• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads

সম্পাদকীয়

এখন আর নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই — পাঁচ

  • গৌতম গুহ রায়
  • প্রকাশিত ৩০ আগস্ট ২০১৯

কিছুদিন আগে প্রাবন্ধিক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ইন্টারভিউ শুনছিলাম। তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছিলেন সেখানে। ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রথম টার্গেট থাকে মানুষের প্রশ্ন করার অধিকার হরণ করা। মানুষের চেতনাকে সে ভয় পায়, তাই তাদের আক্রমণের প্রথম লক্ষ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। হিটলার জার্মানিতে যেটা করেছিলেন, বর্তমান ভারতেও তা-ই হচ্ছে। প্রশ্ন করার অধিকারকে শেকড়ে ছেঁটে ফেলার জন্য একের পর এক আক্রমণ হানা হচ্ছে দেশের গর্ব শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর ওপর। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তার উদাহরণ। শুধু প্রত্যক্ষ আক্রমণ নয়, শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করার প্রক্রিয়া চলছে আজ। ফ্যাসিস্টদের হাতিয়ার মানুষের অশিক্ষা ও কুসংস্কার, অপবিজ্ঞানের প্রসার। আমরা আজ ভারতে সেটাই দেখছি— মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাকে, অবিজ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় মান্যতা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থার ভিতকে পাল্টে দিয়ে সেখানে একমুখী ও সাম্প্রদায়িক চরিত্র দেওয়ার কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার, যার সহযোগিতায় রয়েছে এর উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। আক্রান্ত হচ্ছেন যুক্তিবাদী শিক্ষক, সাংবাদিকরা। তাই খুন হতে দেখি কুলবর্গি, পানেসর, গৌরি লঙ্কেশের মতো প্রাজ্ঞ মানুষদের। সাম্প্রদায়িকতামুক্ত চেতনা এদের কাছে আতঙ্কের, সুতরাং বর্বরতা এদের হাতিয়ার। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, ভারতীয় মজদুর সংঘ, সেবা ভারতী, বজরংবলি দল, দুর্গা বাহিনী প্রভৃতি সংগঠন উগ্র জাতীয়তাবাদ, দেশীয় ঐতিহ্য ও হিন্দু দর্শনের ভিত্তিতে যুবক-যুবতীদের উদ্বুদ্ধ করছে, প্রকৃতপক্ষকে ধর্মীয় উন্মাদে পরিণত করাই এদের লক্ষ্য। এদের এতটাই ‘মগজ ধোলাই’ করা হয় যে, যে কোনো ধরনের অমানবিক আক্রমণ হানতে এরা কুণ্ঠিত হয় না। যুক্তি, বিজ্ঞান, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সমাজবাদী ধ্যান-ধারণার প্রসার পরিকল্পনা এসব সংস্থার আক্রমণের উদ্দেশ্য থাকে। এদের অর্থনৈতিক ভিত্তি, প্রচারমাধ্যমের প্রভাব বিস্ময়করভাবে শক্তিশালী। এ অবস্থায় বামপন্থিদের দায়িত্ব তাই বিশাল। অপবিজ্ঞানের অপসারণে গ্রহণ করতে হবে সদর্থক সক্রিয়তা, ৬০-৭০-এর সেই স্টাডি সার্কেল সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে, মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার ক্ষুধা জাগিয়ে তুলতে হবে। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন জারি রাখতে হবে, মানুষের ভেতর জেগে ওঠা প্রগতিশীল চেতনা তীব্র হলে তা ফ্যাসিবাদের ভিতকেই দুর্বল করবে ।

একটু পিছিয়ে গিয়ে আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিস্তারের সময়কে যদি দেখি, দিল্লি পরবর্তী সময়ে রাজধানী হলেও উপনিবেশে তার ভূমিকা খুব একটা ছিল না, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ছিল তিন বন্দর— কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ। তারা তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখার জন্য এই তিন বন্দরে তাদের মতো শিক্ষাব্যবস্থা, ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান প্রবর্তনের কাজ শুরু করল। আমাদের দেশজ যে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি তার থেকে স্থানীয় জনগণকে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে অধিকার চিরস্থায়ী হতে পারবে না, এই ধারণা তাদের ছিল। কলোনিয়াল সাংস্কৃতিক আবহে ক্রমশ ধুয়ে-মুছে ছাপ করে দেওয়া হলো এই অঞ্চলের প্রাক-ঔপনিবেশিক দেশজ সংস্কৃতি। তাই আজ এসব নগরে বা ধারেকাছে আমাদের শেকড়ের সংস্কৃতির খোঁজ মিলবে না, এর জন্য যেতে হবে প্রান্তিক অঞ্চলে— বীরভূম, পুরুলিয়া বা উত্তর বাংলায়। চা শিল্পেও দেখি স্থানীয় জনজাতির মানুষকে বাদ দিয়ে অন্য স্থান থেকে শ্রমিক নিয়ে আসা হয়েছিল, সেই একই তত্ত্বে। আমার আলোচনা এখানে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। আমি উল্লেখ করতে চাই লোকনাট্যের মতো দেশজ বা লোকজ সংস্কৃতির কথা, একান্তভাবেই যা আমাদের স্থানিক সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের গ্রামাঞ্চলের সামাজিক সংস্কৃতি প্রতিবাদের উচ্চারণে ঋদ্ধ। এই বহুস্তরীয় সাংস্কৃতিক উপাচারকে ‘একক’ বা সার্বিক ভারতীয়ত্ব বলে আরোপিত বোধ চাপিয়ে দেওয়া হলে তা সর্বনাশ হবে। এদেশে সাম্যবাদী চেতনার প্রথম পর্যায়ের মানুষ মানবেন্দ্রনাথ রায় ১৯২২-এ তার একটি লেখায় লিখেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের মতো উপনিবেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরস্পর নির্ভরশীল। এর একটিকে অবহেলা করলে অন্যটি ব্যর্থ হতে বাধ্য।’ আজকের সময়েও এই কথাটি প্রাসঙ্গিক, বিশেষত বামপন্থিদের কাছে। আমাদের দেশজ সাংস্কৃতিক শেকড়ের বিস্তার নিবিড় হতে হবে, গণআন্দোলনের স্বার্থে। সাম্প্রতিককালের কিছু ঘটনা উল্লেখ করলে রাষ্ট্রীয় দমনের প্রকৃত চেহারাটা আরো পরিষ্কার হবে। মহারাষ্ট্রের পুনের কাছে ভীমা-কোরেগাঁওয়ে ২০১৮-এর ১ জানুয়ারি দলিতদের সঙ্গে উগ্র মারাঠি জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে এক দলিত যুবকের মৃত্যু হয়। পুলিশ স্বাভাবিকভাবেই সেই উগ্র জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষে ভূমিকা নেয় এবং পুনেসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পাঁচ সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ যে, জাতপাতের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এরা নাকি মদত দিয়েছে।  দলিতদের হয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া আইনজীবী সুরেন্দ্র গ্যাদলিং, নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান সোমা সেন, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক সুধীর ধাওয়ারলে, দিল্লির জেএনইউ’র একসময়ের ছাত্র, সমাজকর্মী রোনা উইলসন এদের অন্যতম। এ তালিকায় আরো অনেকেই ছিলেন, যাদের ভূমিকা সমাজকর্মী হিসেবে উল্লেখযোগ্য। আগস্টে আরো কয়েকজন মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ, লেখক-কবি ভারাভারা রাও, শিক্ষাবিদ ভার্নান গঞ্জালেভেসও রয়েছেন। গৃহবন্দি রাখা হয় গৌতম নওলাখাকে। গোটা দেশেই প্রতিবাদ হয় এ ঘটনার। গিরিশ কার্নাডের মতো নাট্যকর্মীরা পথে নামেন। কিন্তু পুলিশি সক্রিয়তা এতে আরো বৃদ্ধি পায়, চার্জশিটে জানানো হয়, ধৃতরা নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এরা ‘এলগার পরিষদে’র সভায় প্ররোচনামূলক ভাষণ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই পরিষদ মুম্বাই হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিজি কোলসে ও পই বি সবন্ত তৈরি করেছিলেন সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, সম্প্রীতি প্রচারের জন্য। পুলিশ আদালতে জানায়, এরা মাওবাদী কার্যকলাপে যুক্ত এবং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে মারার চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত! মহারাষ্ট্রের পুলিশপ্রধান সাংবাদিক সম্মেলনে এদের ‘নকশাল’ বলে উল্লেখ করেন। যেসব ধারায় এদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, যার দরুন আদালতেও এদের জামিন হয়নি। সম্প্রতি অমিত শাহদের আনা আইন, ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী ঘোষণার অধিকার রাষ্ট্রের হাতে থাকার আইনি ক্ষমতা আসলে বিরুদ্ধ স্বরকে দমনের নির্লজ্জ প্রকাশ। ইউএপিএ সংশোধনীর সূত্রে স্বভাবতই ব্রিটিশ কালাকানুন রওলাত আইনের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯১৯-এ ব্রিটিশ বিচারপতি রওলাট সাহেবের প্রস্তাবক্রমে এই ‘নৈরাজ্য ও বৈপ্লবিক অপরাধ আইন ১৯১৯’ আইনসভায় পাস হয়, এটি ছিল ১৯১৫-এ ভারত রক্ষা আইনের সংশোধনী। আজ আবার এক সংশোধনী ফ্যাসিস্ট শাসকের স্বরূপ প্রকাশ করছে। এই আইনেও দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে, অভিযোগকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে সে নির্দোষ!

স্বাভাবিকভাবেই এই ফ্যাসিস্টদের কাছে প্রধান প্রতিপক্ষ প্রগতিশীল বামপক্ষ। কিন্তু সংসদীয় সমীকরণে আজ কিছুটা হলেও পিছু হটতে হয়েছে এই শক্তিকে। অথচ জনগণের জীবন-জীবিকা, স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখতে হলে বামশক্তির কোনো বিকল্প নেই, এটি ধ্রুব সত্য। 

 

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী

জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads