• শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬
ads
স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহলবাসীর মুক্তি

সংগৃহীত ছবি

সম্পাদকীয়

স্থলসীমান্ত চুক্তি, ছিটমহলবাসীর মুক্তি

  • প্রকাশিত ০১ আগস্ট ২০১৯

দেশহীন মানুষের আবাসস্থল ছিটমহল (Enclave)। ছিটমহল হল রাষ্ট্রের এক বা একাধিক ক্ষুদ্র অংশ যা অন্য রাষ্ট্র দ্বারা আবদ্ধ বা পরিবেষ্টিত। সেখানে যেতে হলে অন্য রাষ্ট্রের জমির ওপর দিয়ে যেতে হয় অর্থাৎ অন্য একটি দেশের মূল ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান জনপদ। যদি কোন একটি জনপদ দুটো দেশ দ্বারা ঘেরা থাকে তাহলে সেটা Exclave. যেমন- কালিনইনগ্রাদ রাশিয়ার Enclave নয় Exclave. কারণ এটি লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ড দুটি দেশ দ্বারা বেষ্টিত। সেখানে শুধু সাগরের মাধ্যমে প্রবেশ করা যায়। পর্তুগাল স্পেনের ছিটমহল নয় অথবা গাম্বিয়া সেনেগালের। ছিটমহল নানা ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক কারণে সৃষ্টি হয়েছে। নদীর পতিপথ পরিবর্তনের জন্য অনেক জায়গায় ছিটমহল সৃষ্টি হয়েছে। কিছু অঞ্চল এর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একখণ্ড মরুভূমি বা ওই অঞ্চলে কোনো জলস্রোত দ্বারা সংযুক্ত থাকে। ফলে এ অঞ্চলগুলোতে মূল ভূখণ্ডের চেয়ে কোনো প্রতিবেশী দেশ দ্বারা সহজে প্রবেশ করা যায়। এ ধরনের অঞ্চলকে ব্যবহারিক ছিটমহল বলে। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মাঝে উত্তর-পশ্চিম কোণে স্পেনীয় গ্রাম ওয় ডেসিডিস, যা স্পেন থেকে পাহাড়ের কারণে বিচ্ছিন্ন। প্রতিবেশী দেশ অ্যানডোরা থেকেই কেবল এ গ্রামে প্রবেশ করা যায়। আবার জাতিগত ছিটমহল হলো একটি বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর মাঝে আরেকটি বৃহৎ সমাজ বা গোষ্ঠী। উদাহরণস্বরূপ ঘেটো, লিটল, ইতালি, ব্যারিওস, চায়না টাউন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এ অঞ্চলগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ভিন্ন। সভ্যতার আদিতে রোমান সভ্যতার পথ ধরে রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রচলন হয়। সম্রাট জুলিয়াস সিজারের পালিত ছেলে বলদর্পী অক্টোভানের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল। তিনি ‘অগাস্টাস-সিজার’ পদবির পরিবর্তে ‘ইম্পারেটর’ অর্থাৎ রাজ্যের প্রভু উপাধি গ্রহণ করে রাজ্য শাসন করেন। তার অত্যাচার-নির্যাতনে পাঠানো দেশে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন হয়ে যে, জনগণ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। তাকে যে স্থানে নির্বাসনে পাঠানো হয় তা রোম সাম্রাজ্যের প্রান্তসীমা বেষ্টিত বিচ্ছিন্ন অঞ্চল বা Concentrate land হিসেবে পরিচিতি পায়। সম্ভবত এটাই পৃথিবীর প্রথম বিশেষ অবরুদ্ধ জনপদ বা ছিটমহল।

পাক-ভারত উপমহাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এলাকা ছিল হিমালয়ের পাদদেশ, নেপাল, ভুটান, দার্জিলিং, পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) উত্তরাঞ্চল ও আসাম সংলগ্ন এলাকার চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, নাতিশীতোঞ্চ আবহাওয়া। মাটির নিচে অফুরন্ত খনিজ সম্পদ আর কৃষিক্ষেত্রে উর্বরতায় সমৃদ্ধ এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশবিভাগের পর হিজিবিজি সীমান্তরেখায় এ অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিধ্বস্ত বলয়ে আবদ্ধ রেখে এই জনপদকে অকার্যকর জনপদে আবদ্ধ রেখে পর্যবসিত করা হয়। কুড়িগ্রামে ভারতের ছিল দাশিয়ারছড়া ছিটমহল। এর ভেতরেই ছিল চন্দ্রখানা নামে বাংলাদেশের ছিটমহল। এটি পৃথিবীর একমাত্র ছিটমহল ছিল যার অভ্যন্তরে অন্য দেশের আরেকটি ছিটমহল। আরেকটি সূত্রমতে, কোচবিহারেও সম্ভবত বাংলাদেশের ছিটমহল ছিল আবার এর ভেতরে ছিল ভারতের ছিটমহল। তিস্তার পাড়ে কোচবিহারের রাজা এবং রংপুরের মহারাজার মধ্যে দাবা, তাস ও পাশা খেলায় বাজির পুরস্কার হিসেবে এই এলাকাগুলো আদান-প্রদান হতো। ফলে কোচবিহার এবং রংপুরের কিছু অংশ একে অপরের ভেতর ঢুকে যায়। ১৯৪৭ সালে লর্ড মাউন্টব্যাটেন বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানারেখা টানার পরিকল্পনা করেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে প্রধান করে সে বছরই গঠন করা হয় সীমানা নির্ধারণ কমিশন। ওই বছর ৮ জুলাই লন্ডন থেকে ভারতে এসে মাত্র ৪০ দিনে অর্থাৎ ১৬ আগস্ট তিনি সীমান্ত নির্ধারণী চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ১৬ আগস্ট জনসমক্ষে তা প্রকাশিত হয়। সীমানারেখা আঁকার সময় তিনি বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করেননি। ভারত ছেড়ে যাওয়ার আগে তার কাজের যাবতীয় দলিলপত্র তিনি পুড়িয়ে ফেলেন এবং বলেন, ‘৮ কোটি মানুষ চরম দুঃখ-দুর্দশা ও অভিযোগ নিয়ে আমাকে খুঁজবে। আমি চাই না তাদের সঙ্গে আমার দেখা হোক।’ বিভাজনের কারিগর আর কখনোই ভারত বা পাকিস্তানে ফিরে যাননি। ফলে সীমানারেখা অনেক স্থানে ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর অর্থাৎ একে অন্যের দখলে পড়ে। যাকে অপদখলীয় ভূমি বলা হয়। দীর্ঘ আটষট্টি বছরে ছিটমহলগুলো ছিল উভয় দেশের অপরাধীদের অভয়ারণ্য। বাস্তবে তারা ছিল নিজ দেশেই পরবাসী। নিজ দেশের পরিচয় দিলেও তারা অন্য দেশের ভেতরে থাকা নাগরিকত্বহীন এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও মৌলিক অধিকার থেকে তারা ছিল বঞ্চিত।

দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল ও দক্ষিণ বেরুবাড়ী অনেকেরই জানা। এই ছিটমহল দুটি বাংলাদেশের কিন্তু চারদিকে ভারত। ফলে এখানে থাকা লোকজন মাত্র একটি করিডোর তিনবিঘার জন্য বন্দি ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হলেও ছিটমহলসহ তিনবিঘার সমাধান হয়নি। ১৯৫৮ সালে নূন-নেহরু চেষ্টা করেও ভারতের উচ্চ আদালতের আদেশের কারণে এগুলো আলোর মুখ দেখেনি। তিনবিঘার বিনিময়ে ভারত ১২ নং দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণের অর্ধাংশ এবং সংলগ্ন এলাকার দখল পায়। কিন্তু তিনবিঘা করিডোর ভারত দেয়নি। কথা ছিল উভয় দেশ নিজ নিজ সংসদে চুক্তি অনুমোদন করবে। বাংলাদেশ অনুমোদন করলেও ভারত তা করেনি। ১৯৯০ সালে ভারতীয় উচ্চ আদালত তিনবিঘা করিডোর ব্যবহারের অনুমতি দেয়। দিনের বেলা এক ঘণ্টা পরপর মোট ছয় ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তা খুলে দেওয়া হয়। বহুদিন পর ১৯৯২ সালের ২৬ জুন এই করিডোরটি ইজারা দেয়। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হলেও ভারত তা কার্যকর করেনি। মুজিব-ইন্দিরার চুক্তির সূত্র ধরে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। ২০১১ সালে সীমান্ত চুক্তির ফলে সই হয় প্রটোকল। মোদি সরকার বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে। ২০১৫ সালে স্থলসীমান্ত চুক্তি (ছিটমহল বিনিময়) ৩১ জুলাই ২০১৫ কার্যকর হয়। বাংলাদেশ পায় লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি, নীলফামারীতে ৪টিসহ মোট ১১১টি ছিটমহল তথা ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর জমি, যার লোকসংখ্যা ৩৭ হাজার ৩৮৬ জন। ভারত পায় কোচবিহারে ৪৭টি, জলপাইগুড়িতে ৪টিসহ মোট ৫১টি ছিটমহল তথা ৭ হাজার ১১০ দশমিক ২ একর জমি, যার জনসংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার ৯০ জন। অপদখলীয় জমি অর্থাৎ জোর করে দখলে রাখা বাংলাদেশ পায় ২ হাজার ২৬৭ দশমিক ৬৮২ একর এবং ভারত পায় ২ হাজার ৭৭৭ দশমিক ৩৮ একর জমি। তিনবিঘা করিডোর চব্বিশ ঘণ্টা সর্বদা খোলা থাকল।

দীর্ঘ আটষট্টি বছর পর ওই ছিটমহলগুলো আজ বাসযোগ্য। এখন তাদের জীবনধারা বদলে গেছে। দাশিয়ারছড়ার ছোট কামাত গ্রামের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছোবেয়া খাতুন (৫১) বলেন, ‘ভাবিনি কোনোদিন বাঁচার অবলম্বন পাব। প্রতিবন্ধী ভাতা পেয়ে এখন নতুন করে জীবন পেয়েছি।’ কালিরহাটের জয়নাল (৪৬) দৈনন্দিন রোজগারের অবলম্বন একটি ভ্যান পেয়ে স্ত্রী সন্তানদের মুখে দু-মুঠো খাবার তুলে দিতে পারছেন। সরকারের আশ্রয়ই প্রকল্পের আওতায় জীবনের শেষ আশ্রয় একটি ঘর পেয়ে স্বস্তিতে আছেন আশ্রয়হীন ভবঘুরে বালাতাড়ি গ্রামের হাতেম আলী, মংলু চন্দ্র, জংলু চন্দ্র। কামালপুর গ্রামের আবুবক্কর সিদ্দিক (৭৯) বলেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন, আপন করে নিয়েছেন। তার কাছে ছিটমহলবাসী সারা জীবন কৃতজ্ঞ। ভিক্ষাবৃত্তি করে দিন কাটাচ্ছিল রাশমেলা গ্রামের জহিরন, জমিলা ও রাশেদা। বিধবা ভাতা পেয়ে এখন তারা ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়েছেন। পুষ্টি প্রোগ্রামের আওতায় সন্তানসহ নিজের নানা পরামর্শ, ওষুধ ও খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন বালাতাড়ি গ্রামের মুক্তা বেগম, জহিরন ও তানিয়া। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, আকাশ সংস্কৃতি, বিদ্যুৎ সংযুক্তিসহ আধুনিক রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা তাদের কাছে স্বপ্ন নয় বাস্তবে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই অসম্ভব কাজকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে দীর্ঘদিনের জটিল ও স্পর্শকতর ইস্যুর সমাধান হওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশ সরকারপ্রধানের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এই ছিটমহল বিনিময় স্থলসীমান্ত চুক্তি সারা বিশ্বের কাছে আজ রোল মডেল।

 

মো. কায়ছার আলী

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

kaisardinajpur@yahoo.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads