্দোলন চলছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচারের দাবিতে পঞ্চম দিনেও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। দুই শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় গত ৮ এপ্রিল থেকে শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত শিক্ষক মো. আক্কাস আলীকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে নামে। গাজীপুরে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ছুরিকাঘাতে এক কলেজ ছাত্রীকে হত্যা করেছে এক বখাটে। এ ছিল আরেক বর্বরতা। গত ১৭ এপ্রিল বুধবার ওই ছাত্রী পরীক্ষা দিয়ে কলেজ থেকে বাসায় ফিরছিল। সে সময় প্রকাশ্য দুপুরে কোনাবাড়ী কাঁচাবাজারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। তার মৃত্যুতে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। ১৯ এপ্রিল ২০১৯ প্রায় প্রতিটি দৈনিকে খবর হয়েছে সামাজিক অপরাধের প্রবণতা নিয়ে। তিন শিশু ধর্ষিত, শিক্ষক বরখাস্ত, থানা ঘেরাও। নোয়াখালীর সেনবাগে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। এ ছাড়া নরসিংদীর বেলাবোতে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। রংপুরেও এক শিশু ধর্ষিত হয়েছে। ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী বড়বাড়ী এমএইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বরখাস্ত হয়েছেন। গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে কলেজছাত্রী হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে।

দেশে এখন ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করেছে। নাটোরের সিংড়ার বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলে গণিত শিক্ষক ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে সত্যতা মিলেছে। সিরাজগঞ্জে নিজ ঘরে মা-মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। হরেক অপরাধের ভয়ঙ্কর চক্র যা ফেসবুক পরিচয় থেকে ঘটছে। মহিলারাও পুরুষকে জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ভয়ঙ্কর চক্রের সন্ধান পেয়েছে র্যাব। স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে কমল হোসেন। স্ত্রী হাসি বেগমের সঙ্গে প্রথম স্বামীর যোগাযোগ এবং দুবাই যাওয়ার চেষ্টা— সেই ক্ষোভ থেকেই স্বামী কমল তার স্ত্রী হাসিকে হত্যার পরিকল্পনা করে। উল্লেখ্য, হাসি ও কমলের উভয়েরই এটা দ্বিতীয় বিয়ে। ধর্ষণ ও খুন নিয়ে একদিনের ঘটনার বৃত্তান্ত ছাপিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন ১৯ এপ্রিল ২০১৯। এরকম ভয়াবহ সংবাদ অন্যান্য পত্রিকায়ও প্রতিদিনই আসছে। কিন্তু বিচারহীনতার কারণে সামাজিক অপরাধ কমছে না বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন।

২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে মারা গেছে ২৭১টি শিশু। ২০১৮ সালে কেবল ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৩৩টি শিশু। ২৮ এপ্রিল ২০১৯ রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ২০১৮ সালে পুরুষ শিক্ষকের হাতে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১২৯ জন। এদের মধ্যে ১৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়। বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, ২ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ধর্ষণের শিকার ৪৭ জনের মধ্যে ৩৯টি মেয়েশিশু রয়েছে। বিভিন্ন কারণে খুন করা হয়েছে ৫ শিশুকে। সংস্থাটি বলছে, বিচারহীনতার কারণে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে।

শিশু ধর্ষণ বাংলাদেশেই মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। এটা পুরো জাতি ও দেশের জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ দেশের একশ্রেণির দলীয় বুদ্ধিজীবী এখন পর্যন্ত পথে নামেননি অথচ তারা সেমিনারে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বলেন। এসব কেন হচ্ছে, কাদের প্রশ্রয়ে-আশ্রয়ে ঘটছে, তা তারা জানার আগ্রহও প্রকাশ করেন না, তাদের বিবেক কি অনুশোচনায় দগ্ধ হয় না! মত ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে এর প্রতিকার করা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। এ দেশের কন্যাশিশুরা জাহেলিয়াতের যুগের শিকার কেন হবে? এ প্রশ্ন আজ গোটা দেশবাসীর।

সহিংসতা, ফেসবুকের অবাধ নস্টালিজম, আকাশ সংস্কৃতির দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদি অপসংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে এবং নৈতিক বিকৃতি এখন চরম আকার ধারণ করেছে। কথায় আছে— রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট প্রজা কষ্ট পায়। এটা তো রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকদের দেখা প্রয়োজন বলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানও বলেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, রাষ্ট্র বিচারহীনতার কারণে এগুলো জ্যামিতিক পদ্ধতিতে বেড়েই চলেছে। দেশে বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল যেভাবে বাড়ছে— ঠিক একইভাবে ধর্ষিত নারী ও মেয়েশিশুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। সমকামিতার জন্য নূহ (আ.) এবং লুত (আ.)-এর সময়ের মানুষগুলোর ওপর বন্যা ও প্লাবন-খরা-অগ্নি-বৃষ্টি দিয়ে ওই জাতিকে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল। ওগুলো ছিলো সৃষ্টিকর্তার গজব। আমাদের দেশে প্রতিদিন আগুন যেভাবে ঘরবাড়ি, অফিস ও মার্কেটে ছড়িয়ে পড়েছে এবং মালামাল ভস্মীভূত হওয়াসহ বহু মানুষ নিহত হচ্ছে— এগুলোও আল্লাহর গজব। পাপে জর্জরিত হলে এরকম গজব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়তই আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকি। পবিত্র কোরআনেও এসবের উল্লেখ আছে। সুতরাং জাতিকে সুষ্ঠু পথে পরিচালিত করা সরকারসহ প্রতিটি বিবেকবান মানুষেরই উচিত। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে এখন নৈতিক শিক্ষার বড় প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারসহ সমাজের বিবেকবান মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। সবকিছু শেষ হওয়ার আগে আপনাদের বিবেককে জাগ্রত করুন।

 

লেখক : সমাজ বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads