• সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১১ ভাদ্র ১৪২৫
ads
অর্থনীতির দুটি সূচক এবং বাংলাদেশ

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

অর্থনীতির দুটি সূচক এবং বাংলাদেশ

  • শাহ আহমদ রেজা
  • প্রকাশিত ৩০ মে ২০১৯

বোরো ধানকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে আরো একবার প্রাধান্যে এসেছে জাতীয় অর্থনীতি। শুরুতেই বলা দরকার, অর্থনীতির কোনো খাতের সূচকই আশাবাদের সৃষ্টি করতে পারেনি। মূল্যস্ফীতির কথাই ধরা যাক। বাজারদর স্থিতিশীল রয়েছে বলে প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম যেমন বেড়ে চলেছে তেমনি বাড়ছে মূল্যস্ফীতিও। শুধু তা-ই নয়, মূল্যস্ফীতির দিক থেকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের পর বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানেও পৌঁছে গেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০১৮ সালে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান জানিয়েছে, ২০১৮ সালের শেষে দেশের মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৯ সালের শুরু থেকেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলেছে এবং চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে কিন্তু মূল্যস্ফীতি অনেক কম হয়েছে। ২০১৮ সালে ভারতের মূল্যস্ফীতির হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ ভারত মূল্যস্ফীতি কঠোরভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির খবর অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। কারণ, অর্থনীতির নিয়ম ও ব্যাখ্যার মূলকথা হলো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকার অঙ্কে পণ্য ও পণ্যসেবার মূল্য বেড়ে গেলে তাকেই মূল্যস্ফীতি বলা হয়। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশে পণ্যের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আগে ১০০ টাকায় যে পণ্য কেনা যেত সেটাই এখন ১০৫ দশমিক ৫৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। উদ্বেগের কারণ হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপই এখনো নিতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে যায়। এতে বেশি বিপদে পড়ে বিশেষ করে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষরা। নাভিশ্বাস ওঠে মধ্যবিত্ত হিসেবে পরিচিতদের— লজ্জায় যারা নিজেদের অক্ষমতা ও দুরবস্থার কথা বলতেও পারেন না।

বলা দরকার, প্রসঙ্গক্রমে পাকিস্তানের উদাহরণ দেখিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর ওঠানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ, ভারতের শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের উদাহরণও বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। শ্রীলঙ্কার কথাই ধরা যাক। ২০১৮ সালে সার্কের এই সদস্য রাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার ছিল এক শতাংশেরও অনেক নিচে— মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানও বাংলাদেশকে লজ্জায় ফেলেছে। কারণ ২০১৮ সালে মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এ ধরনের বৃদ্ধিকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া চলে না।

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে উদ্বেগের কারণ আসলে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলা। কারণ ২০১৮ সালের শেষদিকেও যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সেখানে ২০১৯ সালের মার্চশেষে পৌঁছেছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এভাবে বাড়তে থাকলে জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তিই শুধু বাড়বে না, একই সঙ্গে সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে সমালোচনাও বাড়তে থাকবে। জাতীয় অর্থনীতি তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। সে কারণে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী বলিষ্ঠ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভারতের পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তানও যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কমিয়ে আনতে পারে তাহলে বাংলাদেশেও সেটা সহজেই সম্ভব হওয়া উচিত। এজন্য দরকার শুধু সুষ্ঠু পরিকল্পনার এবং সরকারের সদিচ্ছার।

জাতীয় অর্থনীতির দ্বিতীয় প্রধান বিষয় হিসেবে সম্প্রতি আবারো বেকারত্ব নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, দেশে শিক্ষিতসহ বেকারের সংখ্যা যখন লাখের অঙ্কে বেড়ে চলেছে তেমন এক সময়ে বিভিন্ন কোম্পানিতে শুরু হয়েছে ঢালাও ছাঁটাই। প্রকাশিত রিপোর্টে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি ছাঁটাই কার্যক্রমের পেছনে বিভিন্ন কোম্পানির যুক্তিরও উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো বলেছে, তাদের মুনাফা তথা আয় কমে যাচ্ছে অস্বাভাবিক হারে। যেমন একটি কেব্লস কোম্পানি জানিয়েছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটি যেখানে ১১৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা আয় বা মুনাফা করেছিল, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থাৎ প্রথম তিন প্রান্তিকে সেখানে আয় হয়েছে মাত্র ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর ফলে এক বছরের ব্যবধানেই কোম্পানিটির আয় বা মুনাফা কমেছে ৭৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।

অন্যসব দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির অবস্থাও প্রায় একই রকম। এসবের মধ্যে বেশি বিস্ময়ের কারণ ঘটিয়েছে ‘রমরমা’ বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠা বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানিগুলো। এসব কোম্পানির পাশাপাশি ব্যাংক-বীমাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও ছাঁটাই কার্যক্রম চলছে পাল্লা দিয়ে। দেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই করা হচ্ছে বিশেষ একটি বীমা কোম্পানিতে। কোম্পানিটি ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট একটি গ্রুপের মালিকানায় যাওয়ার পর গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। শুধু ছাঁটাইয়ের জন্য নয়, অভিযোগ উঠেছে অনৈতিকভাবে ঢালাও ছাঁটাই করার কারণেও। ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়ায় বীমা কোম্পানিটি শ্রম আইন লঙ্ঘন করেছে এবং কাউকেই আগে নোটিষ দিয়ে জানায়নি।

প্রায় সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানতে পেরেছেন অফিসে ঢুকতে যাওয়ার সময়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন তাদের আঙুলের ছাপ গ্রহণ করেনি। ফলে তারা অফিসেও ঢুকতে পারেননি। পরে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, তাদের চাকরি নেই। অর্থাৎ বিনা নোটিশে তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। জানা গেছে, ওই বীমা কোম্পানির মালিক পক্ষ নাকি লোকসানের যুক্তি দেখাচ্ছেন। অথচ বিশেষ গ্রুপটির মালিকানায় যাওয়ার আগে পর্যন্ত বীমা কোম্পানিটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল।

এভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বিচারে ছাঁটাই কার্যক্রম চালানোর ফলে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার মানুষ। একযোগে ভিড় বাড়ছে বেকার তথা চাকরিপ্রত্যাশীদের বাজারে। বিআইডিএস ও সিপিডিসহ অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের জরিপ রিপোর্টের ভিত্তিতে জানিয়েছে, বেকারের সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় চাকরির সুযোগ যেমন বাড়ছে না তেমনি চাকরিও পাচ্ছে না বেকাররা। বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি আইআইটিএম জানিয়েছে, দুই বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে তাদের মাধ্যমে নিয়োগ কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে চাকরিপ্রত্যাশীদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে অবিশ্বাস্য হারে।

অন্য বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও এ ধরনের পরিসংখ্যানের সত্যতা পাওয়া গেছে। যেমন রাষ্ট্রীয় গবেষণা সংস্থা বিবিএস— বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, দেশের প্রতি তিনজন যুবকের মধ্যে একজন বেকার। ওদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আইটলুক—২০১৮’ শীর্ষক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আইএলও’র একই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে কেবল পাকিস্তান। 

এভাবে বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট ও পরিসংখ্যানের উল্লেখে যাওয়ার পরিবর্তে এক কথায় বলা যায়, উন্নয়নের বিচারে বাস্তবে দেশ এখনো পেছনেই পড়ে আছে। বেকারত্ব সম্পর্কিত বিভিন্ন সংস্থার তথ্য-পরিসংখ্যানই এর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। অর্থনীতিবিদ ও তথ্যাভিজ্ঞরা এমন অবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে বিনিয়োগ না বাড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, বিশেষ করে শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে বিনিয়োগের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে বলেই চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা শুধু বেড়েই চলছে না, তাদের মিছিলও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সিপিডি’র হিসাবে দেশের শ্রম বাজারে প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে প্রায় আট লাখ বেকার— যাদের মধ্যে শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উদ্বেগের কারণ হলো, দেশে যেখানে চাকরিই পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো নতুন কাউকে চাকরি দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো ঢালাওভাবে ছাঁটাই কার্যক্রমকে জোরদার করেছে। হাজার হাজার চাকরিজীবীকে নীরবে ছাঁটাই করা হচ্ছে। প্রায়  কোনো ক্ষেত্রেই শ্রম আইন পর্যন্ত মানা হচ্ছে না।

বর্তমানে চলমান এই ছাঁটাই কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচিত ছাঁটাই বন্ধ করার জন্য কোম্পানিগুলোকে চাপ দেওয়া। প্রয়োজনে ছাঁটাই বন্ধ করতে বাধ্য করা। সরকারকে একই সঙ্গে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করার ব্যাপারেও সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ব্যাপারে বিশেষ করে বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট ও উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কথাটা বলার কারণ, নিকট অতীতেও দেখা গেছে, শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য জমি কেনা ও তার রেজিস্ট্রেশন করা থেকে গ্যাস-পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে প্রধানত ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসা বহু শিল্প উদ্যোক্তা মাঝপথে থেমে পড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেকে এমনকি ভারত ও ইন্দোনেশিয়াসহ আশপাশের অন্য দেশগুলোতে গিয়ে বিনিয়োগ করেছেন।

বাস্তব এ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বলা দরকার, জাতীয় অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক এ অবস্থার শুধু অবসান তো ঘটালে চলবে না, পাশাপাশি এমন পরিবেশও সৃষ্টি করতে হবে, বিদেশিরা যাতে আস্থার সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। সব মিলিয়ে শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে দেশে একদিকে শিল্পায়ন যেমন ঘটবে অন্যদিকে তেমনি বেকার সমস্যারও সমাধান হবে অনেকাংশে। সে লক্ষ্যেই সরকারের উচিত দ্রুত উদ্যোগী হয়ে ওঠা।

 

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads