• মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

চেতনা ও সামাজিক বিপ্লবের প্রতীক মীনা

  • প্রকাশিত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মো. কায়ছার আলী

 

হূদয়ের সব আকুতি-মিনতি ভরা গানটির (আবেদনের) পর সর্বপ্রথম ২০১৫ সালে নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন ঝালকাঠি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী (সাহসী নারী) শারমিন আক্তার সমাজের ক্ষতিকর প্রথা বাল্যবিয়ে ও জোরপূর্বক অসম বিয়ে ঠেকিয়ে ২৯ মার্চ ২০১৭ ওয়াশিংটন ডিন এচেসন মিলনায়তনে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের হাত থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’ পদক পাওয়ায় তাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। কৃতজ্ঞতা জানাই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রং লাল-সবুজ শাড়ি পরে পুরস্কার গ্রহণ করায়।

‘আমার নাম মীনা। আমি বাবা-মায়ের শত আদরের মেয়ে, আমি বড় হই সকলের ভালোবাসা নিয়ে।’ আমার গ্রামের নাম কালনা। আশপাশে রয়েছে কামঠানা, চরকরফা, তেঁতুলিয়া, আমডাঙ্গা। আমাদের গ্রামে অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত। তারা সভ্যতার আলো থেকে অনেক দূরে। বিদ্যুৎ নেই, ব্যাটারি দিয়ে দু-একটি বাড়িতে টেলিভিশন চলে। প্রয়োজনের তুলনায় স্কুল ও কলেজ খুবই কম। গ্রামের দু-একজন শিক্ষিত লোকের চেষ্টায় আজ গ্রামের অনেকেই স্কুলে যায়। সন্ধ্যা হলে আগে যেখানে হইহুল্লোড় শোনা যেত, আজ সেখানে কেউ কেউ সুর ধরে কবিতা আবৃত্তি করে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে এই গ্রামে। এখন আমার সঙ্গে মেয়েরাও স্কুলে যায়। এই গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ, জোছনা রাত, আকাশের পূর্ণিমার চাঁদ, পাখির ডানা মেলে উড়ে যাওয়া, শরৎকালে নদীর বুকে ফুটে থাকা কাশফুল, ফাগুনের কৃষ্ণচূড়া, শিমুল-পলাশ থোকায় থোকায় ফুটে থাকা, মৃদুমন্দ বাতাস, নদীর কুলকুল শব্দ, ঢেউয়ে ঢেউয়ে পাল তুলে ভেসে যাওয়া নৌকা, মাঝির মুখে ভাটিয়ালি গান— এ সবকিছু ছেড়ে আমার ওই যান্ত্রিক সভ্যতার শহরে যেতে ইচ্ছে করে না। আমি শুনেছি শহরের মানুষ নাকি ভালো না। চোখের পলকে মানুষ খুন করে, নিজেকে নিয়েই সবাই ব্যস্ত থাকে, কেউ বিপদে পড়লে বা ছিনতাইকারীর কবলে পড়লে ভয়ে কেউ এগিয়ে আসে না, নেই খোলা মাঠ, নেই গাছপালা, আছে শুধু বাতাসে গাড়ির ধোঁয়ার গন্ধ, বড়লোকের ফেলে দেওয়া খাবার গরিবেরা নাকি কুড়িয়ে খায় এবং রাস্তার ওপর নাকি মানুষ ঘুমোয়। মানুষ আর মানুষ নাকি গিজগিজ করে। তাদের চলাফেরা বা জীবনবৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ। আমার ভালো লাগে গ্রামের মেঠোপথ, রাস্তার দু’ধারে নাম-না-জানা বনফুলের সমারোহ। মন ভালো হয়ে যায় মাতাল করা বনফুলের ঘ্রাণে। দেখতে ভালো লাগে ভোরবেলায় পাতার ওপর পড়া চকচক করা শিশির। শুনতে ভালো লাগে পাখির কলকাকলি। গ্রামের আর দশটা মেয়ের মতো আমিও খুব সাধারণ একটি মেয়ে।

ওহ্! আমার জন্মদিনটি এতক্ষণ বলতে ভুলেই গেছি। আমার জন্মদিন ২৪ সেপ্টেম্বর। শুনেছি লোকেরা বলে ‘মীনা দিবস’। মেয়েদের আর্থসামাজিক ভিত্তি সুদৃঢ়করণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সুনিশ্চিত এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করে সব ধরনের বৈষম্য দূরীভূত করার সম্মিলিত প্রয়াস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সার্ক ১৯৯০-এর দশককে কন্যাশিশু দশক হিসেবে ঘোষণা করে। কন্যাশিশু দশকের উদ্দেশ্যকে সফল করে তোলার লক্ষ্যে ইউনিসেফ ও এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে ব্যাপক প্রচার এবং গণযোগাযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে এই কর্মসূচি সৃজনশীল গণযোগাযোগ কার্যক্রমে পরিণত হয় এবং মেয়েদের বিষয়ে প্রাচীন ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মেয়ে শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করে শিক্ষাসহ জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে মেয়েশিশু ইস্যু আরো জোরদার করে তোলার প্রতীক হিসেবে সার্ক প্রতিবছর আমার জন্মদিনকে ‘মীনা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। কার্টুন, কমিকসের বই, শিক্ষা উপকরণ, নাটিকা ও অন্যান্য প্রচারের মাধ্যমে শিশুদের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা সর্বোপরি মেয়ে-ছেলে বৈষম্য বিলোপ করে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এই দিবসের উদ্দেশ্য। একদিন চমৎকার একটি সকালে আমি আমার মায়ের কাছে জানতে চাইলাম রাজু, রানি এবং আমি নিজে জন্মানোর আগে আমার মা কী কী খাবার খেয়েছিলেন। আমি যখন আমার মায়ের গর্ভে ছিলাম, সে সময়টায় দাদি আর বাবা সবসময় খেয়াল রাখতেন মা যেন প্রচুর খাবার, হলুদ রঙের ফলমূল, রঙিন শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, আয়োডিনযুক্ত লবণ খান এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেন। প্রসবপূর্ব চেকআপের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াত করতেন এবং জন্মের সময় একজন দক্ষ ধাত্রী উপস্থিত ছিলেন। জন্মের কয়েক মিনিট পরেই আমাকে মায়ের প্রথম দুধ বা শালদুধ খাওয়ানো হয়েছিল যা খেলে শিশুকালে সুস্থ থাকা এবং বিভিন্ন রোগব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। শিশুর মুখে তেল বা মধু দেওয়া ঠিক নয়। মা নিয়মিত সবকিছু করায় আমি সুস্থভাবে ও স্বাভাবিক ওজনে জন্মেছিলাম। তখন বাবা আমাকে আনন্দে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। প্রত্যেক শিশুর মতো প্রথম বছরে চারবার টিকা নিয়েছিলাম। ছয় মাস পর মায়ের দুধের পাশাপাশি সামান্য তেল, ডাল ও শাকসবজি দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি, চটকানো কলাও খেয়েছিলাম। একদিন আমি একটি লম্বা গাছে চড়ে একটা আম পাড়লাম, পরে আমটি মাকে দিলাম। যদিও আমটি আমি পেড়েছিলাম কিন্তু মা রাজুকে বড় অংশ খেতে দিল। রাতের বেলা খাওয়ার সময় মা রাজুকে একটি ডিম খেতে দিল। মিঠু ডিমটি দুই ভাগ করে একভাগ আমার থালায় দিল। মিঠুর সঠিক কাজটি তাদের ভালো লাগল না। মা পুনরায় ডিমটি রাজুকে দিতে বললেন। তখন দাদি বললেন, মেয়েদের এত খাই খাই স্বভাব কেন? বাবা বললেন, দুজনে বড় হচ্ছে দুজনের সমান খাবার দরকার।

গ্রীষ্মের এক গরমে বিকেলে দাদির পাশে রানিকে শুইয়ে দিয়ে মা, আমি এবং রাজু শহরে গেলাম। শহরে কীভাবে রাস্তা পার হতে হয় তা আমরা শিখলাম। এদিকে ঘুমিয়ে থাকা রানি ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে হাঁটতে অল্পের জন্য পুকুরে পড়ে যায়নি। মা পরে রানির পায়ে ঘুঙুর বেঁধে দিল, যাতে বোঝা যায় সে কোন দিকে যাচ্ছে। বাবা ধানের পোকা মারার বিষ ফেলে রেখেছিল। ভাগ্য ভালো যে রানি তা ভুল করে মুখে দেয়নি। বাড়ির সবাই মিলে শিশুদের কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, তার জন্য কাজ করা শুরু করলেন। আমার বন্ধু চম্পা কাগজ দিয়ে পাখি, নৌকা ও উড়োজাহাজ বানাতে পারে। তা দেখে সবাই আনন্দে নাচতে ও গাইতে শুরু করলাম। এক ছুটির দিনে আমি ও রাজু বাড়ির কাছে বনে ঘুরতে গেলাম এবং দেখলাম বাগানের মধ্যে গাছের ডালে একটি পাখির বাসা। মা-পাখিটা ডিমে তা দিচ্ছিল। কয়েকদিন পর সকালে গিয়ে দেখি পাখিটার বাসায় দুটি বাচ্চা। রাজু বলল, বল তো কোনটা পোলা আর কোনটা মাইয়া? আমি বললাম, সেটা বড় কথা নয়, দেখবে কয়দিন পরে ওরা দুজনে আকাশে উড়বে। একদিন দেখলাম, একটি ছেলে খোলা জায়গায় বহমান নদীর পাশে পায়খানা করে পানি দূষিত করছে। তার বাবা রিকশাওয়ালা কিন্তু রাতে বয়স্ক স্কুলে পড়তে যাওয়ার অনুরোধ করি এবং তার মাকে আত্মকর্মসংস্থানের পথ দেখিয়ে দিই। তার পাঁচ ছেলে দুই মেয়ে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় আর কোনো সন্তান নেবে না। গ্রামের সবাই আমাকে ভালোবাসে। তাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি লেখাপড়া শিখে মানুষের উপকার করব। সেজন্য প্রতিদিন সুমধুর আজানের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির কাজে মাকে সাহায্য করি এবং আমার ইচ্ছা স্কুলের আপার মতো আমিও মাস্টার হব। একদিন নদীতে ডুবে যাওয়া একটি ছেলেকে সাঁতার কেটে বাঁচিয়েছিলাম। সেজন্য ওই ছেলেটির মা আমাকে বুকে জড়িয়ে আদর করল। গ্রামের মানুষের ভালোবাসা আমার সম্পদ।

অনেক রাতে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি। স্বপ্নের মধ্যে দেখি আলাদীনের সেই আশ্চর্য প্রদীপ এখন আমার হয়ে গেছে (সঙ্গে জাদুর মাদুরটিও)। রাজু ও মিঠুকে নিয়ে বাতাসে ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশের সুন্দর গ্রামগুলো দেখতে দেখতে বড়লোকের ছেলেদের মতো প্লেনে চড়ে উড়ে চলছি। জাদুর মাদুর নির্দেশমতো নিচে নেমে প্রদীপটি ঘষা মাত্রই প্রথমে ধোঁয়া, অতঃপর এক বিরাট দৈত্য বেরিয়ে এলো। দৈত্য বলল, আমার সাধ্যের মধ্যে আছে তিনটি ইচ্ছা পূরণ করার ক্ষমতা। আমার প্রথম ইচ্ছা হলো, ‘এই গ্রামে যত খোলা পায়খানা আছে এবং যাদের বাড়িতে পায়খানা নেই তাদের সবার বাড়িতে পায়খানার ব্যবস্থা করে দেওয়া।’ দৈত্য চোখের পলকে তা করে দিল। আমার দ্বিতীয় ইচ্ছা হলো, ‘মানুষ অজ্ঞতার কারণে খাওয়ার আগে, পায়খানার পরে এমনকি কোনো কাজ করার পরে হাতে সাবান দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করা।’ দৈত্য গ্রামে গ্রামে পায়খানায় সাবান ও ছাই রেখে এলো এবং বুঝিয়ে এলো এর উপকারিতা ও অপকারিতা। এবার আমার শেষ ও তৃতীয় ইচ্ছা দৈত্যকে বললাম, ‘প্রত্যেক গ্রামে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে দাও।’ দৈত্য প্রত্যেক বাড়ির পাশে বিশুদ্ধ পানির জন্য একটি করে টিউবওয়েল বসিয়ে দিয়ে সেটিকে ব্যবহার করতে বলল। আমাকে দৈত্য বিভিন্ন খাবারের লোভ, সিনেমায় নায়িকা হওয়ার সুযোগ বা ধনী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি ‘লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু’। স্কুলে গিয়ে আমি আপামণিকে স্বপ্নের কথাগুলো বললাম। তারা সবাই মিলে তা বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতা করল অর্থাৎ আমার ইচ্ছেগুলো পূরণ হলো। আজ পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সমঅধিকার বা ন্যায্য অধিকার রয়েছে। সুতরাং আর কোনো লিঙ্গবৈষম্য নয়।

পরিশেষে পৃথিবীর সব শিশুকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই যারা আমার নীতি, আদর্শ, চেতনা ও সামাজিক বিপ্লবে বিশ্বাস করে। সমাজে প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান, ধনী ও সরকারের কাছে আমার একান্ত বিনীত অনুরোধ- অসহায় অবহেলিত ও গরিব মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে যেন তারা সচেষ্ট থাকেন।

 

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads