• শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

সম্পাদকীয়

জলবায়ু পরিবর্তন : পৃথিবী বাঁচুক আবার নতুন করে

  • প্রকাশিত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সোহেল দ্বিরেফ

 

 

গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক জেনিফার মরগান বলেছেন, ‘বিজ্ঞানীরা অদূর ভবিষ্যতের জন্য যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেসব ঘটনা ইতোমধ্যে অক্ষরে অক্ষরে ঘটতে শুরু করেছে।’ পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম সমস্যা হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রার্দুভাব বৃদ্ধি পাওয়া। যার প্রভাব পুরো জীববৈচিত্র্যে এবং ফসলের ওপর পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব দেশ খুব ঝুঁকির তালিকায় আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে এর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করলেও আশানুরূপ সাফল্যের দেখা এখনো পায়নি। তবে চেষ্টার ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে এবং যথোপযুক্ত কিছু কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আমাদের দেশটি বড় এক ক্ষতির মুখ থেকে রক্ষা পেতে পারে। আমরা খুব ভালোমতো লক্ষ করেছি, গত কয়েক বছরের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বেশি বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে, যেমন— বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদীভাঙন ইত্যাদি। তবে এসবের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বজ্রপাত! যার ছোবলে প্রতিবছর শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কিছু স্বেচ্ছাচারিতার কড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ উপকূলীয় দেশগুলোকে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়েছে, আবাদি জমিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মৌসুমি ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এটা কেন বা কী জন্যে হচ্ছে, তার কারণে খুব সহজেই অনুমেয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করছে চীন। তারপর যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পশ্চিমা দেশগুলোর তেমন কোনো আগ্রহ নেই। কিছু সামাজিক সংগঠন এগুলোর ব্যাপারে আওয়াজ তুললেও তেমন কোনো লাভ হচ্ছে না। ফলে পৃথিবী কঠিন এক সমীকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সম্মেলন করে যারা কার্বন নিঃসরণ কমাতে বলে, ভেতরে ভেতরে তারাই বেশি কার্বন নিঃসরণ করছে। তাছাড়া তারা নেতৃত্ব স্থানে থাকার কারণে কারো কাছে জবাবদিহিও করার প্রয়োজন মনে করে না। তবে আগামী সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ জাতিসংঘের মহাসচিবের এক বিশেষ আহ্বানে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ বিষয়ক সেমিনারে ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ যদি সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তাহলে সেটা বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই বাসযোগ্য পরিবেশ রক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা রাখবে। 

এই জলবায়ু পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটা অভিশাপের মতো কাজ করছে। বায়ুমণ্ডলের নিঃসরিত কার্বনের এক-তৃতীয়াংশই শোষণ করে সমুদ্রের পানি। এভাবে যদি কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়তে থাকে, তাহলে আমাদের এই সোনার বাংলাদেশ আর সুজলা সুফলা দেশ থাকবে না! অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে! ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্র স্তরের উচ্চতা বাড়তে পারে ৬২ সেন্টিমিটার থেকে ২৩৮ সেন্টিমিটার। সার্বিকভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকায় জমে থাকা বরফও ক্রমেই গলতে শুরু করেছে। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে হয়তো আর বেশিদিন লাগবে না। ২০১৫-১৮ সাল ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতার বছর। সে সময়েই সমুদ্র স্তর বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, সময়ে-অসময়ে নদীর দিক পরিবর্তনে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে আরো বহু গুণে। এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের তথ্যমতে, আগামী দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতির তালিকার শীর্ষে থাকবে বাংলাদেশ। এজন্য অনেক গবেষক বাংলাদেশকে পোস্টার চাইল্ড বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। সমুদ্র স্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডও বাড়তে পারে নাটকীয়ভাবে। আর এর পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে কয়লা এবং তেল। একটি বিষয় লক্ষ করলেই দেখা যায়, ঢাকা শহরে ১৯৭১-এ গড় তাপমাত্রা ছিল ২৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০১৬ সালে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ২৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়। সুতরাং বিগত ৪৫ বছরের তাপমাত্রা প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু যে প্রাকৃতিক কারণে এমনটা ঘটছে তা নয় এটা সৃষ্টির পেছনে মানুষের ভূমিকাও কম নয়। যাকে ইংরেজিতে  Anthropogenic বলে। তাছাড়া বিশ্বখ্যাত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্যতম নিদর্শন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন ম্যানগ্রোভ বা সুন্দরবন রক্ষা করতেও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেই দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে, যাতে বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে সেই দক্ষ জনশক্তি দেশের স্বার্থে যথোপযুক্ত কাজটা করতে পারে। প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিশেষ করে অভিযোজন (Adaptation), প্রশমন (Mitigation), প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer) এবং অর্থ বিনিয়োগ (Financial Invest)-এর ব্যবহার সম্পর্কে সবাইকে সর্বোচ্চ দক্ষ করতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে রাষ্ট্রের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও প্রচুর তহবিল গঠন করতে হবে। উপরন্তু এর সঠিক ব্যবহার যেন হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ১৪ শতাংশ ভূমি পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। এভাবে তলিয়ে যেতে থাকলে আস্তে আস্তে একটা সময় পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বাংলাদেশ নামক নামটি মুছে গেলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। অন্ততপক্ষে নিজের দেশকে বাঁচাতে পরিবেশবান্ধব কাজ করার পাশাপাশি বেশি বেশি বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে আমরা সবাই যদি একটি করে বৃক্ষ রোপণ করি, তাহলে একসময় সবুজে সবুজে ভরে যাবে এই দেশ। তদুপরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিছুটা হলেও প্রশমিত করা যাবে। ভৌগোলিকভাবেই আমাদের দেশটি একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তাই এমতাবস্থায় নিজের দেশকে বাঁচাতে অধিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের অপকারিতা এবং বৃক্ষরোপণের উপকারিতা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা এখন আমাদের সামনে নেই।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads