• বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬
ads

সম্পাদকীয়

এই সমাজ ও সামাজিক গণজাগরণ

  • আরাফাত শাহীন
  • প্রকাশিত ১৮ অক্টোবর ২০১৯

কবি নবারুণ ভট্টাচার্য বড় আক্ষেপ নিয়ে লিখেছিলেন, ‘এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’। আমরা যারা আজ জীবিত রয়েছি তারা খুব ভালোভাবেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে মৃত্যু উপত্যকা হিসেবে দেখতে পাচ্ছি এবং এক সীমাহীন বেদনায় প্রতিনিয়ত দগ্ধ হচ্ছি। এখানে প্রতি পদক্ষেপে মৃত্যুর হাতছানি। রাস্তায় বের হলে বাসের নিচে চাপা পড়ে মরার ভয়, কারো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে মার খেয়ে মরার ভয়; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেও তথাকথিত শিক্ষিতদের কাছ থেকে পিটুনি খেয়ে মারা পড়ার ভয় থেকেই যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মৃত্যু আমাদের তাড়া করে ফিরছে। কিন্তু আমরা তো বাঁচতে চাই; মাথা উঁচু করে গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

আবরার ফাহাদ। ফুটফুটে এই ছেলেটা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। কত স্বপ্ন ও আশা নিয়েই না সে নিজ শহর কুষ্টিয়া ছেড়ে ঢাকার বুকে এসে আশ্রয় নিয়েছিল! তার বাবা-মা স্বপ্ন দেখতেন ছেলে একদিন নামকরা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দেশ এবং বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কিন্তু তারা কি ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিলেন, এই বুকের ধন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাবে! এমনটা কেউ ভাবেননি। তবে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন ঘটনা প্রায়শই দেখতে পাচ্ছি। কী দোষ ছিল আবরারের? দেশের পক্ষে কথা বলাই কি ছিল তার অপরাধ? সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। এতে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতই লাভবান হয়েছে বেশি। আবরার এই চুক্তির বিরোধিতা করে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিল। আর এটা মেনে নিতে পারেনি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। যে দেশে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না, তাকে আমরা কীভাবে গণতান্ত্রিক দেশ বলে আখ্যায়িত করতে পারি!

বিশ্ববিদ্যালয় হলো স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চার সবচেয়ে বড় জায়গা। এখানে একজনের সাথে আরেকজনের মতভিন্নতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। জগতের প্রতিটা মানুষ যেমন আকার-আকৃতি এবং গড়নে ভিন্ন প্রকৃতির তেমনি চিন্তাচেতনা এবং বিশ্বাসেও তাদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সুতরাং প্রতিটি বিষয়ে মানুষ তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা নিয়ে এগিয়ে চলে। বিশ্ববিদ্যালয় এই চিন্তার দ্বারকে আরো উন্মোচিত করে দেয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় এর ব্যতিক্রম। বহু বছর হলো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যত নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই। কয়েক মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ গঠিত হলেও সেটা কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এখন দেশে কোনো বিরোধী দলও নেই। ফলে ক্ষমতাসীন দল একতরফাভাবে দেশ পরিচালনা করছে। আর তাদের ছাত্র সংগঠন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

দেশে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের কোনো সুযোগ কি তবে নেই! ভিন্নমত প্রকাশের কারণেই তো আবরারকে জীবন দিতে হলো! মানুষ কতটা নির্মম হলে একটা মানুষকে সারা রাত রুমে আটকে রেখে তার ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন চালাতে পারে! আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই; আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তথাকথিত সতীর্থরা কীভাবে এমন অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে! সিসিটিভির ফুটেজ দেখে অপরাধীদের সহজে চিহ্নিত করা গেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের অতি দ্রুত গ্রেপ্তার করতেও সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বিচার নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কেননা অতীতে এমন বহু ঘটনা দেশে ঘটলেও তার বিচার পাওয়া যায়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাংবাদিক সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের কথা। আজও সেই ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। কী ভয়ানক ও পাশবিক ছিল সে হত্যাকাণ্ড! ফলে আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে সংশয় থেকে যাওয়া অমূলক নয় মোটেও। তার পরও বলব, এখন পর্যন্ত আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আপসহীন মনোভাব আমাদের আশান্বিত করেছে।

আবরার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চেয়ে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মিছিলে মিছিলে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে দাবি উঠেছে, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার জন্য। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর নতুন নতুন বহু তথ্য উঠে আসছে। বুয়েটের প্রত্যেক হলে হলে নাকি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের ‘টর্চার সেল’ রয়েছে। সেখানে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় প্রতিনিয়ত। দেশের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এমন ‘টর্চার সেল’ কিংবা ‘গেস্টরুম’ রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব রুমে নিয়ে গিয়ে নানা রকম হুমকি-ধমকি দেওয়াসহ কথা না শুনলে মেরে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও মাঝেমধ্যে পত্রিকার পাতায় দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ক্ষমতাসীনদের দোর্দণ্ড প্রতাপ এবং নির্যাতনের নানা রকমফের দেখলে আইয়ুব খানের সময়কার কথা মনে পড়ে যায়। সে সময় সরকারের তৈরি করা ছাত্র সংগঠন এনএসএফ শিক্ষার্থীদের ওপর এমন নানামুখী নিপীড়নের রেকর্ড তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস বেশ পুরোনো। মূলত সাতচল্লিশের দেশভাগের পর পরই এদেশে ছাত্র সংগঠনের পথচলা শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। ছাত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতায় পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসকেরা সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকত। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রনেতাদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। এরপর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকা ছাত্ররাই সবার আগে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এদেশে ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের অবক্ষয় শুরু হয়। প্রতিপক্ষ দলের ওপর অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং রাতের আঁধারে খুনখারাবি করার ফলে অস্থিতিশীল হলে পড়ে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো। এই ধারা এখনো চলমান রয়েছে। এখন যেহেতু প্রতিপক্ষ দল মাঠে নেই, তাই তেমন একটা সংঘাত-সংঘর্ষ দেখা না গেলেও হলে সিট বাণিজ্য, ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে নেতাকর্মীরা। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নষ্ট হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ।

আবরারের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল, নৈতিক অবক্ষয়ের কোন পর্যায়ে এসে আমরা পৌঁছেছি। মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে আজ আমরা পশুসম হয়ে গেছি। আমরা সবাই মুখে মুখে মানবিকতা ও মূল্যবোধের বুলি আওড়াতে বেশ পছন্দ করি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। এখন সময় এসেছে এসব নৈরাজ্যের অবসানের। একটি সমাজ এভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। বর্তমানে প্রয়োজন একটা সামাজিক গণজাগরণের। শিক্ষার্থীরা আজ জেগে উঠেছে। আমরা এখনই যদি এই সমাজকে পরিবর্তন করে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে না পারি, তাহলে বসে বসে তার ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেখা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads