• মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৫
ads
পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু কথা

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু কথা

  • মাছুম বিল্লাহ
  • প্রকাশিত ০৯ জুলাই ২০১৯

শিক্ষা একটি জাতির মৌলিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন যতটুকু সহজলভ্য হয়েছে, ঠিক ততখানি দুর্লভ হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে। আর তার বড় কারণ উচ্চ ব্যয়ভার বহন করার সামর্থ্য থাকে না আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর। বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয় মেটানো এক ধরনের দুঃসাধ্যই বটে। উপরন্তু বিতর্ক রয়েছে এগুলোর পরিচালনা পদ্ধতি ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদান বিষয় নিয়ে। আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ব্যবধান। সেই ব্যবধান শিক্ষাব্যয়, শিক্ষাদানের মান ও শিক্ষক নিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। একটি মাঝারি মানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিক্ষার্থীদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে উনিশ গুণ বেশি অর্থ খরচ করতে হয়। নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যয় আরো বেশি। আবাসিক ব্যয়, খাবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দুই ক্ষেত্রে খরচের মধ্যে বিশাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যেখানে মাসে মাত্র ছয় হাজার টাকা ব্যয় করে চলতে পারে, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মাসে স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় হয় ২৫ হাজার টাকা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে মাসে প্রাতিষ্ঠানিক খরচের গড় দাঁড়ায় ৮৩৭ টাকা। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গড় খরচ মাসে জনপ্রতি দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৮৩৫ টাকা অর্থাৎ পাবলিকের তুলনায় প্রাইভেটে উনিশগুণ বেশি। এটি কী ধরনের চিত্র বহন করে? ধনাত্মক না ঋণাত্মক? উচ্চশিক্ষাবান্ধব, না বিরোধী? অবশ্যই ভেবে দেখার সময় এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ ২০১৭ সালের তথ্যানুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে গড়ে পৌনঃপুনিক ব্যয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। উপরন্তু সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে গড় ব্যয় বেশি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যেমন— ওই বছর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৩ টাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯০ টাকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১১০ টাকা কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এই টাকার প্রায় পুরোটাই বহন করে সরকার। অন্যদিকে ইউজিসির তথ্যানুযায়ী ২০১৭ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীপ্রতি গড়ে ব্যয় করেছে ৮১ হাজার ১৮২ টাকা। এর মধ্যে নর্থ সাউথ ব্যয় করেছে ৯২ হাজার ৭৪৪ টাকা, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৫০ টাকা, আহসানউল্লাহ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ৮৩ হাজার ৬৩৪ টাকা, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ১ লাখ ৪৯ হাজার ২৩৭ টাকা, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ১ লাখ ৯ হাজার ৫৭৫ টাকা শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় করেছে। এই অর্থ পুরোটাই শিক্ষার্থীর অভিভাবককে বহন করতে হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর ছয় মাসের সেমিস্টারে আবাসিক হলের সিটভাড়াসহ বিভিন্ন ধরনের ফি মিলিয়ে দিতে হয় ৩ হাজার ৮২৫ টাকা। পড়ালেখার জন্য লাইব্রেরিতে গেলেই হয়। ক্লাসগুলো ঠিকমতো করলে অতিরিক্ত আর কোনো চিন্তা করার প্রয়োজন হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর মাসে ব্যয় ৯১৬ টাকা, বছরে ১০ হাজার ৯৯২ টাকা। ইউজিসির হিসাবে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার ভর্তুকি দেয় বছরে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৮ টাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসিক ফি ১৪ টাকা, পরীক্ষার ফরম পূরণের ফি ৫০ থেকে ১০০ টাকা। আবাসিক সিট ভাড়া ২০ টাকা। সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মাসে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যয় ২০০ টাকার বেশি নয়। বছরে এই ব্যয় ২ হাজার ৪০০ টাকা। সরকার ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য ভর্তুকি দেয় বছরে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা। অন্যদিকে স্টামফোর্ডের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একজন শিক্ষার্থীর মোট কোর্স ফি ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ভর্তি ফি দিতে হয় ২০ হাজার টাকা এবং প্রতি সেমিস্টারে ফি ৪ হাজার ৫০০ টাকা। এর বাইরেও বইখাতা, ফটোকপি, যাতায়াতসহ নানা খরচ। সব মিলিয়ে কোর্স ফি মাসে ১৪ হাজার ৩৭৫ টাকা। আর বছরে ১ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা। এর পুরোটাই দিতে হয় পরিবারকে। মোদ্দা কথা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খরচ প্রায় একই রকম। আর এর পুরোটাই অভিভাবককে বহন করতে হয়।

২০১৮ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮০১ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৯ হাজার ২৬২ জন। ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চালু থাকা ৩৮টিতে আসনসংখ্যা ৪৮ হাজার। আর সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে আসন সংখ্যা মোট ৪ হাজার। ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করতে চায় না, তাদের ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই বাধ্য হয়ে পড়তে হয়। সেখানে বিষয়টি কিন্তু এমন নয় যে, তারা খুব বিত্তশালী। তাই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক অথচ ভর্তি হওয়ার স্থান সংকুলান না হওয়ায় তারা বেসরকারিতে গলাকাটা অর্থ ব্যয় করে, অভিভাবকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হচ্ছে। তাছাড়া দেশে কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষার অবস্থা এখনো সেই মানে বা সামাজিকভাবে সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে, সেগুলো উচ্চশিক্ষার সমমান বহন করে এবং সামাজিক সম্মান ও অর্থ উপার্জন দুটোই ঘটে। গুটিকয়েক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেশ সুনামের সঙ্গেই এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদান করছে। দেশে সৃষ্টি করছে দক্ষ জনবল। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে বাকিগুলো পরিচালিত হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ মান নিয়ে। প্রথমত কয়েকটি বড় দুর্বলতা তো অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে আর সেগুলো হচ্ছে উন্মুক্ত খেলার মাঠ নেই, বিশাল লাইব্রেরি সুবিধা নেই, শিক্ষার্থীদের আবাসিক কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি নিজস্ব শিক্ষক নেই, খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে চালানো হয় একাডেমিক কার্যকলাপ।

প্রশ্ন হচ্ছে, তারপরেও একটির পর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন সরকার কীভাবে দিচ্ছে? দেশে এতগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন আছে কি? শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিলে শিক্ষা নামক বিষয়টি যে প্রকৃত অর্থে ঘটে না, ঘটে শুধু সার্টিফিকেট প্রদান। তার যে অশুভ পরিণাম, সেটি কি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়কেই বহন করতে হয়? অবশ্যই না। তার অশুভ পরিমাণ ভোগ করতে হয় পুরো পরিবারকে, রাষ্ট্রকে। কার্যত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বার্থে অর্থের বিনিময়ে একটি সনদ প্রদান করা হচ্ছে মাত্র। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরিচিতি কিন্তু হলভিত্তিক। একজন শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেট, ভর্তি, কোনো অনুষ্ঠানে যোগদান সবকিছুই হয় হলভিত্তিক অথচ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো হলের কোনো ব্যবস্থা নেই। দূর-দূরান্ত থেকে এমনকি ঢাকা সিটির বিভিন্ন স্থান থেকে আসতেও তো শিক্ষার্থীদের অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় এবং সময়ের অপচয় হয়। অথচ হল নির্মাণ করা হলে এই সমস্যা অনেকটাই দূরীভূত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতির স্বার্থেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসিক হল থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষা এমন একটি খাত যেখানে বহু দেশের সরকারকেই ভর্তুকি দিতে হয়; কারণ এটি এক ধরনের লাভজনক বিনিয়োগ। শ্রীলঙ্কার সরকার উচ্চশিক্ষায় শতভাগ ভর্তুকি দেয়। ভারত আমাদের চেয়েও কম ভর্তুকি দেয়। পাকিস্তানে অভিভাবকদের আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফি নির্ধারণ করা হয়। এটি একটি চমৎকার দিক। আমাদের দেশে অনেক আগে যেগুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল সেটিই রয়ে গেছে। এটির পরিবর্তন প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের ব্যবধান, শিক্ষার্থী ফি, শিক্ষাদান ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য নিয়ে আসা প্রয়োজন রাষ্ট্রের স্বার্থেই। তা না হলে বিশাল এক ব্যবধান নিয়ে একটি ছোট দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত তরুণরা বের হবে। এই  বিভক্তি সমাজের সব ক্ষেত্রে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলবে।

আমরা জানি, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হার্ভার্ড ও ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি। উল্লেখ্য, ওই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কেই রাষ্ট্র থেকে অনুদান দেওয়া হয়। আর টিউশন ফির একটি সিলিং নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা সেই ১৯৯২ সাল থেকে। অথচ সরকারের কোনো অনুদান নেই এসব প্রতিষ্ঠানে। একই রাষ্ট্রে বাস করে দুই ধরনের শিক্ষার্থী বড় হচ্ছে। এটি সমাজ বিভক্তির কথা বলে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অভিভাবকদের উপার্জনের ওপর ভিত্তি করে যাতে শিক্ষার্থী ফি নির্ধারণ করে, সেটি সরকারকে দেখতে হবে। একইভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান যে শিক্ষার্থী ফি, সেটি অত্যন্ত কম। সেটি একটু বাড়িয়ে ব্যালান্স করা উচিত। এই সামগ্রিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে একটি অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে মান নিয়ন্ত্রণসহ শিক্ষার ব্যয়ভার যাতে সাধারণের সাধ্যের ভেতর থাকে, সে বিষয়গুলোও যৌক্তিকভাবে তত্ত্বাবধান করবে। এদিকে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছি।

 

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads