• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
ads

সম্পাদকীয়

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতা জরুরি

  • আফরোজা পারভীন
  • প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

 

সব দেশেই কম-বেশি সমস্যা থাকে। তা সে উন্নত দেশই হোক আর অনুন্নত দেশ হোক। হয়তো সমস্যার আকার-প্রকার ভিন্ন। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা প্রায়ই এক। বেকারত্ব, জনংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্নীতি, সম্পদের অসম বণ্টন— এগুলো মোটামুটি সব দেশেই আছে। আমাদের দেশের আছে আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা ‘যানজট’। যানজট অর্থনীতির ওপর ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। অসংখ্য শ্রম-ঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। আর আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যার ওপর মানুষের কোনো হাত নেই।

এবার এসব সমস্যার চেয়েও প্রকট আকার নিয়েছিল ডেঙ্গু। জাঁকিয়ে বসেছিল দেশজুড়ে। ঋতুভেদে যে বৈচিত্র্য ছিল বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনে তা এখন আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে দাবদাহে পুড়েছে দেশ। মানুষ বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছে। বৃষ্টি নেমেছে। এতটাই নেমেছে যে প্রবল বন্যা হয়ে গেছে, সঙ্গে নিয়ে এসেছে ডেঙ্গু। প্রথমদিকে ডেঙ্গু হয়নি, গুজব ছড়িয়েছে এমন একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর গিজগিজে ভিড় প্রমাণ করে দিয়েছে ডেঙ্গু আসলেই কতটা ভয়ানক আকার নিয়েছিল। চেনাজানা অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, কেউ কেউ মারা গেছেন। যাদের চিনি না, তাদের খবর জানতে পারিনি। কিন্তু ডেঙ্গুর ভয়াবহতা যে মারাত্মক আকার নিয়েছিল তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

বর্ষা মানে যেমন কবিতা লেখা, বিছানায় গা এলিয়ে জানালা দিয়ে অঝোর বৃষ্টি দেখা, কদম ফুল, ঘনঘুম; তেমনি বর্ষা মানে জলবাহিত রোগ ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া। তাই বর্ষা যেমন একদিকে শান্তি আর স্বস্তির, তেমনি শঙ্কারও। দরকার প্রয়োজনীয় সচেতনতা, সতর্কতা আর সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

আপাতদৃষ্টিতে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি মনে হলেও ঢাকার বাইরেও এ রোগের প্রকোপ কম ছিল না। প্রতিদিন এই মশাবাহিত ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে গড়ে পাঁচশ মানুষ। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। তাছাড়া ঈদুল আজহায় বিপুুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়েছিলেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার জন্য, কোরবানি করার জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন তারা। এদের মধ্যে কারো কারো ডেঙ্গুর সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। আর তাদের মাধ্যমে এই ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। বড় রকমের ডেঙ্গু ঝুঁকিতে পড়েছিল দেশের মানুষ। কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে এ বিষয়ে ঈদের আগে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিউিউটের পরিচালক অধ্যাপক মেহেরজাদী সাব্রিনা ফ্লোরা বলেছিলেন, ‘ঢাকা থেকে যারা যাবেন তাদের মধ্যে একটা অংশ কোনো না কোনোভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। এদের মধ্যে কারো হয়তো জ্বর থাকবে, কারো হয়তো তখনো জ্বর থাকবে না। কিন্তু পরে জ্বর হতে পারে। তাই এটা প্রতিরোধে কারো যদি জ্বর থাকে, তাহলে তিনি যেন ভ্রমণ না করেন। জ্বর থাকলে যেন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন যে, এটা ডেঙ্গু কিনা।’

বিষয়টি মারাত্মক। এমনও হতে পারে, কারো কারো হয়তো যাওয়ার আগে জ্বর হয়নি; কিন্তু তার মধ্যে ইনফেকশন ঢুকেছিল। জ্বর না হওয়ায় তিনি টের পাননি। তিনি হয়তো চলে গেছেন। এটা নিশ্চিত যে, বাড়ি যাওয়ার আগে ঢাকার প্রতিটি মানুষ রক্ত পরীক্ষা করিয়ে যাননি। শরীরে ডেঙ্গুর ভাইরাস রয়ে গেছে কিনা সেটা নিশ্চিত হয়ে যাননি। বরাবর যেমন যান সেভাবেই গেছেন। এভাবে ভাইরাস দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলে গেছে।

এডিস মশা শহরকেন্দ্রিক। সাধারণত এ মশা একশ থেকে চারশ মিটারের বেশি উড়তে পারে না। কাজেই দূরবর্তী গ্রামে এ মশা সহজে যাবার কথা নয়। কিন্তু পরিবহনের মাধ্যমে এ মশা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে। কাজেই কত এডিস মশা এই ঈদ উপলক্ষে পরিবাহিত হয়ে গ্রামে চলে গেছে কে জানে!

সব ধরনের ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবার প্রয়োজন পড়ে না। কিছু ডেঙ্গু সহজেই সেরে যায়। কিন্তু কোনো কোনো ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সারা দুনিয়ায় প্রায় ১৯০ মিলিয়িন ডেঙ্গু আক্রান্তের কথা নথিভুক্ত হয়েছে। ৯৬ মিলিয়ন রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে।

কাজেই ডেঙ্গুর লক্ষণ সম্পর্কে সবারই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। জানা দরকার কী কী লক্ষণ দেখা গেলে ডেঙ্গু সন্দেহ করা যেতে পারে। প্রধান প্রধান লক্ষণ হচ্ছে, ধুমজ্বর, গায়ে র্যাশ বের হওয়া, অসহ্য মাথা ব্যথা, চোখের আশপাশে ব্যথা, পেশি আর গাঁটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, খিদে না পাওয়া, জ্বরের তিন-চার দিন পর ঘাড়ের কাছে গোলাপি রঙ হওয়া।

কারো কারো ক্ষেত্রে এর একটি উপসর্গ, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে এক বা একাধিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই যে কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডাক্তারের পরামর্শমতো রক্ত পরীক্ষাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়াও দরকার। তবে রোগ হওয়ার পরে এর প্রতিকার না করে, রোগ যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা বিশেষ প্রয়োজন। পানি জমা রয়েছে এরকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মশা ডিম পাড়তে পারে, এরকম পরিষ্কার পানি জমিয়ে রাখা উচিত নয়। যাদের একবার ডেঙ্গু হয়েছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদের কম। তাদের আবার সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। তাদের অধিক সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মশারি টাঙিয়ে শোয়া, মশারিতে জাল দিয়ে রাখা, ফুলহাতা জামা পরা, মশার কয়েল জ্বালিয়ে রাখলে ডেঙ্গুর আশঙ্কা কমবে।

সরকার ডেঙ্গু সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সচেষ্ট রয়েছে। মাঝে মাঝেই মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। জঙ্গল পরিষ্কার করা হচ্ছে। তবে বস্তি এলাকায় এবং জলাশয়ের পাশে অধিক ওষুধ ছিটানো দরকার। ঢাকার অলিতে-গলিতে ওষুধ আরো ব্যাপকভাবে ছিটাতে হবে। সরকার দেশজুড়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালিয়েছে। ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে বা ডেঙ্গু ধরা পড়লে কী করতে হবে, সে বিষয়ে একটা গাইডলাইন সর্বত্র পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এটা ঠিক যে, এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে নজরদারিতে রাখা সম্ভব নয়। তাই জনগণকেই সচেতন হতে হবে। ফুলের টব এবং কনটেইনারে রাখা মানিপ্লান্ট জাতীয় গাছের পানির ব্যাপারে সতর্কতা প্রয়োজন। কলসি, বদনা, বালতি বা অন্য কোনো পাত্রে যেন পানি জমে না থাকে সেটাও দেখা দরকার।

শুরু করেছিলাম দেশের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে। এবার অন্যান্য সমস্যার চেয়ে ডেঙ্গুর সমস্যা প্রকট। যদিও ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে এখনো নির্মূল হয়নি। বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর আরেকটা বড় ধাক্কা আসতে পারে। তাছাড়া যারা একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বার বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে তরল পানীয় খাওয়া। ডাবের পানি, লেবুর শরবত, স্যুপ পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়া দরকার। শিশুদেরও খাওয়ানো দরকার। ডেঙ্গুতে জীবনের ঝুঁকি আছে। তাই প্রয়োজন সর্বোচ্চ সাবধানতা।

গ্রামাঞ্চলে প্রচার-প্রচারণা ও নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়, যেমন— ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনকে এ বিষয়ে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। জনপ্রতিনিধি, ইউএনও এবং এলাকার শিক্ষক ও মসজিদের ইমামদের এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে হবে। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগের মাধ্যমে ডেঙ্গুবিষয়ক প্রচার জোরদার করা দরকার। স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে জরুরিভিত্তিতে ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখামাত্র রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একবার ডেঙ্গুতে অনেক প্রাণ ক্ষয় হয়েছে আর যেন না হয়, সেদিকে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

 

লেখক : কথাসাহিতিক, সাবেক যুগ্ম সচিব

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads