• শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
এরাও নাগরিক, সুনজর দিন

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

নেশায় বুঁদ পথশিশুরা

এরাও নাগরিক, সুনজর দিন

  • প্রকাশিত ০২ জুলাই ২০১৯

রাজধানীর পথে হাঁটলেই চোখে পড়বে ছেঁড়া-ময়লা পোশাক পরা, উশকো-খুশকো চুল, ছিন্ন মলিন চেহারায় দলবেঁধে হই-হল্লা করছে শিশুরা। এই শিশুরাই সারা পৃথিবীর ১২০ মিলিয়ন পথশিশুর একটি অংশ। যারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দলবেঁধে ‘ড্যান্ডি’ ও গাঁজার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। এদের বেশির ভাগেরই ছন্নছাড়া জীবন। তাদের পরিবার নেই। অনেকেই পরিবার থেকে পালিয়ে অথবা পারিবারিক অভাব-অনটন বা কলহের কারণে পালিয়ে এসেছে। কেউ কেউ চরাঞ্চল, নদীভাঙন, বন্যা কিংবা সাইক্লোন-ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহারা হয়ে পরিবারসহ কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসে পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য পথশিশুদের দলে যোগ দেয়। এদের বড় অংশ শহরে এসে ঠাঁই নেয় শহরের বস্তিগুলোতে। জীবন-জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামা এই বিপুলসংখ্যক শিশুর মৌলিক অধিকারের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অথচ এরাও দেশের নাগরিক। নাগরিক অধিকারগুলো তাদের বেলায়ও সমান প্রযোজ্য। পথশিশুদের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ২০১৬ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রামের (সিপ) প্রতিবেদনে বলা হয়, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশ শিশুর ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন গোসলহীন থাকে, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই ও ৭৫ শতাংশ শিশু অসুস্থতায় ডাক্তারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারে না।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পথশিশুদের একটা বড় অংশ রাজধানী ঢাকার পিচঢালা পথের দুষ্টচক্রে বাধা পড়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে, একটি দেশ যখন উন্নত দেশের স্বপ্ন-সোপানে এগিয়ে যাচ্ছে। যখন নগরজুড়ে চলছে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ, তখন একই শহরে ভূত-ভবিষ্যৎহীন এই পথশিশুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ যেন দেখার নেই। চরম দারিদ্র্যের শিকার পরিবারের শিশুরাই অনিশ্চয়তার কারণে পথে নেমে আসে। আর পথে নেমে মাদকের নীল নেশায় অন্ধকারের পথে হারিয়ে যাচ্ছে এই শিশুরা। চোরাচালান ও মাদক বিক্রিসহ সমাজবিরোধী বিভিন্ন কার্যকলাপে পথশিশুরা ব্যবহূত হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। কখনো ভিক্ষা করে, কখনো বাজারে বোঝা বহন করে, ঠেলাগাড়ি চালিয়ে টাকা রোজগার করে। অভাবে পড়লে চুরিও করে। আর সে টাকায় দলবেঁধে নেশা করে ও ঘুরে বেড়ায়। কখনো লোকচক্ষুর সামনে, কখনো আড়ালে-আবডালে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে তারা। এভাবেই পথে বসে, দাঁড়িয়ে, হেঁটে হেঁটে প্রকাশ্যে পলিথিনের ভেতরে নেশাদ্রব্য রেখে শ্বাস টেনে নেশা করছে। পথশিশুদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায়  দেখা যায়, ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকে। এদের মধ্যে ২৯ শতাংশ শিশু স্থান পরিবর্তন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কারণে। আর ৩৩ শতাংশ পাহারাদারের কারণে। এসব শিশু অভাব ও দারিদ্র্যের কারণে খোলা আকাশের নিচে ঘুমানোর পরও তাদের ৫৬ শতাংশ শিশুকে মাসিক ১৫০  থেকে ২০০ টাকা নৈশপ্রহরী ও মাস্তানদের দিতে হয়। তার মানে এদের নিয়েও চলে একধরনের বাণিজ্য। সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে পথশিশু ছিল প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১১ লাখে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালের মধ্যে পথশিশুর সংখ্যা ১৬ লাখেরও বেশি দাঁড়াতে পারে। তার মানে এই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর অপরাধ ও নেশাগ্রস্ততার কোনো সমাধান নেই! 

পথশিশুরা সাধারণত গাঁজা, ড্যান্ডি, পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে ও পেট্রোল শুঁকে নেশা করে। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এসব শিশুর কল্যাণে কোনো নীতিমালা নেই। সরকার ঘোষিত ভিশন ২০৪১ অর্জন করতে হলে এখনই এসব শিশুর কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি করে এদের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads