• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
শোক ও শক্তির মাস আগস্ট

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

শোক ও শক্তির মাস আগস্ট

  • প্রকাশিত ১৫ আগস্ট ২০১৯

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করছে। দলটির নেতৃত্বে ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ, ১৯৫৫’র ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চা, ১৯৬৬’র ছয় দফা দাবি, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০’র নির্বাচনে জয়লাভ এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে যে মানুষটি জীবন বাজি রেখে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার দেশপ্রেম, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকা, গরিব ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের কাজকে দেশি-বিদেশি একটি চক্র কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১-এ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকেই ওই কুচক্রী মহলটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারকে নানাভাবে বেকায়দায় ফেলা ও উৎখাতের চেষ্টা করে।    

অবশেষে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ষড়যন্ত্রকারী কিছু বিপথগামী সেনা অফিসার বঙ্গবন্ধুর বাসভবন আক্রমণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থানরত আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদদাতা সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত তার ‘মিডনাইট ম্যাসাকার ইন ঢাকা’ বইয়ে লেখেন, মুজিব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বর্ণনা সবসময় রহস্যে ঘনীভূত থাকবে। তিনি আরো লেখেন, মুজিবের বাসভবন রক্ষায় নিয়োজিত আর্মি প্লাটুন প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করেনি। মুজিবের পুত্র শেখ কামালকে নিচতলার অভ্যর্থনা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। মুজিবকে পদত্যাগ করা ও তাকে এ বিষয়ে বিবেচনা করার জন্য বলা হয়। মুজিব সামরিক বাহিনীর প্রধান, কর্নেল জামিলকে টেলিফোন করে সাহায্য চান। জামিল ঘটনাস্থলে পৌঁছে সৈন্যদের সেনানিবাসে ফিরে যাওয়ার জন্য আদেশ দিলে তাকে সেখানে গুলি করে মারা হয়। শেখ মুজিবকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। 

১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ডের আরো শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, ছেলে শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ শিশুপুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের চার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জাতীয় চার নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আ হ ম কামারুজ্জামানকে আটক করা হয়। তিন মাস পরে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে তাদের সবাইকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। 

বিদেশে থাকায় ওইদিন প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা। দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরেই তিনি দলকে সংগঠিত করেন এবং সর্বসম্মতিতে দলের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার দক্ষ নেতৃত্বে নানা প্রতিকূল পরিবেশ ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন সুসংগঠিত, ঠিক আবারো শুরু হয় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও জীবননাশের হুমকি। অধিকন্তু পিতার মতো বরাবরই তিনিও ছিলেন ঘাতকের ষড়যন্ত্রের টার্গেট। ফলে শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তাকে এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক জনসভায় গ্রেনেড হামলা করা হয়। ওই হামলায় ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হয়। ওই হামলায় নিহতের মধ্যে মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মিসেস আইভি রহমান অন্যতম, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমানের স্ত্রী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত নৃশংস সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা তার একটি।

আগস্ট মাস আওয়ামী পরিবারের জন্য একটি শোক ও বেদনার মাস। ঘাতকচক্র ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে হত্যা করেই থেমে থাকেনি, তারা আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে চেয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও ভিন্নদিকে প্রবাহিত করেছে, দেশের অগণিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে বিনা অপরাধে হত্যা ও নির্যাতন করেছে, বিনা কারণে হামলা-মামলা দিয়েছে, বাড়িঘর লুণ্ঠন ও জ্বালিয়ে দিয়েছে। এত হামলা-মামলা, হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন সর্বোপরি শোক ও বেদনাকে শক্তিতে পরিণত করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী পরিবারের নেতাকর্মীরা ঘুরে দাঁড়ায় এবং ১৯৯৬ সালে সব প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করে এদেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায়। কিন্তু ২০০১ সালে আবারো দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং নেমে আসে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা-মামলা, গুম, হত্যা যার সর্বশেষ পরিণতি ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। এই হামলার উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট, শেখ হাসিনাকে হত্যা এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা। সেই ভয়াবহ হামলার স্মৃতি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেদিনের শোক ও বেদনাকে শক্তিতে পরিণত করে আবারো ২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং এদেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায়।      

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাস ও দিবস আছে যা ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে উদযাপন করে থাকে। এ ছাড়া বাঙালি জাতির গুরুত্বপূর্ণ মাস ও দিনসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আগস্ট শোক ও শক্তির মাস। এ মাসে বাঙালি জাতি শোককে শক্তিতে পরিণত করেছে এবং বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। তাই সব বাঙালির কাছে আগস্ট শোক ও শক্তির মাস।

 

ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads