• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেট আর কত দিন

ছবি : সংগ‍ৃহীত

সম্পাদকীয়

চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেট আর কত দিন

  • শরীফুর রহমান আদিল
  • প্রকাশিত ১৯ আগস্ট ২০১৯

প্রতি বছর কোরবানি শেষে মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রয়। গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির চামড়া নিয়ে সাধারণ মানুষসহ অন্যদের মাথায় হাত। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক-ঈদুল আজহার দিন সন্ধ্যায় সিলেটের একটি মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্র মিলে প্রায় ১ হাজার ২৮টি কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করতে এসেছিলেন। কিন্তু ন্যায্য মূল্য না পেয়ে সবগুলো চামড়াই প্রতিবাদস্বরূপ রাস্তায় ফেলে দিয়ে যান। শুধু তাই নয়, তারা সিটি মেয়রকে পরিচ্ছন্নতা কর্মী দিয়ে এসব আর্বজনা পরিষ্কার করারও অনুরোধ জানান। কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নিয়ে ব্যবসায়ীরা কী ধরনের ফাঁদ পেতে আছেন, ওপরের প্রতিবাদটি থেকে তা সহজেই অনুমেয়।

গত ৭ আগস্ট চামড়াশিল্প মালিক ও সরকার যৌথভাবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে, যেখানে গত বছরের তুলনায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। গরুর চামড়া ঢাকায় ৪৫-৫০ টাকা, আর ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা, খাসির চামড়া ১৮-২০ টাকা ও বকরির মূল্য ১৩-১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আর এ ঘোষণা দিলেও ফড়িয়ারা অনেকে চামড়া কিনেছেন ঘোষণাকৃত দামের চেয়েও অনেক কম দামে, আবার ফড়িয়াদের থেকে আড়তদার এবং আড়তদার থেকে মালিকরা ওই সব চামড়া কিনেছেন আরো কম দামে! আবার কারো কারো চামড়া রয়ে গেছে অবিক্রীত। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, ফকির, গরিব-মিসকিনসহ অন্যান্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহ।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে অর্জিত হয়েছে মাত্র ৫৮ কোটি ডলার। আর এই রপ্তানি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিল ৯০ টাকা। বলতে গেলে বলা যায়, দেশে চামড়ার সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ২০১৩ সালে এবং সে বছর লক্ষ্যমাত্রার চাইতেও রপ্তানি হয়েছিল ২৩ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে চামড়া রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১২৩ কোটি ডলার। কিন্তু ওই বছর ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করেন অনেকটা কম মূল্যে। রপ্তানি ব্যুরোর আরেক পরিসংখ্যানে যদিও গত বছর রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮ শতাংশ কম রপ্তানি হয়ে ১০৩ কোটি ডলার অর্জন হয়েছে-মর্মে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবু ২০১৮ সালে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা গেছে, তাতে প্রতিটি চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে কিনলেও ট্যানারি মালিকদের পাঁচ গুণ মুনাফা থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবু কি ব্যবসায়ীদের মনগড়া কারণগুলো যৌক্তিক বলার কোনো কারণ আছে?

প্রতি বছরই ব্যবসায়ীরা দেশে লবণের সংকট, আন্তর্জাতিক বাজরে চামড়ার চাহিদা কম, পুঁজির সংকট, উৎপাদন খরচ বেশি ইত্যাদি বলে দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে চামড়ার দাম কমিয়ে নিজেরা মুনাফা করেছেন হাজার কোটি টাকা। আর এ বছরও অযৌক্তিক কারণ কিছু দাঁড় করিয়েছেন ব্যবসায়ীরা, যেমন-আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার মূল্যের দরপতন, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ, আগে সংগ্রহ করা চামড়া অবিক্রীত থেকে যাওয়া, পুঁজির সংকট এবং গত বছরের বিক্রি করা চামড়ার টাকা এখনো না পাওয়া। চামড়ার দামের ধসের কারণ হিসেবে ট্যানারিশিল্প মালিকরা চীন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধের কথা বলে সিন্ডিকেটকে বৈধ করার প্রয়াস চালান। তাদের মতে, বাংলাদেশের বড় বাজার হলো চীনে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ থাকায় তারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অথচ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলো ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে গত বছরের ৪০ শতাংশ চামড়া রয়ে যাওয়ার কথা বলেন, অথচ এবারে তাদের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় সোয়া পাঁচ লাখ যা গতবারের তুলনায় অনেক বেশি। প্রশ্ন হলো—যদি চামড়া অবিক্রীত রয়ে যায়, তবে চামড়া সংগ্রহের লক্ষমাত্রা বাড়াবে কেন? কিছু অসাধু ও অনৈতিক ব্যবসায়ী গরিব- মিসকিনদের টাকা নির্লিপ্তভাবে আত্মসাৎ করতে আন্তর্জাতিক দরপতনের ধুয়া তুলছেন। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম বিশেষ করে ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে গতবারের তুলনায় এবারেও চামড়ার দাম বেশি। ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের চামড়া অত্যন্ত উন্নত হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০ টাকা অথচ বাংলাদেশের চামড়া উন্নত হয়েও এর দাম তার অর্ধেক তথা ৪৫ টাকা! পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে যে পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির চাহিদা রয়েছে, তা বাংলাদেশ সারা বছর যতগুলো চামড়া অর্জন করে তা তার অর্ধেক অর্থাৎ বিশ্বে চামড়ার চাহিদা রয়েছে দ্বিগুণ কিন্তু তারপরও কেন এ অজুহাত? 

তবে ব্যবসায়ীরা যাই বলুক না কেন-এটা যে এক ধরনের প্রতারণা ও ষড়ষন্ত্র তা স্পষ্ট। এ বছর চামড়ার দাম যেভাবে কমেছে তার ফল কি জনগণ ভোগ করবে? এবার কি জুতা, ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট কিংবা মানিব্যাগের দাম কমবে? কারণ যেখানে এসব পণ্য উৎপাদনকারী উপাদানের মূল্য কম, সেখানে উৎপাদিত পণ্যের দামও তো কমে আসার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো কখনোই আমরা দেখি না এসবের দাম কমতে, বরং প্রতি বছরই এসব পণ্যের দাম বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। তবে কেন চামড়ার এই পানির দর? ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য কোরবানির পশুর চামড়ার দরপতনের ফলে মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি শেষ পর্যন্ত ফকির-মিসকিন, এতিম কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মাসাতের জন্য লোলুপ চোখে তাকাচ্ছি?  আমাদের অর্থের লোভ এতটাই যে, আমরা শেষ পর্যন্ত ভিক্ষুকের টাকা কেড়ে নিচ্ছি! তবে ব্যবসায়ীদের এহেন প্রবণতায় আমাদের উন্নত মানের চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের বামতলা, কানপুর, চেন্নাই ও পাঞ্জাবে কয়েক হাজার ট্যানারিশিল্প রয়েছে কিন্তু এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চামড়ার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কেননা বর্তমানে ভারতে গরু জবাই করায় এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিল, ‘গো-হত্যা নিয়ে রাজনীতির জেরে ভারতে কাঁচা চামড়ার জোগানে টান’। আর রিপোর্টটিতে বলা হয়, প্রায় গো-হত্যা নিয়ে রাজনীতির কারণে ওই বছর প্রায় ৭৪ হাজার কোটি রুপি বলি দিতে হয় ট্যানারি মালিকদের। ফলে ভারতে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেল, ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়া ও সাভারে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উন্নত না করার অজুহাতে ট্যানারি মালিকরা গত কয়েক বছর এ ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করে ফকির-মিসকিনের টাকা আত্মসাৎ করে যাচ্ছে! সরকারের উচিত ছিল চামড়া সিন্ডিকেটদের খুঁজে বের করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। অথচ গত দুই বছর রপ্তানি আয় কমেছে মাত্র ৮ শতাংশ কিন্তু সরকার চামড়ার দাম কমিয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। আক্ষেপের বিষয় হলো, সরকারের দেওয়া নির্ধারিত দামেও কোরবানির পশুর চামড়া কেনেননি আড়তদারসহ ট্যানারি মালিকরা। এরপরও কর্তৃপক্ষের যেন কিছুই করার নেই। কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, সরকার কি ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি? গত বছরের মতো এবারও দাম অপরিবর্তিত রাখলেও কেন ফকির-মিসকিন কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত? আমাদের ব্যবসায়ীরা কি এতটাই হীন যে ফকির-মিসকিন, ভিক্ষুকের টাকা দিয়ে ব্যবসা করে কোটিপতি হতে হবে!

আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য রপ্তানি যেমন অপরিহার্য শর্ত, তেমনি রপ্তানি বাড়ানোর জন্য কাঁচামাল জাতীয় পণ্য অন্যতম শর্ত। আর এ শর্ত পূরণ করতে পারে চামড়াশিল্প। চামড়া খাতের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে বর্ষপণ্য বা প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার-২০১৭ ঘোষণা করেন এবং চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে আরো দুটি চামড়া শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলেন। বর্তমানে রপ্তানির ক্ষেত্রে চামড়াশিল্পের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। এ হিসাবে অনেকের ধারণা, পোশাকশিল্পের পরই স্থান হতে পারে চামড়াশিল্পের। এ চামড়াশিল্পকে ধরে রাখতে না পারলে আমাদের এ চামড়াগুলো পাচার হয়ে যাওয়ার যেমন আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং দেশীয় এ শিল্প রক্ষা ও গরিবদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারকে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে এবং পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট চক্রের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষক ও বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads