• বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৫
ads
৩৭০ ধারা বাতিল : কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কী

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

৩৭০ ধারা বাতিল : কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কী

  • প্রকাশিত ১৯ আগস্ট ২০১৯

পৃথিবীর ভূস্বর্গ কাশ্মীর। হিমালয়ঘেরা কাশ্মীর তিন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র—ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে বিভক্ত। ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য (জম্মু ও কাশ্মীর উপত্যকা এবং লাদাখের সমন্বয়ে গঠিত), পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর এবং গিলগিত ও বালতিস্তান অঞ্চলদ্বয় এবং চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চীন ও ট্রান্স কারাকোরাম অঞ্চলদ্বয় কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত। কাশ্মীরের মোট ভূখণ্ডের ৪৩ শতাংশ ভারতের দখলে, ৩৭ শতাংশ পাকিস্তানের দখলে ও ২০ শতাংশ অঞ্চল চীনের দখলে রয়েছে।

জম্মু ও কাশ্মীরের ১৯৪৭-পূর্ব শাসকবংশ ছিল ‘ডোগরা’। ডোগরা বংশের শাসন শুরু হয় গুলাব সিংয়ের হাত ধরে। ১৮০৮ সালে জম্মু পাঞ্জাবকেন্দ্রিক শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে এলে শিখ মহারাজা রণজিৎ সিং এ এলাকার শাসনভার অর্পণ করেন রাজপুত গুলাব সিংকে। শিখ সাম্রাজ্য ছিল লাহোরকেন্দ্রিক। শিখ মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর পর শিখ সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে ব্রিটিশরা শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। গুলাব সিং জম্মুর রাজা হিসেবে ব্রিটিশদের সহযোগিতা করেন।

১৮৪৬ সালে ব্রিটিশরা আক্রমণ করে শিখ সাম্রাজ্য। ব্রিটিশদের সঙ্গে শিখ সাম্রাজ্যের এই প্রথম যুদ্ধে জম্মু ও কাশ্মীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। যুদ্ধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজয়ের পর ১৮৪৬ সালের ৯ মার্চ তৎকালীন পাঞ্জাব শিখ রাজা দুলিপ সিংয়ের সঙ্গে ব্রিটিশদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেটি লাহোর চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তির মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো কাশ্মীর বিক্রি হয়ে যায়। প্রথম চুক্তির ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা অমৃতসর চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তির ফলে দ্বিতীয়বারের মতো কাশ্মীর বিক্রি হয়। প্রথম চুক্তি বাস্তবায়নের কদিন পরই ১৮৪৬ সালের ১৬ মার্চ এই চুক্তি হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে জম্মুর স্থানীয় শাসক গুলাব সিংয়ের। এই ‘অমৃতসর’ চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাশ্মীর ও আশপাশের এলাকা গুলাব সিংয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়। এভাবে জম্মু ও কাশ্মীর চলে আসে ডোগরা বংশের নিয়ন্ত্রণে। গুলাব সিং হয়ে ওঠেন জম্মু কাশ্মীরের একক শাসক। ব্রিটিশরা তাকে স্বতন্ত্র ‘মহারাজা’ হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়।

কাশ্মীরের শাসক হওয়ার বিনিময়ে গুলাব সিংকে ব্রিটিশদের কোষাগারে ৭৫ লাখ মুদ্রা জমা দিতে হয়েছিল। নগদ মূল্য ছাড়াও গুলাব সিংকে প্রতিবছর নানা উপঢৌকন ব্রিটিশদের দিতে হতো। এসব আনুগত্যের ফলে ব্রিটিশদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন গুলাব সিং ও তার শাসকবংশ। এ বংশের শাসনামলে কাশ্মীরের সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের অত্যাচারিত হতে হয়। ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ সরকার এই এলাকার স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নজরদারি বৃদ্ধির জন্য কাশ্মীরে একজন ‘রেসিডেন্ট অব দ্য স্টেট’ নিয়োগ দেন। তাতেও স্থানীয় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার কমেনি। স্থানীয় মুসলমানদের এতটাই কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল যে, ১৯৩০ সাল পর্যন্ত রাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী কিংবা প্রশাসনিক কাজে হিন্দু রাজবংশীয় বাদে স্থানীয় মুসলমানদের চাকরির কোনো সুযোগ ছিল না। তৎকালীন মহারাজা হরি সিংয়ের পক্ষপাতদুষ্ট নীতিতে কোনো মুসলমান সন্তুষ্ট ছিল না। তখন জম্মু ও কাশ্মীরে প্রথম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের (এনসি) জন্ম হয়। মহারাজার শাসনের পতন ঘটাতে এনসির প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লাহ স্বাধীন কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত হরি সিংই ছিলেন কাশ্মীরের শাসক। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের অন্যতম শর্ত ছিল, ভারতের দেশীয় রাজ্যের রাজারা ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন, অথবা তারা স্বাধীনতা বজায় রেখে শাসনকাজ চালাতে পারবেন। ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান-সমর্থিত পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলার বিদ্রোহী নাগরিক এবং পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর রাজ্য আক্রমণ করে।

কাশ্মীরের রাজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে সহায়তা চাইলেন। কাশ্মীরের রাজা ভারতভুক্তির পক্ষে স্বাক্ষর করবেন, এই শর্তে মাউন্টব্যাটেন কাশ্মীরকে সাহায্য করতে রাজি হন। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর পুঞ্চ অঞ্চলের প্রজাবিদ্রোহ ও আফ্রিদি দখলদারদের আগ্রাসনে বিপন্ন কাশ্মীরের ডোগরা রাজা হরি সিং ‘Instrument of Accession’-এ স্বাক্ষর করেন। গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্টের মূল আইনগত ভিত্তি অনুযায়ী, হরি সিংয়ের স্বাক্ষরিত দলিলটি সুরক্ষা, বিদেশনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা—এ তিনটি বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সদ্য গঠিত ভারত রাষ্ট্রের পার্লামেন্টের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু তার বাইরে কাশ্মীরের সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকে। একই সঙ্গে, গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে লেখা একটি চিঠিতে হরি সিং কাশ্মীরের জননেতা শেখ আবদুল্লাহকে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করার কথা জানান। এই নিয়োগের ফলে জম্মু-কাশ্মীরের প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে। চিঠির উত্তরে, হরি সিংয়ের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেন। অক্টোবর তা ভারতের গভর্নর জেনারেল কর্তৃক অনুমোদিত হয়। চুক্তি সই হওয়ার পর ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অন্যদিকে কাশ্মীরের পাকিস্তান প্রান্ত দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্য প্রবেশ করে। প্রায় চার বছর যুদ্ধ চলার পর ১৯৫২ সালে ভারত বিষয়টি রাষ্ট্রসংঘে উত্থাপন করে। রাষ্ট্রসংঘ ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে রাষ্ট্রসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের প্রস্তাব দেয়। ভারত প্রথমে এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিলে ভারত গণভোটের বিপক্ষে মত দেয়। জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে কাশ্মীর থেকে উভয় পক্ষের সেনা প্রত্যাহার ও গণভোটের প্রস্তাব দিলেও ভারত গণভোটে অসম্মত হওয়ায় পাকিস্তানও সেনা প্রত্যাহারে অসম্মত হয়।

১৯৪৯ সালে শেখ আবদুল্লাহ ভবিষ্যতে কাশ্মীর ভূখণ্ডে ভারতের সংবিধান কতটা প্রযোজ্য হবে, সেটি ভারত ও কাশ্মীরের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট করেন। শেখ আবদুল্লাহকে লেখা একটি চিঠিতে নেহরু দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট জানিয়ে দেন: ‘Instrument of Accession’-এ উল্লিখিত তিনটি বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জম্মু-কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ। ১৯৪৯ সালের নভেম্বরে গৃহীত ভারতীয় সংবিধানে এই রাজনৈতিক ঐকমত্যকে একটি বিধিবদ্ধ রূপ দেয় ‘৩৭০ ধারা’। ভারত ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর এই বিষয়ে মোটামুটি ঐকমত্যের বাতাবরণ তৈরি হয় ১৯৫২ সালের মাঝামাঝি নাগাদ। তারই ফলে ১৯৫২ সালের জুলাইয়ে Delhi Agreement স্বাক্ষর হয়। সার্বিকভাবে বলা যেতে পারে, এই চুক্তি কাশ্মীরের ‘সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বের’ পরিবর্তে ‘আংশিক স্বায়ত্তশাসনের’ একটি রূপরেখা তৈরি করে। জওহরলাল নেহরু ও শেখ আবদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এই সমঝোতার প্রধান বিষয় ছিল এ রকম : সুরক্ষা, বিদেশনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা—এ তিনটি বিষয় ছাড়া অন্য সব বিষয়ে কাশ্মীরের আইনসভার সার্বভৌমত্ব থাকবে। ১৯৫৬ সালে কাশ্মীর আলাদা সংবিধান পায় এবং নিজেদের ভারতীয় বলে সংজ্ঞায়িত করে।

কিন্তু গত ৫ আগস্ট ২০১৯-এ ভারতের বর্তমান হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার কাশ্মীরকে দেওয়া ৩৭০ ধারা বাতিলের ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে আগেকার অবিভক্ত জম্মু ও কাশ্মীর (রাজ্য) হয়ে যাবে কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীর; আর জম্মু-কাশ্মীরের লাদাখ আলাদা হয়ে সেটিও হবে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। উপরন্তু ৩৭০ ধারা রদের ফলে আগের বিশেষ মর্যাদা এখন আর থাকছে না। দ্বৈত নাগরিকত্ব, আলাদা পতাকা ছিল যা এখন থাকবে না। ৩৬০ ধারা (অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা) কার্যকর ছিল না, এখন কার্যকর করা যাবে। অন্য রাজ্যের কোনো ভারতীয় ‍নাগরিক জম্মু ও কাশ্মীরে জমি কিনতে এবং সরকারি চাকরির আবেদন করতে পারত না, এখন তাও করা যাবে। জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভার মেয়াদ ছিল ছয় বছর। এখন অন্যান্য রাজ্যের মতো এর মেয়াদও পাঁচ বছর হবে।

বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদ কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ভারত এর আগে কখনো জনসংখ্যাতাত্ত্বিক তাস খেলেনি। কাশ্মীরিদের দাবি-দাওয়া মেটাতে অন্যত্র এই সংখ্যা ব্যবহার করেছে। হান চায়নিজদের তিব্বত ও জিনজিয়াংয়ে চলে আসতে উৎসাহিত করার মতোই চীনা কৌশল কাশ্মীরে অবলম্বন করেছে ভারত। কাজেই জিনজিয়াং কিংবা তিব্বতের মতো বিচ্ছিন্ন আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল অথবা অধিকৃত পশ্চিমতীরের মতো কাশ্মীরও একটি ভূখণ্ড হয়ে যায় কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সাংবিধানিক এই পরিবর্তন ওই উপত্যকায় নতুন সংঘাতের বাতাবরণ সৃষ্টি করবে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

মোজাম্মেল হক

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads