• বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯, ৯ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
মানব পাচারের দায় আমাদেরই

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

মানব পাচারের দায় আমাদেরই

  • সোহাগ মনি
  • প্রকাশিত ০৭ জুলাই ২০১৯

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ। এ দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী, উন্নত জীবনের বিলাস বাসনা থেকেই যায় মানুষ হিসেবে, একটু ভালোভাবে বাঁচা, একটু ভালো থাকা, কিংবা বিলাসিতা আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে সব সময়। কোনো ধরনের সুযোগ পেলেই আমরা তা লুফে নিতে চাই, চোখ বুজে। এটা অবশ্য আমাদের দুর্বলতার একটি দিক, মানব পাচারের ক্ষেত্রে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসি, কিংবা আমাদের আশপাশের মানুষগুলো থেকেও সমর্থন পাওয়া যায় খুব সহজে। জীবনযাত্রার মান যেখানে যত কম, জীবনের মূল্যও সেখানে তত কম, জীবনের মূল্যকে আমরা নিজেরাই সস্তা পণ্যে রূপান্তর করি।

মানব পাচার বা মানুষ পাচার! ভাবা যায়, মানুষ হয়ে মানুষকে পাচার করা! পৃথিবীতে আর অন্য কোনো প্রাণী হয়তো তাদের স্বজাতিকে পাচার হতে দেয় না। যেটা আমরা মানবজাতি হয়েও করে থাকি। আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই পাচারের কথা শুনতে হয়। ওপরের কথাগুলো একটা মানসিক বোধ এবং অনুধাবনের ব্যাপার। এই অনুধাবন যতদিন আমাদের হবে না, কিংবা যারা পাচার করে তাদের মস্তিষ্কে ঢুকবে না, ততদিন হয়তো মানব পাচার হতেই থাকবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, আমাদের বোধের জায়গাটি। মানব পাচারের দিকটিতে কোনো পরিসংখ্যানে যাব না। কারণ পৃথিবীতে একটি মানুষও যদি পাচার হয়, তবে তা পুরো মানবজাতির জন্যই কলঙ্কের ব্যাপার। আমাদের দেশের হর্তা-কর্তাদেরও এদিকটি বুঝতে হবে। না হয় নিজেরাই কবে পাচার হয়ে যাই, তার কোনো ঠিকানাই হয়তো থাকবে না।

যতই দেশে মানব পাচারের আইন হোক না কেন, তাতে মানব পাচার রোধ হবে না, বরং নতুন নতুন পন্থা বের করব আমরা নিজেরাই। সবার আগে আমাদের অনুধাবন করতে হবে জীবন সম্পর্কে। ভৌগোলিক পরিসীমা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে-ঠিক কোন দিক দিয়ে কোন দেশের সীমান্ত পার হওয়া যায়। এতে করে ওই এলাকা সম্পর্কে অন্তত আমাদের জানা হবে কিছুটা, এত সহজে পাচারকারীর ফাঁদে আটক না-ও হতে পারি। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের বিশেষ করে সীমান্ত এলাকার মানুষদের সতর্ক অবস্থানে রাখতে কিন্তু আমাদের খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না, শুধু তাদের জীবনবোধ গড়ে তোলা এবং একটু সচেতনতাই পারে, অনেক বড় ক্ষতির সম্মুখীন থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।

মানব পাচার নতুন কোনো বিষয় নয়। আমরা এর পরিণতিও জানি। এরপরও বারবার দুর্ঘটনার স্বীকার হচ্ছে হাজারো মানুষ। এখানে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এর থেকে কোনো শিক্ষা আমরা নিচ্ছি না। আমার মতে, মানব পাচারের সবচেয়ে বড় দায় পাচারকারীর নয়, বরং যে পাচার হয় তার। কেননা জেনে, বুঝে, শুনে জীবনের ঝুঁকি নেওয়ারই বা কী দরকার! উন্নত জীবনের স্বপ্নই আমাদের অবনতির মূল কারণ। মানুষকে আমরা মানুষ ভাবতে পারছি না, পণ্যে রূপান্তর করছি। আর এ মানব পাচারে সবচেয়ে বড় দায়ী, খুব উঁচু পর্যায়ের মনুষ্যত্বহীন দানব। আর কত প্রাণ যাবে, তার হিসাবটা করতে পারছি না, তবে আমাদের চিন্তা-চেতনার দিকটি যতদিন পরিবর্তন না হবে, তত দিন চলতে থাকবে মানব পাচার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা যতদিন উন্নত না হচ্ছে, তত দিন আমাদের বিলাসবহুল জীবনের ভাবনা থাকবেই। আর এ ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ঝুঁকির প্রবণতা। খেসারত দিতে হয় পরিবারকে, বিপর্যয় নেমে আসে জনজীবনে। রাষ্ট্রকে নাগরিকদের নিয়ে ভাবতে হবে। প্রতিটি প্রেক্ষাপট আর প্রতিটি মানুষ নিয়ে। যারা হবে জনসম্পদ, তারা হচ্ছে পাচার, এতে যে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছি আমরা।

সাগরে ডুবে মরার জন্য জন্ম হয়নি, বিদেশের নোংরা ডাস্টবিনে ময়লা হয়ে পড়ে থাকার জন্যও জন্ম হয়নি এ দেশের একটি মানুষের। সবার জন্মই হয়েছে সুন্দর জীবনের তরেই, তবে কেন জীবনের এ বলি দান!  জীবন যদি জীবনের জন্য হয়, মানুষ যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে আমরা সবাই সবার জন্য, তবে কেন এ মরণ দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে! প্রশ্নটা প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কাছেই রেখে যেতে চাই। সমাজ আর সভ্যতার বিবর্তনে আমরা মানুষকেই পাচার করতে শুরু করেছি। পুঁজিবাদীর জাঁতাকল আমাদের এতই পৃষ্ঠ করেছে যে, তা কি অনুধাবনে ব্যর্থ হচ্ছি দিন দিন।

হোমো সেপিয়েন্স অর্থাৎ মানবজাতি। সেপিয়েন্স অনেক প্রজাতিরই ছিল পৃথিবীতে, কিন্তু আজ অবধি টিকে আছে শুধু এই হোমো সেপিয়েন্স, পৃথিবীর ভয়ংকর প্রাণীদের পরাজিত করতে পেরেছে এই হোমো সেপিয়েন্সরাই। অন্য প্রাণীগুলো মনে করত, এই প্রজাতির তো কোনো ধারাল দাঁত কিংবা নখ নেই, তারা তো সহজে পরাজিত হওয়ার কথা, কিন্তু তারাই বিস্তার করছে রাজত্ব! আর এটা সম্ভব হয়েছিল শুধু হোমো সেপিয়েন্সদের একতা বলে, স্বপ্রজাতির প্রতি ভালোবাসার ফলেই, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পেরেছে হোমো সেপিয়েন্সরা। পৃথিবীর রাজত্ব আজ মানবদের হাতেই। কিন্তু সেই মানব প্রজাতি হয়ে, আমরা আজ নিজেরাই নিজেদের প্রতি হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছি, নিজেদের অস্তিত্বকে নিজেরাই বিলোপ করছি, অন্য প্রাণীরা হয়তো হাসাহাসি করছে আমাদের এমন স্বজাতি নিধন দেখে!  এই দিকগুলোকে আমাদের সামনে আনা উচিত। মানবজাতি হয়তো আমাদের বিদ্বেষের কারণেই একসময় হারিয়ে যাবে।

নিজেদের অবস্থান থেকে, যেভাবে পারি মানব পাচারকে ঠেকাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। লোভনীয় কোনো ধরনের প্রস্তাব পেলেই যাতে মানুষ সেবা নিতে পারে, সরকারের কোনো দপ্তর থেকে এবং সরকারি দপ্তর থেকে তা ভালো-মন্দ যাচাইয়ের পর মানুষ যাতে সিন্ধান্ত নিতে পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। না হয় লাশ হয়ে দেশে ফেরা মানুষের সংখ্যা আরো বাড়বে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads