• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads

সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা : মানবতা যখন ভূলুণ্ঠিত

  • প্রকাশিত ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

একসময় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ও গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে পরিচিত মিয়ানমারের শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চি আজ বিতর্কিত। নিজ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই অগ্নিকন্যা স্বৈরাচার সেনাবাহিনীর মদতপুষ্ট হয়ে অসহায় ভাগ্যবিড়ম্বিত সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জাতি নিধনে মনোযোগী হলেন। এখনো রাখাইন বা আরাকান রাজ্যে জন্ম নেওয়া লোকদের যে হারে নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ করা হচ্ছে তা তথ্য ও প্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সারা বিশ্ববাসী দেখতে পাচ্ছে। বিবেকবান মানুষ এই দৃশ্যগুলো দেখে কি শান্তিতে ঘুমাতে পারবে? জাতিসংঘ বলছে ‘জাতিগত নিধন’। আবার কেউ কেউ বলছে ‘গণহত্যা’। মানব ইতিহাসে গণহত্যা কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। জাপানি কিশোরী মিস মুরাতো এবং আনা ফ্রাংকের ডায়েরির মাধ্যমে হিরোশিমা এবং নাৎসি বাহিনীর জঘন্যতম ইতিহাস পড়লে আমাদের শরীর আজো শিহরিত হয়। যদিও গণহত্যা গবেষণার বিষয়, আজো গণহত্যা হয়ে চলেছে। মৃত্যুর সংখ্যাও সুনির্দিষ্ট নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পাঁচ থেকে আট কোটি লোক মারা যায়, যার মধ্যে শুধু হিরোশিমায় প্রায় ৬০ হাজার, নাগাসাকিতে ৪০ হাজার রয়েছে। চীনের রাজধানী নানকিংয়ে দেড় লাখ জাপানি সৈন্যদের দ্বারা প্রায় চার লাখ চীনা হত্যা এবং হাজার হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয়। হিটলার বাহিনী কর্তৃক ষাট লাখ ইহুদী গণহত্যার শিকার হয়। রুয়ান্ডার টািস ও হুটুর মধ্যে পনেরো বছরে প্রায় পাঁচ লাখ সংখ্যালঘু গণহত্যায় নিহত হয়। কম্বোডিয়ায় বৌদ্ধদের হাতে পাঁচ থেকে সাত লাখ মানুষ গণহত্যায় মারা যায়। বেলজিয়ামের কুখ্যাত রাজা দ্বিতীয় লিওপোন্ডোর হাতে প্রায় এক কোটি মানুষ ভয়াবহ অত্যাচার, অঙ্গচ্ছেদ এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। নব্বইয়ের দশকে বসনিয়া ও কসোভোয় মুসলমানদের ওপর যুদ্ধজয়ের কৌশল মনে করে মেয়েদের ধর্ষণ ও গণহত্যা চালায় সার্বীয় বাহিনী। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত গণহত্যা চালিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা। যারা গণহত্যা চালায়, তারা কখনো এটা স্বীকার করতে চায় না বরং তারা বলতে থাকে, শান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে কাজ করছে তাদের বাহিনী, যেটা আজ মিয়ানমার সরকার বলছে। অথচ আইনস্টাইন ও তার পরিবার এবং ইহুদিরা একসময় সারা পৃথিবীতে শরণার্থী ছিল। আজ তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এক কোটি পূর্বপুরুষ ১৯৭১ সালে ভারতে শরণার্থী ছিল। আমরাও ঘুরে দাঁড়িয়েছি। সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সম্মানের সাথে বেঁচে আছি এবং শরণার্থী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছি, এটাই বাস্তবতা।

বর্তমান আরাকান মিয়ানমারের একটি অঙ্গরাজ্য। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্বাংশে অবস্থিত এবং অতি প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বঙ্গোপসাগর এবং নাফ নদীর দক্ষিণ-পশ্চিম মোহনাবেষ্টিত আরাকান-ইয়োমা নামে দীর্ঘ পর্বত শৃঙ্গ আরাকানকে মিয়ানমারের অন্য অংশ থেকে আলাদা করেছে। ১৭৮৪ সালে বোদাউপায়ার সময়ে আরাকান রাজ্য বার্মা পর্যন্ত বর্ধিত করা হয় এবং ১৮২৬ সালে এটি ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের অংশে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এটি সাময়িকভাবে জাপানের দখলে ছিল। ১৮৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৪৬ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল তখন আরাকানের মুসলিম নেতারা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাদের পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করতে আগ্রহ দেখাননি। ব্রিটিশরা বার্মার স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী একশ ঊনচল্লিশটি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করলেও তখন ওই তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এটা ব্রিটিশদের ইচ্ছাকৃত ভুল নাকি অপকৌশল, প্রশ্ন রয়েই যায়। আরাকানের মুসলমানদের একাংশের নেতা কাশেম রাজা তাদের জাতিগত অধিকার প্রশ্নে বিদ্রোহ করেন। তবে তা সার্থক হয়নি। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের চলে এসে কারারুদ্ধ হন। তখন রোহিঙ্গারা শক্তিহীন হয়ে পড়ে। বর্মি সরকার অভিযোগ উত্থাপন করে যে, রোহিঙ্গারা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সদ্য অভিবাসিত একটি উপজাতি। অতএব তাদের স্থানীয় আদিবাসী গণ্য করে বর্মি শাসনতন্ত্র অনুযায়ী বার্মার নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী বার্মার নাগরিকত্ব দেওয়া যায় না। মূলত বার্মার প্রকৃত নাগরিক না হওয়াটাই রোহিঙ্গাদের বার্মা থেকে বের করে দেওয়ার মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়। বার্মার স্বাধীনতা লাভের ছয় মাস আগে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও প্রতিষ্ঠাতা সু চির পিতা এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীসহ আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ১৯৬২ সালের ২ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল নে উইন বার্মার ক্ষমতা দখল করেন। সেই সামরিক জান্তাও সু চিকে দীর্ঘ পনেরো বছর গৃহবন্দি বা কারারুদ্ধ করে রাখেন। সামরিক জান্তা তখন থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তাদের দমন এবং বিতাড়ন শুরু করেন। ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী সু চি ভবিষ্যতে যেন ক্ষমতার ভাগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, সেজন্য ২০০৮ সালে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার চারভাগের একভাগ আসন সেনাবাহিনী নিজেদের জন্য সংরক্ষণ করে এবং বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করলে ও তার সন্তান অন্য দেশের নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না বলে সংবিধান সংশোধন করা হয়। উপরন্তু তিনটি মন্ত্রণালয় (স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত বিষয়ক) সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের চেয়ে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বেশি। দেশটির গণতান্ত্রিক সরকারকে সাসপেন্ড করার ক্ষমতা ন্যাশনাল ডিফেন্স অব সিকিউরিটি কাউন্সিলের হাতে রাখা হয়। যেটির ১১টি আসনের ৬টিই আবার সেনাবাহিনীর নিয়োগ করা। একটি ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ তাদের জন্য সংরক্ষিত। সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজন চার ভাগের তিন ভাগ আসন। বেসামরিক সরকার একাট্টা হলেও সামরিক বাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন। সুতরাং সু চি রোহিঙ্গা নির্যাতনে চুপ করে থাকা অথবা নিজে পদত্যাগ করা ছাড়া আর বেশিকিছু করতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, বর্তমান অর্থনৈতিক উপনিবেশ সৃষ্টির যুগে কফি আনান রিপোর্ট, জাতিসংঘ-প্রস্তাব কিংবা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ— কিছুই কাজে আসবে না, যতক্ষণ আর্থসামাজিকভাবে সমৃদ্ধ পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাদের ফ্যাসিবাদী উপনিবেশ ধ্যান-ধারণা থেকে বের না হবেন। আর সে জন্যই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের উচিত হবে চীনের ভূমিকাকে আমলে নিয়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া।

মো. কায়ছার আলী

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads