• শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬
ads
বরিস জনসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ ব্রেক্সিট

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

বরিস জনসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ ব্রেক্সিট

  • অলোক আচার্য
  • প্রকাশিত ০৫ আগস্ট ২০১৯

ব্রেক্সিট ইস্যুতে বিভিন্নভাবে জল ঘোলা হওয়ার পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেকে সরে দাঁড়ান থেরেসা মে। এর পরপরই আলোচনায় উঠে আসে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য নাম। ব্রিটেনে তখন এমন একটা সময় বিরাজ করছিল যে এই পদে যিনি আসবেন তাকে তার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। সেই পদের জন্য রক্ষণশীল দলের বরিস জনসন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জেরেমি হান্টের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনসন রক্ষণশীল দলের ৯২ হাজার ১৫৩ ভোট এবং হান্ট পান ৪৬ হাজার ৬৫৬ ভোট। ফলে বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হন ব্রিটেনের। তিনি অবশ্য তার চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো ভালোভাবেই অবগত রয়েছেন বলে মনে হয়। কারণ ফল ঘোষণার পরই তিনি অঙ্গীকার করে বলেছেন, আমরা ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই ব্রেক্সিট কার্যকর করতে যাচ্ছি এবং এর সব সুযোগ-সুবিধাও আমরা ভোগ করব। জনসন আরো বলেন, তার নেতৃত্বের মূলমন্ত্র ছিল ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের অঙ্গীকার, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং বিরোধী নেতা জেরেমি করবিনকে পরাজিত করা। তবে এসবের মধ্যে ব্রেক্সিট থেকে ব্রিটেনকে সুষ্ঠুভাবে বের করে আনাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সাংবাদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বরিস জনসন ব্রিটেনের এ সমস্যা কীভাবে সামাল দেন বা কী কৌশল অবলম্বন করেন, তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে বিশ্ব। বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই দলের সিনিয়রদের মধ্যে অনেকেই তার প্রধানমন্ত্রিত্বে কাজ না করার কথা জানিয়েছিলেন। জনসনের সামনে তাই ব্রেক্সিট একমাত্র সমস্যার কারণ হবে না। নিজ দলের ভেতর আস্থা অর্জন এবং ব্রিটেনের জনগণকে পথ দেখানোর কাজটি তাকেই করতে হবে।

সিএনএন জানিয়েছে, আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়তে হবে। এটাই বেঁধে দেওয়া সময়। জনসনও অঙ্গীকার করেছেন এ সময়ের মধ্যেই ব্রেক্সিট ত্যাগের। কিন্তু বাস্তবে তার হাতে সময় রয়েছে ৩০ দিন। সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী যা গত তিন বছরে করতে পারেননি, তা জনসনকে করতে হবে এই ৩০ দিনের মধ্যে। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, এমপিরা ছুটিতে যাবেন। এছাড়া তিন সপ্তাহ পার্লামেন্ট বসবে না। কেননা এই সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসব কারণে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের জন্য বরিস জনসন খুব বেশি সময় হাতে পাচ্ছেন না। ব্রেক্সিট নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার সমাধান করার জন্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রীর সে বিষয়ে কী কৌশল হবে, যা জাদুর মতো কাজে দেবে তা দেখতে হলে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যদি তিনি ব্যর্থ হন তাহলে কী ঘটবে? তার পরিণতিও কি থেরেসা মের মতোই হবে? এসব প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে এ ইস্যুটি সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ে তাকে যথেষ্ট মাথা খাটতে হবে, তাতে সন্দেহ নেই। একটি কার্যকর উপায় ও যথাযথ বিচ্ছেদ চুক্তি না হলে ব্রেক্সিট থেকে এক্সিট কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ ব্রিটেনের এমপিরা তো প্রতিজ্ঞা করে বসে আছেন, যথাযথ বিচ্ছেদ চুক্তি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে বেরোনোর চেষ্টা যে সরকারই করুক, তার পতন ঘটাবেন তারা। এই যথাযথ চুক্তিই বা কী হবে বা আদৌ এ রকম কোনো যথাযথ চুক্তি করে ব্রিটেনকে ব্রেক্সিট থেকে বের করে আনতে পারবেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, তা সময়ই বলে দেবে। সাংবাদিকতা ছাড়াও তিনি লন্ডনের মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে তার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তবে এই দায়িত্বটি এককথায় বিশাল। এর সঙ্গে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। তিনি যেকোনো মূল্যে ব্রিটেনকে ইইউ থেকে বের করে আনতে চান। এই যেকোনো মূল্য কী হবে বা এই মূল্য দিতে ব্রিটেনের অন্য এমপিরা সমর্থন দেবেন কি না, তাও স্পষ্ট নয়।

থেরেসা মের করা প্রস্তাব বাতিল করে তিনি নতুন করে চুক্তির খসড়া করতে চান। কিন্তু ইউরোপীয় কমিশনের নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অরসুলা ফন ডার লায়ন এ বিষয়ে সময় বাড়াতে ইতিবাচক কথা বললেও বিচ্ছেদের ব্যাপারে নতুন করে আলাপ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন। কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা বা কতটা ফলপ্রসূ হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য, তা ভেবে দেখতে হবে। কারণ এসব কিছু ব্রিটেনের অর্থনীতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করবে। হুট করে বেরিয়ে এলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে-এ রকমটা ভাবার কোনো কারণ নেই। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলে দেশটিকে রাতারাতি ইইউ’র একক মুদ্রাবাজার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ফলে ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানিতে শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার হলে দাম বেড়ে যাবে। ইউরোপের অন্য দেশে যুক্তরাজ্য কিছু বিক্রি করতে চাইলে তার ওপর শুল্ক আরোপ হবে। ফলে অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বেই। এতে যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেওয়াও অস্বাভাবিক হবে না। থেরেসা মের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর ব্রেক্সিটের সময়সীমা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যেই নতুন প্রধানমন্ত্রীকে তার দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। যে ব্রেক্সিট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অসমর্থ বলে থেরেসা মেকে বিদায় নিতে হয়েছে, বরিস জনসনও যদি কার্যকর সমাধান করতে ব্যর্থ হন, তাহলে সমস্যা আরো ঘনীভূত হবে। তার পথও হয়তো মের পথের দিকে যাবে।

বরিস জনসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে, তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ট্রাম্পের সঙ্গে জনসনের মিল খোঁজার চেষ্টা করছেন অনেকে। দুই নেতার চুলের স্টাইল থেকে শুরু করে আচরণগত মিল রয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন। কারণ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। জনসনের জয়ের আধা ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প তার প্রিয় নেতাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বরিস ভালো কিছু করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। দুই নেতাই এমন একসময় দুই শক্তিধর দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন যখন দেশ দুটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে নিজেদের ধীরে ধীরে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। যেমন—বরিস জনসন নিজেদের ব্রেক্সিট থেকে বের করার চ্যালেঞ্জ নিয়েই ক্ষমতায় এসেছেন। ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত ছয়টি দেশের সম্পাদিত চুক্তি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। ট্রাম্পের সামনে ২০২০ সালের নির্বাচন আর জনসনের সামনে ব্রেক্সিট ইস্যু। দুটোই মহাগুরুত্বপূর্ণ। দুজনে কীভাবে এই ক্ষেত্রে বিজয়ী হন, তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। তবে আপাতত ব্রেক্সিট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রী কতটুকু সমর্থ হন, নাকি তারও পরিণতি বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর মতো হয়, তা দেখার জন্য আর মাত্র কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে বিশ্ববাসীকে।

লেখক : সাংবাদিক

sopnil.roy@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads