• সোমবার, ৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ডেঙ্গুর প্রকোপ ও দায়িত্বশীল কার্যক্রম

ছবি : সংগ‍ৃহীত

সম্পাদকীয়

ডেঙ্গুর প্রকোপ ও দায়িত্বশীল কার্যক্রম

  • এটিএম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ
  • প্রকাশিত ০২ আগস্ট ২০১৯

ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারে কাঁপছে দেশ। তবে সব মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হয় না। ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত জ্বর। এ ভাইরাস এডিস মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ সব বয়সের মানুষ। তবে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে। অনেক শিশুর ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুও হয়েছে। ডেঙ্গুতে শিশু-নারীসহ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পত্রিকায় এসেছে। বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম ডেঙ্গুর আবির্ভাব ঘটে। দেড় যুগের রেকর্ড ভেঙে গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৪৭ জনসহ দেশের ৬১ জেলায় আরো ১ হাজার ৩৩৫ জন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে ৪ হাজার ৪০৮ জন সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে এজন্য আতঙ্কিত না হয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তার দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। জ্বর হলে তাই অবহেলা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। তাছাড়া যেহেতু এবারের জ্বরে ফ্লুইড ঝরে যাচ্ছে শরীর থেকে, তাই জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে ফ্লুইড জাতীয় খাবার খেতে হবে।

 

রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চিকিৎসক ও রোগীর পরিবারের সদস্যরা বলছেন, আক্রান্ত রোগীর বেশির ভাগই সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় এসেছিলেন কিংবা ঢাকায় থাকেন। তারা ঢাকা থেকেই সংক্রমিত হয়েছেন বলে ধারণা করছেন। মশক নিধন কার্যক্রমের স্থবিরতা, ভালো মানের মশক নিধন ওষুধ আমদানি না করা, যথাযথ পরিকল্পনার অভাব এবং মানুষের অসচেতনতাই ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির জন্য প্রধানত দায়ী বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। সাধারণত বৃষ্টিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভার খুব বেশি মাত্রায় প্রজনন সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। এডিস মশার সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে, ডেঙ্গু আক্রান্ত লোকের হারও তত বাড়বে।

 

ডেঙ্গু আতঙ্কের মধ্যেও গত কয়েকদিনে আমরা দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে কিছু নেতিবাচক বিষয় লক্ষ করেছি। ডেঙ্গুর প্রকোপের শুরুতে ঢাকার একজন মেয়র ডেঙ্গুর ভয়াবহতাকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। এরপর ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশা নির্মূল ও ধ্বংসের শুনানিতে আদালতে সিটি করপোরেশনের একজন আইনজীবী বলেছেন, ‘মাই লর্ড, উত্তরে ওষুধ দিলে মশা দক্ষিণে যায়, দক্ষিণে দিলে উত্তরে যায়। এ কারণে মশা নিধন সম্ভব হয়নি।’ যা জাতির সঙ্গে ঠাট্টাতুল্য বচন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আবার অন্যদিকে ডেঙ্গুর মহামারীর মধ্যে দেশের বিভিন্ন নামকরা কিছু হাসপাতাল রোগীদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। চিকিৎসার নাম করে তারা এসব অসাধু কার্যক্রম করছে। সঠিক তদারকির মাধ্যমে এগুলো বন্ধ করতে হবে রাষ্ট্রকেই। ডেঙ্গু নির্মূলের জন্য আমদানিকৃত ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও নেতিবাচক খবর পাওয়া যাচ্ছে। যারা এগুলো আমদানির সঙ্গে জড়িত তাদের কাজের সঠিক তদারকি করতে হবে এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বজুড়ে যে উষ্ণতা বাড়ছে তাতে ২০৮০ সালের মধ্যে দেড় থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকিতে থাকবে। আমাদের দেশও এই ঝুঁকির মধ্যে আছে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের জন্য ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবার সচেতনতা বাড়ানো দরকার। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে খুঁজে খুঁজে মশার উৎস ধ্বংস করতে হবে। মশার উৎস কমলে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যাবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা তথা স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে এডিস মশা নিধন এবং এডিসের বংশবিস্তার রোধের কার্যক্রম জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা আবশ্যক। ডেঙ্গু হলে করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে রাজধানী ও জেলা-উপজেলা সদরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করাও এখন বাঞ্ছনীয়। তবেই সম্ভব ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা।

 

কোনো দেশে ডেঙ্গু একবার প্রবেশ করলে তা আর নির্মূল হয় না। এটাকে প্রতিরোধের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের মশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। বলতে পারেন এটি একটি ধারাবাহিক কাজ। কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে একে মোকাবিলা করতে হবে। এছাড়া ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ডেঙ্গু মশা নিধন করতে হবে। দায়িত্বশীল পর্যায়ে থেকে নেতিবাচক কথা ও কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে, নতুবা যোগ্যদের দায়িত্বশীল পর্যায়ে বসাতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। ডেঙ্গু মশা থেকে বাঁচতে নিজ নিজ বাড়ির চারপাশের সব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র ফেলা যাবে না। মনে রাখতে হবে জীবন আপনার এবং আপনাকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এগিয়ে না এলে সরকারের পক্ষে একা সমস্যা উত্তরণ কঠিন হবে। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের ডেঙ্গু সমস্যা দূর হবে, এমনটাই প্রত্যাশা করি।

 

লেখক : চাকরিজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads