• বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৫
ads
বিএনপি কি নেতৃত্ব লিজ দেবে

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

বিএনপি কি নেতৃত্ব লিজ দেবে

  • মহিউদ্দিন খান মোহন
  • প্রকাশিত ০১ জুন ২০১৯

প্রশ্ন উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি কী তার নেতৃত্ব লিজ দেবে? অতিসম্প্রতি এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.)অলি আহমেদের একটি উক্তি জনমনে এ প্রশ্নের উদ্রেক হওয়ার কারণ। বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, নেতৃত্ব দিতে না পারলে তা ছেড়ে দিন। এরপরই বিষয়টি সর্বত্র মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদা বিএনপিকে কবর দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণাকারী কর্নেল অলি আহমেদ যখন সেই দলেরই নেতৃত্ব দিতে অতিশয় আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তখন এর নেপথ্য কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। 

সে আলোচনায় যাওয়ার আগে বিএনপির বর্তমান অবস্থা একটু বিবেচনায় আনা দরকার। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ যাবত সবচেয়ে বিপদসংকুল সময় পার করছে বিএনপি। চেয়ারপারসন কারাগারে, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আদালতের দণ্ড মাথায় নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। দেশে যেসব সিনিয়র নেতা আছেন, তারা দলটিকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না। সর্বত্র একটি অগোছালোভাব। সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছে দলটির প্রতিটি স্তরে। প্রতিনিয়ত ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিএনপিকে ঠেলে দিচ্ছে জটিলতার আবর্তে। চেয়ারপারসন কারারুদ্ধ পনেরো মাস পার হয়ে গেছে। তাকে মুক্ত করার বিষয়ে দলটি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এ পর্যন্ত নিতে পারেনি। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একজন নেতার দৈনিক রুটিন মাফিক প্রেস ব্রিফিং, জাতীয় প্রেস ক্লাবের রাস্তায় মানববন্ধন আর চার দেয়ালের ভেতরে ‘প্রতিবাদ সমাবেশ’ ছাড়া দলটির নেতারা আর কিছুই করতে পারেননি। যে সভা-সমাবেশগুলো তারা করেন, তাতে নেতারা বেশ জোর গলায়ই বেগম জিয়াকে মুক্ত করে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করে থাকেন। কেউ কেউ তো নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারের ইট একটি একটি করে খুলে খালেদা জিয়াকে বের করে আনার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। তাদের এসব বায়বীয় আস্ফাালন যে বেগম জিয়ার মুক্তির ক্ষেত্রে কোনো কাজেই আসেনি বা আসবে না তা বলাই বাহুল্য। ‘আইনি লড়াইয়ে তাকে মুক্ত করা যাবে না’— বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের এ প্রকাশ্য ঘোষণার পর নেতাকর্মীদের মনে হতাশার মেঘ আরো জমাট বেঁধেছে। আইনি লড়াই পরিত্যাগ করলে বাকি থাকে আন্দোলন। কিন্তু সে আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো নমুনা বিএনপি নেতৃত্ব এ পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। তারা একদিনের জন্যও একটি হরতাল ডাকেননি, একটি বড় সমাবেশের আয়োজন করেননি। অজুহাত হিসেবে তারা ‘সরকার সমাবেশের অনুমতি দেয় না’, ‘রাস্তায় নামতে দেয় না’ ইত্যাদি বলে থাকেন। কিন্তু তারা সরকারের অনুমতির তোয়াক্কা না করে একবারো কি মাঠে নামার চেষ্টা করেছেন? কোনো নেতা কি গেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা অন্যত্র সমাবেশস্থল দখলে নেওয়ার জন্য? না, তেমন কোনো নজির তারা স্থাপন করতে পারেননি।

দলটির এ ভগ্নদশার মধ্যেই কর্নেল অলি আহমেদের দরদী সেজে আবির্ভূত হওয়া তাই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই অলি আহমেদের এ বক্তব্যকে দেখছেন ভিন্ন চোখে। কেননা, মাত্র বারো-তেরো বছর আগে এই কর্নেল অলি বিএনপি এবং এর শীর্ষ নেত্রী সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতেন তা অনেকেরই স্মরণে আছে। কর্নেল অলি আহমেদ বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নের একজন নেতা সন্দেহ নেই। কিন্তু ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা জারির আগে-পরে তিনি কোন ভূমিকায় ছিলেন তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে তিনি যে অত্যন্ত বাজে ধারণা পোষণ করতেন তা তার সে সময়কার বক্তব্য-বিবৃতিতে স্পষ্ট। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, তার সে সময়ের বিখ্যাত উক্তি- ‘অনেকে বলে মা ভালো, ছেলে খারাপ। আমি বলি দুটোই বদমাশ।’ ২০০৬ সালের নভেম্বর কি ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় এক সমাবেশে বক্তৃতা করতে গিয়ে অলি বলেছিলেন, ‘বিএনপি আমরাই তৈরি করেছিলাম, আমরাই তার কবর দিব। এই চট্টগ্রাম থেকেই বিএনপির কবর রচনা শুরু হলো।’ এসব বক্তব্য এখনো অনেকের কানে বাজে। তো সেই কর্নেল অলি যখন বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে— কেসটা কী? এটা তো সত্যি যে, বিএনপিকে এক হাত দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বি. চৌধুরীর সঙ্গে মিলে এলডিপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। মাত্র ছয় মাসের মাথায় তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। নবগঠিত এলডিপির দুই টুকরো বগলদাবা করে রাজনীতির দুই মহারথী যে যার পথে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। তারপর থেকে অলি সাহেব এলডিপির ভগ্নাংশ নিয়ে দেশের রাজনীতির ময়দানে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন। তবে হালে তেমন পানি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আবারো ফিরে গেছেন বিএনপিরই দ্বারে। একদিন ‘বদমাশ’ বলে যাকে গালি দিয়েছিলেন, সেই বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব অবনত মস্তকে পুনরায় মেনে নিতে এতটুকু কুণ্ঠিত হননি তিনি। কারণ তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, তার এলডিপি নিয়ে এদেশের রাজনৈতিক ময়দানে কখনোই পাত্তা মিলবে না। তাই বিএনপিই ছিল তার সামনে একমাত্র বিকল্প। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর এবং সহসা তার মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা না যাওয়ায় অলি সাহেব বোধকরি হতাশ। তিনি এটাও বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছেন, বিএনপি এখন বিশাল নেতৃত্ব শূন্যতায় পতিত। এ সুযোগে যদি দলটির নেতৃত্ব হাতিয়ে নেওয়া যায় মন্দ কী?

এখানে বিএনপি নেতাদের অদূরদর্শিতার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মূলত দলটি যেদিন নেতাকর্মীহীন রাজনৈতিক দল গণফোরামের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে, সেদিন থেকেই দলটি সম্পর্কে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা বদ্ধমূল হতে শুরু করে। ঐক্যের নামে বিএনপির নীতিনির্ধারণী সব দায়িত্ব ও ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয় ড. কামাল হোসেনের হাতে; যা নেতৃত্ব লিজ দেওয়ারই নামান্তর। একদা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যে দলের প্রার্থীর কাছে প্রায় কোটি ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছিলেন ড. কামাল, সে দল পরিচালনার স্টিয়ারিং হাতে পেয়ে তার ভেতরে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা আমরা জানি না, জানার কথাও নয়। তবে নগদ লাভকে বড় করে না দেখে যারা বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি লাভ-ক্ষতিকে বিবেচনায় রাখেন, তারা তখনই বলেছিলেন এর মাধ্যমে দলটি তার স্বকীয়তা হারাতে পারে। সে সময় এই কলামেই আমি মন্তব্য করেছিলাম- জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া বিএনপির জন্য ‘জেনেশুনে বিষ পান’ করার শামিল। হয়েছেও তা-ই। ঐক্যফ্রন্টের ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে বিএনপি তার নিজস্বতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। স্মর্তব্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি স্বনামে অংশ নিতে পারেনি, তাদের ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে পরিচিত হতে হয়েছে। এসব কারণে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হলেও তাদের করার কিছুই ছিল না। শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের অতি আগ্রহ দলটিকে ঐক্যফ্রন্টের অনুগত অনুগামী হতে বাধ্য করেছিল।

বিএনপির যারা নীতিনির্ধারক, তারা এখন কী করছেন এটি একটি প্রশ্ন। চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে তাদের যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলটির হাল ধরার কথা তা দেখা যায়নি। বরং পরস্পর সন্দেহ-অবিশ্বাস, নেতৃত্বের কোন্দল, দলের মধ্যে কোটারি সৃষ্টি করে আধিপত্য বিস্তার, শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্যে একে অপরের সমালোচনা ইত্যাদি কারণে দলটিতে এখন চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে দলটি একাদশ জাতীয় সংসদে যোগদানকে কেন্দ্র করে। নির্বাচনের পর ভোট কারচুপি, রাতের অন্ধকারে ব্যালটবাক্স ভরা ইত্যাদি অভিযোগে ফলাফল প্রত্যখ্যান করে নির্বাচিতরা শপথ নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সে সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত স্থির থাকতে পারেনি দলটি। দল থেকে নির্বাচিত সবাই শপথ নিলেন, শুধু মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া। বলা হলো, দলীয় সিদ্ধান্ত ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশেই তারা শপথ নিয়েছেন। কিন্তু এক যাত্রায় দুই ফলের মতো মহাসচিব কেন শপথ নিলেন না, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। বলা হলো, এটাও দলীয় সিদ্ধান্ত। একই ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী দুটি সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক দল নিতে পারে এর আগে এমন নজির পাওয়া যায় না। তবে জনমনে যে গুঞ্জনটি তীব্র হয়ে উঠেছে তাহলো— মহাসচিব মির্জা আলমগীর কি কারো ঈর্ষার শিকার হলেন?

এই সরকার ও সংসদকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করে বিএনপি ঘোষণা করেছিল এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। এমনকি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, এমন প্রায় দুইশ স্থানীয় নেতাকে দলটি বহিষ্কার করেছে। অথচ তারাই আবার ভাগে পাওয়া একমাত্র মহিলা সংসদ সদস্যের আসনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এমন স্ববিরোধী ও অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত কারা নিচ্ছে?  এসব সিদ্ধান্তে দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন যে একমত নন তা পরিষ্কার হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে অন্যদের সঙ্গে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকেও প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কারাগারে মনোনয়ন ফরম পাঠানো হয়েছিল তার স্বাক্ষরের জন্য। কিন্তু সখেদে সে ফরম ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। বলেছেন, আমি এ নির্বাচনে অংশ নেব না। যারা অংশ নিতে চায়, তাদেরকে বলো সই করতে। এ থেকে এটা পরিষ্কার যে, বিএনপিতে চেয়ারপারসনের নির্দেশের বাতাবরণে যেসব সিদ্ধান্তের কথা প্রচার করা হয়, তার বেশিরভাগই ভিত্তিহীন। ‘বাঘের নাম দিয়ে শিয়ালে গরু খাওয়ার’ মতো ঘটনা এক্ষেত্রে ঘটছে কি-না, সে সন্দেহ করছেন অনেকে। দলের ভেতরে একটি গ্রুপ চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নামে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে দলের ভেতরেই। লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কী নির্দেশনা দেন, সাধারণ নেতাকর্মীদের তা জানার উপায় নেই। কেননা তার বক্তব্য বাংলাদেশে প্রচার-প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমতাবস্থায় দলের সক্রিয় একটি অংশ নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে লন্ডনের রাবার স্ট্যাম্প ব্যবহার করছে কি-না, সে প্রশ্ন উঠেছে।

মোদ্দা কথা হলো, বিএনপি বর্তমানে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। যে সময়ে দলটির নেতাদের অধিকতর ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার, সে সময়ে নেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভক্তি। এমন অবস্থায় কর্নেল অলিদের মতো সুযোগসন্ধানীরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করতে চাইবে তাতে আর বিচিত্র কী!

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads