• রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩১ ভাদ্র ১৪২৫
ads
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

  • ইমানুল সোহান
  • প্রকাশিত ২৬ মে ২০১৯

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে রণসজ্জা শুরু করেছেন। ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধপ্রস্তুতিই এর প্রমাণ। বিভিন্ন সময় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময় যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। তবে এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন উপায়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

সম্প্রতি আমেরিকা তার বিমানবাহিনী রণতরী ইউএস আব্রাহামকে পারস্য উপসাগরে পাঠায়। সেটি মিসরের সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ইরানের উদ্দেশে চলে গেছে বলে জানিয়েছে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে কাতার ও ইউনাইটেড আরব আমিরাতের মার্কিন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে পরমাণু অস্ত্রবাহী বিমান বি-৫২। মূলত আমেরিকার এই দুই সামরিক পরিকল্পনার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে চরম উত্তেজনা। তবে চুপ নেই ইরানও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌফ্লিটকে ধ্বংস করে দেওয়া যাবে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কার্যক্রমে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।

যদি তা-ই হয়, তাহলে অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় ইরান শক্তিধর কয়েকটি দেশের সরাসরি সহযোগিতা পাবে। তার মধ্যে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভূমিকা থাকবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এশিয়ার অর্থনীতি সচল রাখতে ইরান বড় ভূমিকা পালন করে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে রাশিয়া ও চীন। ফলে শক্তিধর এই চার দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। আর সেই কাজটি তুরস্ক ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে শুরু করেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সকল ঘাঁটি যুদ্ধের জন্য ব্যবহারের চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পুরোপুরিভাবে সেই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে ব্যর্থ হবে তারা। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ও আরবীয় কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাবে আমেরিকা। তার মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রাষ্ট্রে (ইসরাইল, মিসর, লেবানন, কাতার, ওমান, কুয়েত, জর্ডান, ইরাক ও ইয়েমেন) থাকা ঘাঁটি সরাসরি ব্যবহার করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আমেরিকা কোনো রকম সহযোগিতা পাবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ হলে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসরাইল।

যে কারণে আপাতত যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার প্যালোসির কথায় আরো প্রমাণিত, তারা এখনই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ লিপ্ত হতে চান না। তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে যে কোনো ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চাই।’  কিন্তু ভবিষ্যৎ যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে আমেরিকা পিছপা হচ্ছে না এটি খুব পরিষ্কার। তবে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের লড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান থাকবে।  আমরা জানি, ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পরমাণু শক্তিধর পাঁচ দেশের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান। চুক্তির ফলে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা কমে যায়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি থেকে সরে আসায়। গত বছর চুক্তি থেকে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসঙ্গে ট্রাম্প সরকার ইরানের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিশেষ করে তেলের বাজার সংকুচিত করতে সচেষ্ট হয় যুক্তরাষ্ট। তবে সেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র তেমন সফল হতে পারেনি। এদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিয়ে রেখেছে। ইরানের তেল রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্র বাধা হয়ে দাঁড়ালে তারাও কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। মূলত হরমুজ প্রণালী দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ তেলবাহী জাহাজ ইউরোপ ও আমেরিকায় যায়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়েই এগুচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে গত ৮ মে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেছেন, ইরান এই চুক্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে না গেলেও চুক্তির কিছু শর্ত তারা আর মানবে না। কিন্তু গত বছরের ৮ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়। অন্যদিকে ইরান এই চুক্তি থেকে খানিকটা সরে এলেও পুরোপুরি আসেনি। তবে ইরান বিশ্ব শক্তিগুলোকে হুমকি দিয়ে রেখেছে। ইরান ঘোষণা দিয়েছে, বিশ্ব শক্তিগুলো ৬০ দিনের মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে ইরানের অর্থনীতি রক্ষা না করলে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথে যাবে। পরমাণু চুক্তি অনুযায়ী কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনের কথা ছিল ইরানের। এক্ষেত্রে সীমা ধরা হয়েছিল ৩০০ কেজি। এ ছাড়া ইরানকে ১৩০ টনের মতো ভারী পানির মজুত রাখার সুযোগ দেয় চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলো। তবে এই চুক্তি অমান্য করা শুরু করেছে ইরানও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এই সিদ্ধান্ত যুদ্ধের আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমরা সবাই আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সামরিক কিংবা পরমাণু শক্তি সম্পর্কে অবহিত। শক্তির বিচারে নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকে। তবে কিছু কৌশলগত কারণে ইরানের শক্তিকে সমীহ করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। প্রায় আট লক্ষাধিক রিজার্ভ সেনার দেশ ইরান। যার মধ্যে ‘কুদুস’ নামে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক সেনা সার্বক্ষণিক ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তাহলে ইরান সব অবস্থাতেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকে। ‘কুদুস’ বাহিনীর মূল শক্তি হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র। এ ছাড়া সাবমেরিন ক্ষমতা, দ্রুতগতির সামরিক স্পিডবোটসহ ইরানের আছে শক্তিশালী নৌশক্তি। সবমিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিক ও মাঠের যুদ্ধে দুই দেশের সক্ষমতা প্রায় কাছাকাছি। তবে বিশ্ববাসী আর যুদ্ধের দামামা চায় না।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads