• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
কত কান্না নিতে সক্ষম আমরা

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

কত কান্না নিতে সক্ষম আমরা

  • সাঈদ চৌধুরী
  • প্রকাশিত ১৮ আগস্ট ২০১৯

তিনটি মুখ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে! তাদের প্রশ্ন করার, অভিযোগ দেওয়ার অথবা কোনো আকুতি জানানোর ভাষা নেই বা তারা স্তব্ধ হয়ে গেছে আমাদের বখে যাওয়া আর আইন না মানা মানুষগুলোর কাছে। সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু তিনজনের বাবা-মা দুজনই গত হয়েছেন। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলছি।

শিশু তিনটির এখন কি হবে বলতে পারেন? দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাস এবং ছোট গাড়ি দুটোই বেপরোয়া গতিতে চলছিল বলেই এমনটা হয়েছে। অকাল অপমৃত্যু আর কত বেশি হলে সবাই নিয়ম মানবে? কোনো অটোচালককে গিয়ে যদি বলা হয়, তুমি কীভাবে চালানো শিখেছ, কোনো নিয়ম জানো কি? সেও তখন মালিক সমিতির ভয় দেখায়, সেও তখন বলে ওঠে আপনার কাজ আপনি করুন, আমাকে শেখাতে আসবেন না। কোনো ট্রাক ড্রাইভারকে পুলিশ সিগন্যাল দিলে ট্রাক পুলিশের ওপর দিয়ে তুলে দিয়েছে এমন ঘটনাও রয়েছে। অন্যদিকে লাইসেন্স প্রাপ্তি দ্রুত হয় ঘুষ দিলে— এমন অভিযোগও আছে।

সড়কে কেউ লেন মেনে গাড়ি চালায় না। স্কুল-কলেজ-বাজারের সামনে গিয়ে গতি যেন আরো বেড়ে যায়। কারণ একটু জোরে চালালেই সামনে গিয়ে বেশি যাত্রী ধরতে পারবে। এক আশ্চর্যজনক নিয়মহীন দেশে কীভাবে পতিত হলাম আমরা? তবে কি সামনে কোনো পথই খোলা নেই? আজ এই তিন শিশুর দায় কে নেবে? এই তো কিছুদিন আগে পর্যন্ত বাবা-মায়ের কোলে আদরে বড় হওয়া শিশুগুলো আজ বোঝায় পরিণত হলো! একটি দুর্ঘটনা তাদের সব নিরাপত্তা কেড়ে নিল। এখানে কি আমাদের দায়ভার নেই? সড়কে কেউ নিয়ম মানে না। যারা মানে তারাও বিপদগ্রস্ত হয়।

আমি নিজেই তার সাক্ষী হয়ে ঘরে পড়ে রয়েছি মাসখানেক যাবৎ। রাস্তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে রাস্তা ছেড়ে রাস্তার নিচে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখলাম— দ্রুত গতির একটি মোটরসাইকেল এঁকেবেঁকে আসছে। হঠাৎই সে ট্রাকের সঙ্গে আঘাত খেয়ে আমার দিকে তেড়ে আসতে লাগল। আমি সরে যাওয়ার আগেই সব শেষ। পায়ের গোড়ালি ভেঙে গেল! এখন শুয়ে-বসে কাটাতে হচ্ছে দিন। আমি অ্যাক্সিডেন্ট করি গত মাসের পনের তারিখ। সেদিনই গাজীপুরের শ্রীপুরের ধনুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সামান্য রাস্তা পার হওয়ার সময় দ্রুত গতির মোটরসাইকেলে আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। খবরে জানতে পারলাম সড়কে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ, প্রাণ হারায় প্রায় এগারোজন মানুষ। এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের দেশে মৃত্যু যেভাবে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে আমাদেরকে অনেক বড় মাশুল দিতে হবে। অক্ষমতার বোঝা নিয়ে অনেক মানুষকে তাদের জীবিকাহীনভাবে দিনানিপাত করতে হবে।

এ ব্যবস্থার উন্নয়নে অনেক লেখা হচ্ছে; কিন্তু দিন শেষে যেন আর কেউ নেই ভাববার। বেশি মৃত্যু ঘটছে দূরপাল্লার গাড়ি, মোটরসাইকেল আর অটোজাতীয় ছোট গাড়িগুলোতে। ট্রাফিক ব্যবস্থার অধুনিকায়ন করে যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু আইনের আওতার মধ্যে আনাই হতে পারে সমাধান। এখন যদি আমরা ভাবি শুধু বলে-কয়েই সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে ফেলব, তা হবে অলীক চিন্তার শামিল।

রাস্তার প্রতি দুই কিলোমিটার অন্তর অন্তর গতি নিয়ন্ত্রণ মিটার স্থাপন করে গাড়িগুলোকে নির্দিষ্ট গতিসীমা বেঁধে দিতে হবে। যেখানে বাঁক আছে, সে জায়গাগুলোতে ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে গাড়ি চালালেই ছয় মাসের জন্য জব্দ করতে হবে। বেঁধে দেওয়া গতির ওপরে গাড়ি চালালে গাড়ির এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স বন্ধ করে দিতে হবে। অটো চালকদের প্রশিক্ষণপূর্বক অবশ্যই ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই লাইসেন্স স্থানীয় হাইওয়ে থানার দায়িত্বের ওপর অর্পণ করা যেতে পারে, এতে করে বিআরটির ওপর চাপ কমবে। নির্দিষ্ট লেন মেনে গাড়ি চালানোর নিয়ম করলে, বড় সুফল বয়ে আনতে পারে ।

মোটরসাইকেলের ব্যাপারে সরকার কয়েকটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন যেটা করতে হবে, তা হচ্ছে একজনের মোটরসাইকেল অন্যজন চালনার ক্ষেত্রে ভ্যালিড অনুমতিপত্র সঙ্গে রাখার নিয়ম চালু করতে হবে। দেখা যায় পুলিশ লেখা  মোটরসাইকেল চালাচ্ছে এমন একজন, যিনি নেশার সঙ্গেও জড়িত এবং এদের গতিও বেশি থাকে। এদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আঠারো বছরের নিচে যারাই মোটরসাইকেল চালাবে তাদের গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের ওপর হলেই তাকে গ্রেপ্তার করে মোটরসাইকেল বাজেয়াপ্ত করার মতো আইন করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে সে মামলার রায় পেতে অনেক দেরি হয়ে যায়। অনেক বিচারই শেষ হয়নি এখনো। বিচারিক কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আগেই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আইন ভাঙার শাস্তি ও কঠোরতা বাড়ানো আরো বেশি প্রয়োজন। যদি সড়কে এমন কান্না বাড়তেই থাকে তবে জাতিগতভাবে আমাদের হতাশার জায়গা সৃষ্টি হবে এবং তা থেকে তৈরি হবে একটি পুরো জনগোষ্ঠীর অক্ষমতার জায়গা। আমরা খুব করে চাই সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসুক।

এই তিনটি বাচ্চা বাবা-মাকে হারিয়ে যে সাগরে পতিত হয়েছে, এখন থেকে তাদের সঠিক ভবিষ্যৎ প্রণয়নে সরকার কাজ করবে এটাও বড় চাওয়া। এ শিশুরা যেন আদরবঞ্চিত হয়ে বখে না যায়, এজন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেবে স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া। এ বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সবার সুবিবেচনাপ্রসূত দৃষ্টি আশা করছি।

 

লেখক : সদস্য, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, শ্রীপুর, গাজীপুর

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads