• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬
ads

সম্পাদকীয়

ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা এবং কিছু কথা

  • মো. আখতার হোসেন আজাদ
  • প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সংবাদপত্র বা সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ বা আয়নাস্বরূপ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে অভিষিক্ত করেছেন। আবার ক্যাম্পাসভিত্তিক সাংবাদিকতাকে সাংবাদিকদের আঁতুর ঘর বলা হয়ে থাকে। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে থাকে। বিভিন্ন সভা, সেমিনার, জাতীয় দিবস উদযাপনসহ ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন খবর নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকে তারা পত্রিকা অফিসে সরবরাহ করে এবং তা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

সুশীল সমাজ খ্যাত আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজের শিক্ষকরা স্বাধীন সাংবাদিকতা, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার কথা উচ্চস্বরে উচ্চারণ করে থাকলেও আত্মিকভাবে নিজ নিজ ক্যাম্পাসের সাংবাদিকদের মুখপাত্র হিসেবেই কাছে পেতে চান। ক্যাম্পাসের নেগেটিভ নিউজ প্রকাশিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের ওপর পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টিও করা হয়ে থাকে। শুধু তা-ই নয়; কখনো কখনো কথাবার্তার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হুমকিও প্রদান করা হয়ে থাকে।

এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে কথায় কথায় উঠে এলো তার নিজ বিভাগের এক শিক্ষকের নৈতিক স্খলনজনিত একটি রিপোর্টের বিষয়ে। রিপোর্টটি লেখার সময় সেই শিক্ষকের মতামত জানতে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি বলেছিলেন, নিউজ করবা ভালো কথা। নিজের দিকে খেয়াল রেখে নিউজ করবা। তুমি আগে ছাত্র, পরে সাংবাদিক। কথাটা যেন মনে থাকে। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। শিক্ষকদের কোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি করা হয় তাহলো, আপনি বা তুমি কোন বিভাগের ছাত্র? উদ্দেশ্য একটাই; সেই বিভাগে কোনো পরিচিত শিক্ষক থাকলে তার মাধ্যমে বিষয়টিকে চাপা দেওয়া। কখনো বা নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাংবাদিক শিক্ষার্থীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তাও করা হয়ে থাকে, যার সর্বশেষ শিকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া।

এত গেল প্রশাসনিক চাপের কথা। শুধু দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি সাংবাদিকতা বেছে নেন। কিন্তু এই নবীন সাংবাদিকরা থাকেন নিরাপত্তাহীন। ক্যাম্পাস-সাংবাদিকদের রাজনৈতিক চাপ দেওয়ার মাধ্যমেও দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটই যেন এমন! যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তখনই তারা সাংবাদিকদের নিজেদের মুখপাত্রে পরিণত করার প্রয়াস পান। সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নানা অপকর্মের কথা, ক্যাম্পাসে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, নারী কেলেঙ্কারি, হলের সিট দখলের খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলেই শুরু হয় বিভিন্ন কায়দায় হুমকি-ধমকি। প্রকাশিত খবরের জেরে সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা হামলার বহু নজিরও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিগত বছর দুয়েকের মধ্যে অন্তত ৩০টির মতো হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা অজানা এক কারণে শাস্তির সম্মুখীন হয় না; সাময়িক বহিষ্কারের নামে একটি চোখেপর্দা দেওয়া হয় মাত্র।

এসব কথার সঙ্গে আরেকটি কথা না বললেই নয়। বিভিন্ন আদর্শকে ধারণ করে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। শুধু রাজনৈতিক ভিন্ন ধারার মতালম্বী আদর্শ লালনের জন্য নানা ইস্যুতে বিভিন্ন শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা ছাত্রনেতারা ক্যাম্পাস-সাংবাদিক কর্তৃক হলুদ সাংবাদিকতারও যে শিকার হয়েছেন, এমন নজিরও খুব কম পাওয়া যাবে না। চাপে পড়ে হোক কিংবা অন্য কোনো স্বার্থেই হোক; সাংবাদিকদের নিজের নৈতিকতা চরিতার্থ করার ঘটনাও বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে। যেহেতু সাংবাদিকরা সমাজের আয়নাস্বরূপ, সুতরাং তাদের স্বচ্ছ মনের অধিকারী হতে হবে, তাতে সে যে দল বা মতেরই হোক না কেন। একজন সাংবাদিকের কোনো রং থাকা উচিত নয়। জীবাণুমুক্ত নিরাপদ স্বচ্ছ পানির মতো তার হওয়া উচিত।

আরেকটি আশঙ্কাজনক দিক যে, এক দশক আগেও অনলাইনভিত্তিক সংবাদ পোর্টালগুলোর এতটা প্রচলন ছিল না। তখন মানুষ আগের দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা কাগজে ছাপা পত্রিকা পড়েই জানত। কিন্তু তাৎক্ষণিক খবর জানতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল যেভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে; ঠিক সেভাবে বেড়েছে ভুঁইফোঁড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল। এসব পোর্টালের অধিকাংশ খবর প্রকাশ করা হয় ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক; যার ফলে মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। এসব সংবাদমাধ্যমে খবর পাঠিয়ে ক্যাম্পাসে যেভাবে সাংবাদিক বেড়ে উঠছে, এখনই এটি রোধ করতে না পারলে কিছুদিন পর ঘরে ঘরে সবাই নিজেকে মিডিয়াকর্মী হিসেবে পরিচয় দিবে। এসব অনলাইন পত্রিকাগুলোর অধিকাংশেরই নিবন্ধন নেই। আবার এসব পত্রিকায় যারা সংবাদ পাঠায়, তারা নামে-বেনামে গড়ে তোলে বিভিন্ন সংগঠন। সাংবাদিকতার প্রকৃত আদর্শ ও সুনাম বিসর্জন দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করে সাময়িক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচিত ক্যাম্পাসের সাংবাদিকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কর্তৃক পরিচয়পত্র (আইডিকার্ড) প্রদান করা। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের উচিত সৎ, দক্ষ, চৌকস নিজ নিজ ক্যাম্পাস প্রতিনিধিদের পুরস্কৃত করা। ক্যাম্পাসের কার্যক্রমকে গতিশীলতা করতে, জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের স্বাধীন পেশায় বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ প্রদান করা উচিত নয়। কিন্তু মাঝে-মধ্যেই প্রভাবশালী মহল থেকে সংবাদপত্র বা সংবাদকর্মীদের ওপর অত্যাচার নেমে আসে যা অন্তত কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়। তবে সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাংবাদিকদের উচিত সততা ও বস্তুনিষ্ঠতা নীতিতে অবিচল থেকে সত্য প্রকাশে আপসহীন পথ অবলম্বন করা এবং সবুজ তথা ইতিবাচক সাংবাদিকতার ধারা অব্যাহত রাখা।

 

লেখক : শিক্ষার্থী ও সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads