• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

সম্পাদকীয়

কাশ্মীর কাহিনী

ভূস্বর্গ, অগ্নিগর্ভ আর নোবেল পুরস্কারের হিসাব

  • প্রকাশিত ২৯ আগস্ট ২০১৯

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার কাশ্মীর পৃথিবীর ভূস্বর্গ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় আলোচিত ভূস্বর্গের সুদৃশ্য প্রাকৃতিক আবেদন সাত দশক ধরে ভূলুণ্ঠিত। রাজনৈতিক টানাপড়েন, মানবিক উদ্যোগের  পেছনে দখলদারত্বের বাসনা, সৈন্য-সামন্তের খট-খট জোড়াবুটের উপস্থিতি, বারুদ-তপ্ত আলগা অস্ত্র আর হামেশা হত্যাকাণ্ড দশকের পর দশক ধরে কাশ্মীরের ভূস্বর্গকে রক্তপাতের অগ্নিগর্ভ বানিয়ে রেখেছে। সভ্যতার রাজত্বে যারা নিজের পাতে ঝোল টানতে ব্যস্ত, যুগ যুগ ধরে তাদের কোপেই কাশ্মীর রক্তাক্ত। কাশ্মীর কার? এ প্রশ্নের উত্তরে কাশ্মীর কতটা ভারতের আর কতটা পাকিস্তানের, এ হিসাব বিশ্লেষকরা যত দ্রুত মেলাতে চেষ্টা করেন, তার সামান্যটুকুও বলতে চেষ্টা করেন না যে, কাশ্মীর মূলত কাশ্মীরিদের। কাশ্মীরের মর্যাদাসংক্রান্ত ভারতীয় সংবিধানের ধারা বিলোপে যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা, তাতে কাশ্মীরিদের চাওয়া-পাওয়াকে অন্ধকারে রেখেই ভারত ও পাকিস্তান শিকারি সিংহের মতো কাশ্মীর শিকারে ব্যস্ত। সবাই কাশ্মীর উপত্যকার অস্থিরতাকে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিষয় উল্লেখ করে দিল্লি ও ইসলামাবাদকে আলোচনায় বসতে বলেছে। কিন্তু এ আলোচনায় কাশ্মীরিদের ডাকার কথা কেউ বলছে না, বরং কাশ্মীরের কথা বলা মানুষগুলোর কথা হয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, নয়তো গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

কাশ্মীর নিয়ে অস্থিরতা ভারত ও পাকিস্তানের উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়া। ১৮৪৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত জম্মু ও কাশ্মীর মহারাজা দ্বারা শাসিত একটি দেশীয় রাজ্য ছিল। ১৯২৫ সালে ‘হরি সিং’ কাশ্মীরের রাজা হন। কাশ্মীরের মুসলিমরা মহারাজা হরি সিংয়ের পক্ষপাতমূলক নীতিতে অসন্তুষ্ট ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ‘ইন্ডিয়ান ইনডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট’ অনুসারে ভারত বিভক্তির সময় জুনাগড়, হায়দরাবাদ এবং জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যগুলোকে সুযোগ দেওয়া হয় যে, তারা স্বাধীনতা, ভারতের অন্তর্ভুক্ত অথবা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারবে। এ সময় রাজা হরি সিং পাকিস্তানের সঙ্গে স্থিতিবস্থার চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং স্বাধীন থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু চতুর্দিকে স্থলবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কাশ্মীর আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে সক্ষম কি না, সে ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দিলে এবং পাকিস্তানি উপজাতিদের আক্রমণে হরি সিং ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়েন। দুর্বল ব্যক্তিত্বের রাজা হরি সিং ব্রিটিশদের থেকে প্রাপ্ত স্বাধীনতার সুযোগকে সমস্যায় পর্যবসিত করে একটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেন তখন থেকে বিভিন্ন পক্ষ কাশ্মীরের সৌন্দর্যের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে হাত বাড়াতে শুরু করে। শুরু হয় কোলে টানার রাজনীতি।

সম্প্রতি ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মীরিদের বিশেষ মর্যাদার বিধান বিলোপ করলে আরেক থমথমে অনিশ্চয়তার উদ্ভব ঘটে। বিধানটিতে জম্মু-কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান, এমনকি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। এর বাইরে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থা ছাড়া সব বিষয়ে কাশ্মীরের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা হয়। কাশ্মীরিদের চাওয়া, সংবিধানের ৩৭০ ধারা যথাযথ প্রয়োগ হোক এবং কাশ্মীর নিজস্ব পরিচয়ে স্বায়ত্তশাসনের চর্চা করুক। কিন্তু সেই চাওয়ার একেবারে বিপরীত কাজটাই করেছে ভারত। ৩৭০ ও ৩৫ ধারা বিলুপ্তির মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিক হিসেবে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তা বিলোপ করেছে। এখন জম্মু-কাশ্মীরে ভারতের যে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি কিংবা জমির মালিক হতে পারবে, যেটি আগে ৩৫ ধারা বলে শুধু কাশ্মীরিদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

রাষ্ট্রপতির আদেশে জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে এনেছে তবে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ ভারতেই। ১৯৯৫ সালে কাশ্মীরের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে বিতর্ক দেখা দিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও নিশ্চিত করেছিলেন যে, অনুচ্ছেদ ৩৭০ রদ করা হবে না। ২০১৫ সালে জম্মু-কাশ্মীরের হাইকোর্ট একটি রায়ে বলেছিল ৩৭০ ধারার ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজ্যের ‘কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি’র মতামত ছাড়া ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না। কিন্তু এখন কাশ্মীরিদের মতামত ছাড়াই জম্মু-কাশ্মীরের মর্যাদা বিলোপ করা হয়েছে।

৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বিলুপ্তিতে কাশ্মীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে, যার ঢেউ কাশ্মীর ছাড়িয়ে আঞ্চলিক রাজনীতি এমনকি বিশ্বরাজনীতির হাওয়াকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। কাশ্মীরের গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষ সেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রাণপণে রুখতে চায়, ফলে সেই সংঘাতের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে, কে জানে। তীব্র ক্ষোভে ফুঁসে ওঠা কাশ্মীরিদের বাকস্বাধীনতা ইতোমধ্যে হরণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কাশ্মীরি নেতারা গৃহবন্দি নয়তো গ্রেপ্তার। বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে টেলিফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগব্যবস্থা, জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা ও কারফিউ। তবে ১৪৪ ধারা ও কারফিউ জারির মধ্যেও সাধারণ কাশ্মীরিরা বাইরে আসার চেষ্টা করছে, প্রতিবাদ করার চেষ্টা করছে। অবরুদ্ধের মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে, নিহত হওয়ার কিছু ঘটনাও এখন সামনে আসছে। সাত দশক ধরে কাশ্মীর যে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় চলে আসছিল, এক ঝটকায় ভারত সেই বিশেষ মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়ার পর যারা এটিকে সমাধান হিসেবে দেখছেন তাদের মনোবাসনা কতদিন টিকবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপই শেষ কথা নয়। এত বছরের ইতিহাস নিষ্পত্তি ৩৭০ ও ৩৫ ধারা বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। বিক্ষুব্ধ কাশ্মীরিদের প্রতিক্রিয়ায় সেখানে যে নতুন কোনো রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে না, সেই নিশ্চয়তা ভারত কীভাবে পাবে? ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রয়োগ কাশ্মীরিদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদকে আরো উগ্র ও কট্টর করে তুলবে কি না, সে প্রশ্নও সম্ভবত সামনে আসবে।

সন্দেহ নেই ভারত দেশটা বহুত্ববাদের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অখণ্ড ভারতের শক্তির শেকড়ই বহুত্ববাদ। কিন্তু ভারত সেই বহুত্ববাদের সৌন্দর্য থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমেই হিন্দুত্ববাদমিশ্রিত উগ্র জাতীয়তাবাদে ঝুঁকছে বলে বিশ্বাস করার অনেক কারণ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীরের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লোপ করা সে মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। বল প্রয়োগ করে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট আরো বৃদ্ধি পাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। খোদ ভারতীয়দেরই একটা বড় অংশ বলছে পদক্ষেপটি খুব তড়িঘড়ি করেই নেওয়া হয়েছে—যেটা গণতান্ত্রিক হয়নি। অমর্ত্য সেনের মতো মানুষরাও ভারতীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গলা চড়িয়ে কথা বলছেন। অমর্ত্য সেন বলেছেন, কাশ্মীরে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণের যে স্টাইল, তা ঔপনিবেশিকতায় আক্রান্ত, এ স্টাইলকে ভারতীয় গণতন্ত্র সমর্থন করে না।

কাশ্মীর সমস্যার শিগগিরই সমাধান নেই। কাশ্মীর সমস্যা একদিনে ঘনীভূত হয়নি। বছরের পর বছর ধরে বহুমুখী-বহুরূপী সমস্যা কাশ্মীরকে এক জটিল আবর্তনে ফেলে রেখেছে। কোনো এক পক্ষীয় সমাধান কাশ্মীর ইস্যুতে কার্যকর হওয়ার অবস্থাও এখন আর নেই। ৭০ বছর ধরে বিভিন্ন পক্ষের নাক-গলানিতে সমস্যাগুলো এমন অবস্থায় এসেছে যে একটি আংশিক সমাধান অন্য আরেকটি সমস্যাকে আরো উসকে দেবে। কাশ্মীরের সমস্যাগুলোকে একদাগে চিহ্নিত করাও বেশ কঠিন। রাজনৈতিক, ভৌগোলিক, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক, আদর্শিক সমস্যাগুলো কখনো পৃথকভাবে আবার কখনো একসঙ্গে সক্রিয় থাকে। দশকের পর দশক ধরে এখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল রাখা হয়েছে এবং তা ইচ্ছে করেই। এখানে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাতের মতো নেতৃত্ব কোনো সময়ই এখানে গড়ে ওঠেনি; যিনি সমগ্র কাশ্মীরকে এক ছাতার নিচে এনে স্বাধীনতার ডাক দেবেন। সুতরাং কাশ্মীরের স্বাধীনতার স্বপ্ন এখন পর্যন্ত অধরা। অন্যদিকে কাশ্মীর ইস্যুকে সামনে রেখে ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের সামরিক শক্তি গুণে-দ্বিগুণে বাড়িয়েছে। চিরশত্রু দুই দেশই পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করেছে যদিও তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিম্ন-মধ্যম পর্যায়ের। কাশ্মীরকে সামনে রেখে তারা প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়েছে। সবাই এখানে বিচার মানে কিন্তু তালগাছটাকে নিজের ভাগে রেখে! এ অবস্থায় কাশ্মীর সমস্যার হঠাৎ একক সমাধান আশাও করা যায় না।

কাশ্মীরের রক্তাক্ত উপত্যকায় নতুন ‘শান্তিতত্ত্ব’ দিয়ে আরো অনেকেরই সুযোগ রয়েছে নোবেল তালিকার জ্যৈষ্ঠ প্রতিযোগী হয়ে ওঠার। তবে যে তত্ত্বই দিক না কেন, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের কথা যতই বলুক না কেন, বল প্রয়োগের বদলে মানবিকতার প্রশ্নে একাট্টার কথা যতই আওড়াক না কেন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যতই বিশ্লেষণ করুক না কেন— তারা যদি কাশ্মীরিদের নিজস্ব মতামতকে অন্ধকারে রেখে সমাধানতত্ত্ব উপস্থাপন করে, তবে সে তত্ত্ব আরো অনেকবার হালনাগাদ করতে হবে। কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে কাশ্মীরিদের অন্ধকারে রেখে যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রয়োগের সহজ অর্থই হচ্ছে ‘চাপিয়ে দেওয়া সমাধান’। মনে রাখা প্রয়োজন চাপিয়ে দেওয়া সমাধান নতুনতর সমস্যার উপাদানেই তৈরি।

 

মো. মনিরুল ইসলাম

লেখক : প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads