• রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬
ads
কোভিড-১৯ হোক শেষ জীবাণু-অস্ত্র

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

কোভিড-১৯ হোক শেষ জীবাণু-অস্ত্র

  • প্রকাশিত ১৯ মার্চ ২০২০

আবু সালেহ মোহাম্মদ সায়েম

 

 

কানাডার ল্যাবরেটরি থেকে ভাইরাস চুরি করে তার জিনের বদল ঘটিয়েছে উহানের বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবরেটরি। এমনটাই দাবি করেন ড. ফ্রান্সিস বয়েল। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়েস কলেজের আইনের অধ্যাপক এবং রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সংগঠনের একজন অন্যতম সদস্য। তিনি জোর গলায় আরো বলেন, সার্স ও ইবোলা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার পরে অভিযোগের আঙুল ওঠে এই গবেষণাগারের দিকেই। রোগ প্রতিরোধ নয়, বরং প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র বানাতেই মত্ত এখানকার গবেষকরা। যার পরিণতি হাজার হাজার মৃত্যু। নোভেল করোনা ভাইরাসের জিনগত বদল ঘটানো হয়েছে এবং উহানের এই ল্যাবরেটরি থেকেই যে ভাইরাস ছড়িয়েছে এটা জানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অথচ উহানের এই বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবরেটরিকে সুপার ল্যাবরেটরির আখ্যা দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বলা হয়েছিল, এই ল্যাবে ভাইরাস নিয়ে কাজ হলেও তা অনেক বেশি সুরক্ষিত ও নিরাপদ। ল্যাবরেটরির জন্যই রয়েছে আলাদা উইং যার বাইরের পরিবেশের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।

মার্কিন সিনেটর টম কটন এক টুইট বার্তায় নিশ্চিত করেছেন, নোভেল করোনা ভাইরাস রাসায়নিক মারণাস্ত্র। তিনি দাবি করেন, চীন জীবাণুযুদ্ধের জন্য বানাচ্ছিল ওই ভাইরাস। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কথাটা লুকোতে চাইছেন। কারণ আন্তর্জাতিক আইনে জীবাণুযুদ্ধ নিষিদ্ধ। তারা জীবাণু-অস্ত্র নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন জানাজানি হলে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। ২০১৫ সালে রেডিও ফ্রি এশিয়া তাদের রিপোর্টে দাবি করেছিল, উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতে ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী সব ভাইরাস নিয়ে কাজ করছেন গবেষকরা। এর অর্থ জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্রের দিকে ক্রমশ ঝুঁকছে বেইজিং।

‘অরিজিন অব দ্য ফোর্থ ওয়ার্ল্ড ওয়ার’-এর লেখক জে আর নিকিস্ট দাবি করেন, কানাডার পি-৪ ন্যাশনাল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি থেকে করোনা ভাইরাসের স্যাম্পল চুরি করেছে বায়োসেফটি ল্যাবের এক গবেষক। উইন্নিপেগের পি-৪ ন্যাশনাল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে নিত্য যাতায়াত ছিল ওই গবেষকের। সেখান থেকেই ভাইরাসের নমুনা চুরি করে উহানের ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এনওসিভি ভাইরাসের জিনের বদল ঘটিয়েই তৈরি হয়েছে ২০১৯-এনওসিভি। কানাডার ল্যাবের সেই গবেষক যার সঙ্গে উহানের ল্যাবের যোগসূত্র ছিল সেই ফ্র্যাঙ্ক প্লামারের মৃত্যু হয়েছে রহস্যজনকভাবে। উহানের বায়োসেফটি ল্যাবের ১২ জন গবেষকের মধ্যে দুজন রয়েছেন সন্দেহের তালিকায়। অনুমান করা হচ্ছে, জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ওই ভাইরাস তাদের হাত থেকেই কোনোভাবে লিক হয়ে গেছে উহানের বায়োসেফটি ল্যাব থেকে। তিনি আরো বলেন, বায়োসেফটি ল্যাবে বাদুড় ও মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগ ছড়ায়— এমন জীবাণু নিয়ে গবেষণা চলে। কীভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চোখ এড়িয়ে কোনো ল্যাবে এমন সংক্রামক জীবাণু নিয়ে গবেষণা চলতে পারে?

করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে প্রায় তিন মাসের মতো। এরই মধ্যে এই ভাইরাসটি নিজের জিন বদলে ফেলেছে ৩৮০ বার! হিউম্যান প্যাথজেনিক ভাইরাসের সংক্রমণজনিত অসুখের গবেষকদের ধারণা, এত কম সময়ের মধ্যে ঘন ঘন জিন মিউটেশন করে নিজের চরিত্র বদলে ফেলছে এই ভাইরাস। তাই একে রুখতে সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ ব্যবহার করা মুশকিল।

চীনের উহান থেকেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই কোভিড-১৯ ভাইরাসের আরেক প্রজাতি সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্সও ১৮ বছর আগে উদ্বিগ্ন করেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের। এই রোগাক্রান্তদের মধ্যে মারা পড়তেন প্রায় ১০ শতাংশ। মার্স বা মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোমও ২০১২ সালে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। কোভিড-১৯ সেই গোত্রেরই জীবাণু। তবে আগের ভাইরাসদের থেকে এর কিছু চরিত্রগত পার্থক্য আছে। তাই প্রতিষেধক নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললেও কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন বা ওষুধ বানানো সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকরা হোস্ট ডিরেক্টেড থেরাপির কথা ভাবছেন, মানুষের জিনের প্রোটিনের ওপর কোভিড-১৯ ভাইরাস বেড়ে ওঠে, তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া।

তবে গত তিন মাসের জরিপ অনুসারে, কোভিড-১৯ সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হলে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমেই বাড়িয়ে চললে শিশুদের বিশেষ কোনো ক্ষতি করতে পারে না। শিশুদের তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখা হলে সংক্রমণের ঘটনাও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। মহিলারা কোভিড-১৯ ভাইরাসের থাবা থেকে কিছুটা নিরাপদ। এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, মেয়েদের মধ্যে অটোইমিউন ডিজিজের (শ্বেতী, এসএলই, থাইরয়েড ইত্যাদি) প্রবণতা বেশি হওয়ায় কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা বেশিরভাগ সময়ই জিতে যান। শরীর কোনো না কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে। তাই আক্রান্ত মেয়েদের মৃত্যুহার অনেক কম। ধূমপায়ী পুরুষদের মধ্যে এই অসুখের মারাত্মক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। মনে করা হচ্ছে, ধূমপানের ফলে শ্বাসনালি ও ফুসফুসের লাইনিং কিছুটা কমজোরি থাকে। তাই কোভিড-১৯ ভাইরাস এদের শ্বাসনালি ও ফুসফুসকে আক্রমণ করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় বয়স্কদের মৃত্যুহার বেশি। শরীরের ভেতরের ইন্টেস্টাইনের আবরণ একেবারে নষ্ট করে দেয়। শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ হুহু করে কমে যেতে শুরু করে। ক্রমশ মাল্টি অর্গ্যান ফেলিওরের দিকে এগোয়। অনেকেরই ধারণা, গরম পড়লে কোভিড-১৯ ভাইরাসের দাপট কমবে। কিন্তু এই ভাইরাসের জিন মিউটেশনের ধরন দেখে এখনই এ বিষয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না। কোভিড-১৯-এর হাত থেকে বাঁচতে ন্যূনতম ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে কচলে হাত ধুতেই হবে। হাত ধুলে এনভেলপ ফ্লু জাতীয় কোভিড-১৯ ভাইরাসকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব। পানি না থাকলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইথাইল অ্যালকোহল-যুক্ত স্যানিটাইজার দিয়ে ভালো করে হাত পরিষ্কার করে নেওয়া উত্তম। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে টাটকা শাকসবজি ও ফল খেতে হবে। ধূমপান ও মদ্যপান ছাড়তে হবে।

ভাইরাস তো ভাইরাসই, সে জাতি-ধর্ম-গোত্র বা নারী-পুরুষ-শিশু বুঝে আক্রমণ করে না। ইতোমধ্যে বিশ্বের প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় ৪ হাজার ৭শ মানুষ। হয়তো হিসেবের বাইরেও অনেকেই আছেন। গত ডিসেম্বর মাসে গুগল ম্যাপে মানুষ পুড়িয়ে ফেললে যে ধরনের গ্যাস বা আগুনের লেলিহান শিখা তৈরি হয়, তার মতোই লেলিহান ধরা পড়েছে গুগল আর্থের মনিটরে চীনের আকাশে। বিশ্ব বাজারে শেয়ারবাজারের পতন ঘটেছে, ধস নেমেছে অর্থনীতিতে। যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে। পিছিয়ে গেছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়াম লিগের (আইপিএল) ১৩তম আসরও। আক্রান্ত হয়েছেন বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। যাদের ভুলে এই ভাইরাস, এত ধ্বংস, এত লোকসান, তারা কি পরাশক্তির অহমিকায় লিপ্ত থাকবে যুগের পর যুগ? আর কত জীবন গেলে, আর কত ধ্বংস হলে মানবতার তাগিদে লোভের মানসিকতা ত্যাগ করে একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে সমর্থন দেবে তারা। কোভিড-১৯-এর মতো আর কোনো জীবাণু-অস্ত্র নিয়ে যেন গবেষণা না করা হয়, সেদিকে বিশ্ববাসীর সুদৃষ্টি কামনা করছি। একটি আধুনিক সবুজ পৃথিবীর গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে হবে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে।

 

লেখক : প্রভাষক, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ পাবলিক কলেজ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads