• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads

সম্পাদকীয়

শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়নের বাজেট কতটা সহায়ক

  • প্রকাশিত ০৮ জুলাই ২০১৯

জাহাঙ্গীর হোসেন

 

বাজেট হলে সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুখ-দুঃখের বাজেট প্রণয়ন হয় যায়। এতে করে কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ! আবার কিছু ক্ষেত্রে উপহাস কিংবা অতিহাস্য বরাদ্দ কিছু খাতে দেখা যায়, যা লেখায় নিয়ে আসার চেষ্টা করব। দৃশ্যত বছরে ২৫-৩০টি খাত ধরে বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন হচ্ছে। শুরুতে অবশ্য কয়েকটি খাত কম ছিল। বরাবরের মতো এবারো বাজেটে কিছু খাতকে এক ধরনের ঘুষ দেওয়া হচ্ছে- জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার মতো এসব খাত। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার একাট্টা উপলক্ষ এসব। এ সবই ধনীদের জন্য উপঢৌকন- প্রশাসন তো আছেই। মোটকথা তোষণ-শোষণই আতিশয্য মনে হচ্ছে। এবারের বাজেট ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার। বাজেটে আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা।  ঘাটতি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। মূলত দৃশ্যপট অবিকলই রয়েছে। মোটাদাগে কোনো হেরফের নেই। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আপেক্ষিক অর্থে যাদের ভাবা হয়, তাদের পুষ্ট করতে এরকম বাজেট ফানুস মনে করারই নামান্তর। বাজেটে পুরোদমে উপেক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান বিষয়টি। নির্বাক হওয়াই যথাযথ মনে হচ্ছে। এবারের বাজেটে শিল্প, বিনোদন, সংস্কৃতি খাতও অবহেলিত। বন্ধ করা কলকারখানা চালু করার নির্দেশনা অনুপস্থিত। বিনোদন ও সংস্কৃতি খাতও নির্জনে আছে। বরাদ্দ ৫৭৫ কোটি টাকা মাত্র। যার ০.১ শতাংশের অনেক কম। শিল্প খাতে ০.৭%। খেলাধুলাকে আরো উৎসাহিত করা উচিত। ক্রিকেটই বিশ্বে আমাদের মর্যাদার বাতিঘর। ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলকে আরো এগিয়ে নিতে হবে। এসব নিয়ে আসব শিক্ষা খাত নিয়ে আলোচনার পর।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সন্তোষজনক বরাদ্দ হয়েছে। তবে ইউনেস্কোর সুপারিশ বাজেটের ২০% শিক্ষা খাতে বরাদ্দের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা মানা হচ্ছে না। ২০% বরাদ্দ দিলে লক্ষ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু বরাদ্দ রয়েছে অনেক কম। যা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জিডিপির প্রায় তিন শতাংশের কিছু বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৪.৩৯%। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক ১৪.৬% নির্ধারণ হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে সংশোধিত বাজেট প্রস্তাবে যা ছিল তা-ই অর্থাৎ ১৫.২%।

বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দের বিষয়টির ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টি একটু ভিন্ন ধরনের। শিক্ষার ভেতরকার পরিবেশ সৃষ্টির দিকে না তাকিয়ে সরকারের উপরভাসা যারপরান ভাব। যেমন অবকাঠামোগত উনয়ন, সেটিও প্রয়োজন। তবে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি প্রণোদনা, বিনা বেতন ও আধুনিক উপকরণ ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ আরো বাড়ানো উচিত। বে-সরকারি শিক্ষকদের চলন-বলন গরিবী মাপের। স্বল্প বেতনে দৈনন্দিন খরচ নির্বাহ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে বিএড ছাড়া একজন শিক্ষক চাকরিতে প্রবেশ করলে, বর্তমানে পান প্রায় ১৩ হাজার টাকা। বিএডসহ সর্বসাকুল্যে ১৬ হাজার ৮০০  টাকা। টাইম স্কেলপ্রাপ্তরা সর্বসাকুল্যে পান ২২  হাজার টাকা। স্ত্রী-সন্তান ও বাড়ি ভাড়াসহ ১৫ দিন চলা কঠিন। পিতা-মাতা ভাই-বোন তো আছেই। অনটনে থেকে জীবিকা নির্বাহ করে পাঠদান করা কতটুকু শিক্ষা বাস্তবায়ন হবে, সেটাই বলাবাহুল্য। বেসরকারি পর্যায়ের মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ। নতুন যুক্ত হচ্ছে ৫০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। এ স্তরে শিক্ষার ৯৮% বেসরকারি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হয়। বেসরকারি শিক্ষকদের অনটনে রেখে পাঠ চুকানো অসম্ভব। গণমাধ্যমে দেওয়া বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, বাংলাদেশের চেয়ে শিক্ষা খাতে বেশি ব্যয় করে জিডিপির নেপালে ৫.১৫% ও মালদ্বীপে ৪.২৫%। আর ফ্রান্সে ব্যয় হয় জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে বরাদ্দ জিডিপির তিন শতাংশের বেশি, যা নেপাল, মালদ্বীপ ও ফ্রান্সের চেয়ে কম। বাজেটে শিক্ষা খাতকে আরো উৎসাহিত করা দরকার। নন-এমপিওভুক্ত ৩ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও করা নতুন সংযোজন। তাও মরণপণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দাবি আদায় হয়েছে, সরকারের সদিচ্ছায় নয়।

মাত্র ৪-৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেই মাধ্যমিক স্তর সরকারি করা করা যেত। এ টাকার সিংহভাগই উঠে আসত প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদকে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে। এখানে সরকারের সুদৃষ্টি নিবন্ধন জরুরি। বাজেটে আর ১% বৃদ্ধি করলেই হতো। আবার এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে মৃদু প্রতারণা করা হয়েছে। অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের নামে নির্বাচনের আগে ৫% দিয়ে অতিরিক্ত ৪% কর্তন করা হয়েছে। মোট ১০ শতাংশ কর্তন করা হচ্ছে। সরকার রমজান শুরুর আগে এমন একটা পদক্ষেপ নিল শিক্ষকরা যাতে কোনো আন্দোলন করতে না পারে। এর ফলে প্রতি দশ মাস পর শিক্ষক-কর্মচারীর এক মাসের বেতন কেটে নেওয়া হচ্ছে। স্বল্প আয়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এভাবে বিপদে ফেলে দেওয়া মোটেও কাম্য নয়। তাই শিক্ষকদের আর্থিক জীবনমান উন্নয়নের জন্য সরকারের বিশেষ বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল। এবার আসা যাক যুবকদের পুনর্বাসনের বিষয়টি নিয়ে। আড়াই কোটি শিক্ষিত যুবক সব মিলিয়ে সাড়ে তিন কোটি বেকার যুবক। তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ মাত্র ১০০ কোটি টাকা। বাজেটের ০.২%। তাও আবার ১০ বছর মেয়াদি, যা বাজেটের ০.০০২%। তিন কোটি যুবককে পুনর্বাসন করবে এ টাকা দিয়ে! প্রতি যুবকের ভাগে পড়েছে ১০ বছরে ২৯ টাকা। যারা উৎপাদন বৃদ্ধি করবে, যারা হবে মূল উৎপাদক, যারা সভ্যতা নির্মাণ করবে, যারা হবে নির্মাতা, যারা অবকাঠামো নির্মাণ করবে এবং যারা সব প্রতিকূলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে- তারাই অবহেলিত ও উপহাসের দোলনায় দোলায়িত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি একটি অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ। যুবকদের নাভিশ্বাস নিবৃত্ত করতে এবং প্রতিটি পরিবারকে হতাশা থেকে বাঁচাতে বাজেটের অন্তত ৫% পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত ছিল। যুবকরাই দেশের প্রবৃদ্ধি আরো বৃদ্ধি করে দিত।

যুবকরা হতাশ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।  যদি এ বছর ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা যুবকদের খাতে বরাদ্দ করলে অন্তত ১০ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান হয়ে যেত। দেখা যেত ২০৩০ সাল পর্যন্ত বেকার খুঁজে পাওয়া যেত না। নিজ ভূমি ছেড়ে টগবগে যুবক এবং মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমাতো না। মেধা পাচার হতো না। তাই সরকারের উচিত যুবকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দটি বিশেষভাবে দেখা এবং প্রতিটি উপজেলায় বেকার নিবন্ধন কেন্দ্র খোলা এবং বেকারদের বেকারভাতা প্রচলন শুরু করা। চাকরির বাজার যেহেতু শূন্যতায়,  যুবকদের স্বস্তিও শূন্যতায়। তাই যুবক উদাসীন হয়ে পড়ায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্বিষহ পরিস্থিতি আরো পেয়ে বসেছে। এদেশের সব আছে- পরিশ্রমী যুবক, আদর্শ মাটি-পানি, আদর্শ জলবায়ু এবং যুবদের দুর্দমনীয় সাহস। এই বাংলার মানুষ সংস্কৃতিপ্রেমী, যা পুরাতত্ত্বের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। এসব লিপিবদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে সংস্কৃতি ও সভ্যতা। আমরা  ৯৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আপাতত পাতাল ট্রেন চাই না। আমরা কাজ চাই। কাজ করে দুটো ভাত খেতে চাই, লজ্জা নিবারণ করতে চাই। পাশাপাশি সাধারণ জনগণ, যারা ষাটোর্ধ্ব বয়সের, তাদের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের মতো পেনশনে আনতে চাই। সব অভাব-অনটন, হতাশা, বিষাদ, লৌকিক মতবাদ পাতালে নিয়ে যেতে চাই। এ পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই মোক্ষম সময়।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads