• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫
ads
এখন আর নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই - এক

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

এখন আর নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই - এক

  • গৌতম গুহ রায়
  • প্রকাশিত ০২ আগস্ট ২০১৯

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিল ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর জার্মানির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে; অন্যদিক দিয়ে বলা যায় অঙ্কুর প্রথিত হয়েছিল আরেক বিশ্বযুদ্ধের। ১৯৩৯ সাল থেকে বিশ্ব দেখেছিল সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিপর্যয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যা মানুষ নিজেই সৃষ্টি করেছিল। ১৯৪৫, যুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সভা বসে, সেখান থেকে যে তথ্য উঠে আসে তা দেখলে গা শিউরে উঠবে। ১৯৪৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ১৯৪৬-এর ১ অক্টবর পর্যন্ত চলা এই বিচারে মানবেতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায় উঠে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু বন্দিশালায় হত্যা করা হয়েছিল ১ কোটি মানুষকে। এদের মধ্যে ৬০ লাখ ইহুদি। যুদ্ধে মোট ব্যয় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার। মোট সৈন্যসংখ্যা ১১ কোটি। মোট মৃত্যু সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের। সৈন্য ২ কোটি ৭০ লাখ, অসামরিক মানুষ ২ কোটি ৮০ লাখ। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নেই মারা যায় ২ কোটির বেশি মানুষ। ১ হাজার ৭০১টি ছোট-বড় শহর নাৎসিরা ধ্বংস করেছিল, ৭০ হাজার গ্রাম ও অজস্র শিল্প সংস্থা, খামার, পরিবহন। যুদ্ধের আঁচ আমাদের দেশেও লেগেছিল। নিহত হয়েছিল ২৪ হাজার ৩৩৫ জন, আহত হয় ৬৪ হাজার ২৫৪ জন, নিখোঁজ ১১ হাজার ৭৫৪ জন, যুদ্ধবন্দি ৭৯ হাজার ৪৮৯ জন। এই যে ভয়াবহতম মানব ঘাতক লড়াই সভ্যতার ওপর নামিয়ে আনা হয়েছিল, তার প্রধান কারণ নাৎসি বা ফ্যাসিস্ট বাহিনীর লোভ ও বিকৃত জাতীয়তাবোধ। এর ৭৫ বছর পরে আবার বিশ্বজুড়ে সেই আতঙ্ক দানা বাঁধছে। সবচেয়ে আশঙ্কার এটাই যে, এই নব্য ফ্যাসিস্টরা আমাদের দেশেও আজ তাদের দাঁত-নখ বের করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। স্বাধীন দেশের রঙিন স্বপ্ন দেখা ভারতবর্ষ আজ ধ্বংসের মুখোমুখি, বিপন্ন আমাদের সমাজ। এই বিপদ আজ প্রত্যক্ষ ফ্যাসিবাদের। মিথ্যাচার, সীমান্তে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মধ্য দিয়ে ছদ্ম জাতীয়তাবোধের সুড়সুড়ি দেওয়া। সংবাদমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও নিরপেক্ষতার ভিত যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে, তাতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে আজ এই ফ্যাসিবাদ আমাদের সমাজ ও মননে তার দখল কায়েম করেছে। বিরুদ্ধ স্বর চেপে রাখা, চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার রাষ্ট্রীয় প্রয়াস আজ প্রকাশ্যে এসে যাচ্ছে, ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে মুক্তির সাত দশকের মাথায় এসে দেশবাসীর সামনে আবার স্বাধীনতা বিপন্ন আজ।

ফ্যাসিবাদ গোটা বিশ্বমানবতার কাছেই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে করতেই মানুষ লড়ছে, সভ্যতা এগোচ্ছে। মানুষের বিকাশের ইতিহাস আসলে অনিবার্যতার রাজত্ব থেকে স্বাধীনতার রাজ্যে প্রবেশের ইতিহাস। এই ইতিহাস ভুলিয়ে মানুষকে একটি আত্মবিস্মৃত ও নিয়তি নির্ধারিত অনতিক্রম্য কল্পিত ভবিষ্যতের জুজু দেখানো চেতনহীন বশীভূত প্রাণীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। এর বিপরীতে যে সুন্দর ও সাম্যের বিশ্বের স্বপ্ন মানুষ দেখে তার যাত্রাপথ কণ্টকাকীর্ণ, তবু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লড়াই-সংগ্রাম চিরকাল চলছে ও চলবে। আজকের সময়কে ‘এজ অব অ্যাঙ্গার’ বলে চিহ্নিত করা যায় এবং এ সময়ে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘ফ্যাসিবাদ’। তার উত্থান, মানে সম-সময়ের রাষ্ট্রীয় প্রবণতা ও বামপন্থিদের লড়াই, প্রত্যাশার অভিমুখ সেই সুন্দর ও সাম্যের ভারতবর্ষ।      

আরো একটু পেছনে বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ইউরোপের দিকে যদি তাকাই, তাহলে বিষযটি পরিষ্কার হবে। ইতালির এক সাংবাদিক, নিজেকে যিনি সমাজতন্ত্রী বলে পরিচয় দিতেন, ‘ফ্যাসিও দি কম্বাত্তিমেস্তো’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করলেন। ‘ফ্যাসিও’ মানে প্রাচীন রোমের কনসালদের সামনে দিয়ে যে দণ্ডটি বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো, সেই রীতি। দণ্ডটিকে ‘ফ্যাসেস’ বলা হতো। সেই থেকে ফ্যাসিস্ট, ফ্যাসিবাদের শুরু, মুসোলিনি যার হাল ধরেন পরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্টদের কার্যক্রম বৃদ্ধি ও বিভিন্ন দেশে বামশক্তির উত্থানে আতঙ্কিত ইতালির ধনিক শ্রেণি তখন ভীত হয়ে ওঠে এবং এর থেকে বাঁচতে মুসোলিনির ওপর ভরসা করতে শুরু করে। এক সময়ের সাংবাদিক ও সোশ্যালিস্ট বলে পরিচয় দেওয়া মুসোলিনি তখন মাত্র ১৩ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন নির্বাচনে। তিনি এ অবস্থায় বেছে বেছে সমাজের ভবঘুরে, অপরাধপ্রবণ ছেলে-ছোকরাদের তার দলে যুক্ত করতে শুরু করেন। ইতালিতে অধিকাংশ মানুষ সে সময় বেকারত্ব ও হতাশায় নিমজ্জিত। মুসোলিনি তার চটকদারি প্রচারে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকলেন। ক্ষমতায় আসার জন্য তিনি যে কোনো ধরনের পথ নিতে পিছপা হননি। ‘মিনিটস অব ফ্যাসিস্ট পার্টি’র রেকর্ড থেকে তার নিজের কথায় জানা যায়, ‘আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ইতালির নানা প্রান্তে ধর্মীয় দাঙ্গা সৃষ্টি করব, সমগ্র ইতালিজুড়ে প্রাচীন গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযান চালাব, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের ও দেশের বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন আদায় করব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলে, রোমা রোলা সে সময় সত্যটা জানান কবিকে, রবীন্দ্রনাথ বিভ্রান্তিমুক্ত হন। আতঙ্ক বিস্তার ও অতীত ঐতিহ্যের মিথ এবং বাস্তবকে গুলিয়ে দিয়ে দেশবাসীকে আচ্ছন্ন রাখার নীতিতে চলা মুসোলিনির ‘ফ্যাসিস্ট’ বাহিনীর সঙ্গে আমাদের দেশের এ সময়ের শাসকের কর্মকাণ্ডে কী অদ্ভুত মিল! একই উদ্দেশ্য ও মতবাদ নিয়ে সে সময় জার্মানিতেও রাজনৈতিক সংগঠন গড়েন হিটলার, তার নাৎসি বা নাজি বাহিনী। এর সঙ্গে যুক্ত করেন উগ্র জাতীয়তাবাদ, ইহুদি বিদ্বেষ। মাত্র ১৪ শতাংশ জনসমর্থন থেকে হয়ে ওঠেন একনায়ক শাসক, ফ্যুয়েরার। ১৯২৪-এ নাৎসি দল মোট ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ভোট পেয়েছিল, যেখানে ৬ মিলিয়ন ছিল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের আর ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন কমিউনিস্টরা। কিন্তু ১৯৩০-এর বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের আবর্তে নাৎসিরা ভোট বাড়িয়ে নিতে সমর্থ হয়। ১৯৩০-এ তারা পায় ৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন, কমিউনিস্টরা ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের ভোট নাৎসিদের দিকে যাচ্ছিল। ১৯২৯-এ পৃথিবীজুড়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ধস নামে, শিল্প উৎপাদনে ঘাটতি হয়, যার প্রভাব জার্মানিতেও পড়েছিল। চার বছরে শিল্প উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমে যায়, ৮০ লক্ষাধিক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে, বহু ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। সে দেশের বামপন্থিরা দেশবাসীর ক্রমবর্ধমান হতাশা ও বিক্ষোভের সুযোগ নিতে ব্যর্থ হলে হিটলার সেই সুযোগটি নেন, তার প্রাথমিক বুলিতে সমাজতন্ত্রের কথা ছিল, মানুষ বিভ্রান্ত হয়। ক্ষমতা দখলের জন্য প্রচার মাধ্যমকে সঙ্গী করে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকে নাজি বাহিনী। জার্মানিতে তাদের প্রধান শত্রু ছিল কমিউনিস্টরা। ১৯৩৩-এর ১ মার্চ জার্মানির সংসদ ভবনে আগুন লাগানো হয়। এই অগ্নিকাণ্ডে কমিউনিস্টদের দোষারোপ করে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। ১০ হাজার কমিউনিস্ট কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টিসহ সব শ্রমিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৩৩-এর ১ আগস্ট হিটলার আজীবনের জন্য ফুয়েরার হয়ে ক্ষমতায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেন। আজ ভারতেও হিন্দুত্ববাদী ‘হিটলার দর্শনে’র অনুগতরা সেভাবেই ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষকে ‘বশীভূত’ করার নীতি নিয়েছে, উগ্র জাতীয়তাবাদ তাদের অস্ত্র। দেশে ক্রমবর্ধমান আর্থিক সংকট, ধর্মীয় বিদ্বেষের সম্প্রসারণ, শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠনগুলোর অধিকার হরণ, কুসংস্কার ও যুক্তিহীনতার বিস্তার ভারতেও সেই ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদের কালো অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের নেতা গোলওয়ালকার ‘আমাদের জাতি’ শীর্ষক লেখায় লিখেছিলেন, ‘এক জাতি এবং সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য হিটলার যখন সেমেটিক রক্তের জাতি ইহুদি নিধন এবং বিতাড়ন শুরু করেছিলেন, সারা বিশ্ব হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু আসলে সে সময়ই জার্মান জাতি তার গৌরবের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। জার্মান আমাদের শিক্ষা দিয়েছে দুটি পরস্পরবিরোধী রক্ত-জাত জাতি এবং বিরোধী সংস্কৃতির পার্থক্যটা মৌলিক— তাদের কোনো সময়ই একীভূত হওয়া সম্ভব নয়।’ এই সর্বনাশী দানবের উল্লাস হাজার বছরের সম্প্রীতি ও ঐক্যের ভিতের ওপর গড়ে ওঠা ভারতবর্ষের মানবাত্মাকে আজ তছনছ করতে চাইছে।

 

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী

জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads