• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
শুভ জন্মদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

শুভ জন্মদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • আরাফাত শাহীন
  • প্রকাশিত ০৯ জুলাই ২০১৯

রাজধানী ঢাকার উত্তরে পদ্মার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির নীরব শহর রাজশাহী; যার চালচলনে আদিখ্যেতা নেই, জনজীবন খুবই সাদামাটা। অল্পতেই তুষ্ট এ অঞ্চলের মানুষ। দীর্ঘকাল শিক্ষাক্ষেত্রে ছিল বঞ্চিত। ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই আমাদের এই অঞ্চল শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। ব্রিটিশদের একচোখা নীতির ফলে শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা কলকাতাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য এবং অবহেলিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি ওঠে। সে মোতাবেক ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হোক এটা চায়নি পশ্চিম বাংলার তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। এদিকে বহু আগে থেকেই উত্তরবঙ্গ অবহেলিত হয়ে আসছিল। দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের একটি বড় অংশ এখান থেকে জোগান দেওয়া হলেও উত্তরবঙ্গে তেমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তাই উত্তরবঙ্গের প্রধান শহর রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি ওঠে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাজশাহীতে স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এরপর ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাস হয়। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. ইতরাৎ হোসেন জুবেরীকে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পদ্মাতীরের বড়কুঠি নামে পরিচিত ঐতিহাসিক রেশম কুঠিতে কার্যক্রম শুরু হলেও ১৯৬১ সালে মতিহারের বর্তমান চত্বরে ক্যাম্পাসের গোড়াপত্তন হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বাদ দিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না কিছুতেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টি তার কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের একটি বিরাট অংশে পরিণত হয়েছে ইতোমধ্যে। ভাষা আন্দোলনের অব্যবহিত পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ফলে ভাষা আন্দোলনের যে মৌলিক চেতনা তা এখানে পাওয়া যাবে পুরোপুরি। বাঙালি জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের যে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা, সেখানেও অসামান্য অবদান রেখেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সচেতন ছাত্ররা জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানি শাসকরা পরাজয় নিশ্চিত জেনে এদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার যে নীলনকশা এঁটেছিল, তাতে জীবন দিতে হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবিবুর রহমান, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ূমসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে।

শুধু আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামেই নয়, ’৬৯ সালে যখন স্বৈরাচার আইয়ুব খানের শোষণের বিরুদ্ধে এদেশের আপামর জনসাধারণ ফুঁসে উঠেছিল, তখন তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালাতে উদ্যত হয়েছিল সরকারের পোষা বাহিনী। শিক্ষার্থীরাও উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। এ সময় শিক্ষার্থী এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান রসায়ন বিভাগের শিক্ষক এবং তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। সেনাবাহিনী তার বুকে গুলি চালিয়ে দেয়। ড. জোহা লুটিয়ে পড়েন রাস্তায়। স্বৈরাচারীর পতন হয় আর ড. জোহা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং বাঙালি সংস্কৃতি লালন করার পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অসামান্য দৃষ্টিনন্দন একটি ক্যাম্পাস। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে আমার কাছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে সবার চেয়ে সেরা বলে মনে হয়। অস্ট্রেলিয়ান স্থপতি ড. সোয়ান টমাসের স্থাপত্য পরিকল্পনায় নির্মিত এই ক্যাম্পাসটি সহজেই মন কেড়ে নেবে যে কোনো দর্শনার্থীর। ভাবলে অবাক হতে হয় প্রতিবছর দেশের নানান প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে আসে। প্যারিস রোডের নান্দনিক সৌন্দর্য এবং এর দু’পাশ দিয়ে আকাশছোঁয়া গগনশিরীষ গাছগুলো মোহিত করে রাখে বহুক্ষণ। মনে হয়, অনন্তকাল ধরে যেন এখানে হেঁটে বেড়ানো যাবে; কোনো ক্লান্তি এসে ভর করবে না। এই প্যারিস রোডে এত বছর ধরে কত গল্পই না রচিত হয়েছে! প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করেই হাতের ডানদিকে পড়ে শাবাশ বাংলাদেশ মাঠ। সেখানে রয়েছে শিল্পী নিতুন কুণ্ডুর অসামান্য সৃষ্টি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহক শাবাশ বাংলাদেশ ভাস্কর্য। প্রশাসন ভবনের সামনেই চোখে পড়বে ড. শামসুজ্জোহার সমাধি। প্রশাসন ভবনটিও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।

সাতটি বিভাগ, ১৫৬ জন ছাত্র এবং ৫ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ রয়েছে ৫টি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউট, ৯টি অনুষদ এবং ৫৭টি বিভাগ। প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করার জন্য রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ শিক্ষক। ১৭টি আবাসিক হল থাকলেও দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও আবাসন সংকট রয়ে গেছে। ৭৫৩ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা এবং গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার প্রতি উৎসাহ দেওয়ার জন্য রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম, সুইমিং পুল এবং ইনডোর গেমসের জন্য ইনডোর স্টেডিয়াম। শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করার জন্য প্রতিটি বিভাগে সেমিনার লাইব্রেরি থাকার পাশাপাশি রয়েছে প্রায় চার লাখ বইসংবলিত একটি আধুনিক গ্রন্থাগার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাসহ পেশাজীবনে নানান ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. এনামুল হক, হাসান আজিজুল হক, ড. এবিএম হোসেন, ড. অরুণ কুমার বসাকের মতো প্রথিতযশা মনীষীরা এখানে পাঠদান করেছেন। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অবাধে বিচরণ করে নিজেদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন। বর্তমান সময়েও দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বচ্ছন্দে পদচারণা করে চলেছেন।

হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৬৫ বছর পেরিয়ে ৬ জুলাই ২০১৯ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে। নানা প্রতিকূলতা এবং বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে প্রাণের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার পদযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এ পর্যন্ত আসতে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বহু বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। একসময় সদা অস্থিতিশীল অবস্থা পাড়ি দিলেও বর্তমান সময়ে এসে জ্ঞান, গবেষণা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতে পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণার জন্য বাজেট কম বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছুটা হলেও এই অভিযোগ সত্য বলে মনে করি। আমি বিশ্বাস করি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা গবেষণার ক্ষেত্রে পূর্ণ মনোযোগী হবেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একদিন তার গৌরবময় পদচারণার মাধ্যমে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে।

মনোরম প্রকৃতির প্রাণঐশ্বর্যে শোভিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যটনেরও অংশ হতে পারে। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটনপিপাসু মানুষ বিভিন্ন সময়ে এসেছে এই বিদ্যায়তনের চিরহরিৎ রূপলাবণ্য উপভোগ করতে। সুতরাং বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সবিশেষ অনুরোধ। শুভ জন্মদিন প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads