• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
ads

সম্পাদকীয়

বিশ্বসংকট ও অর্থনীতি

  • প্রকাশিত ২৯ মার্চ ২০২০

মো. রাশেদ আহমেদ

 

 

মার্চ মাস অগ্নিঝরা স্বাধীনতার মাস। এ মাসেই স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল মুক্তিপাগল বাঙালি। পাকিস্তানিদের দীর্ঘ ২৪ বছরের অপশাসন, শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার-নিপীড়ন এবং সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটতে শুরু করে এই মার্চ মাস থেকে। আজ স্বাধীনতার সুদীর্ঘ ৪৯ পেরিয়ে ২০২১ সালে সুবর্ণজয়ন্তীর পথে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী অর্থাৎ মুজিবর্ষ উপলক্ষে আনন্দ মুহূর্ত কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পথচলার ৪৯ বছরে প্রাপ্তির খাতায় অনেক বড় বড় অর্জন জমা হলেও একবিংশ শতাব্দীতে অর্থাৎ আগামী দিনের আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ দেশীয় অসংখ্য চ্যালেঞ্জ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব মহামারী নভেল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণে আগামী দিনের পরিকল্পনা; জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা; রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় করা; চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ; পোশাকশিল্পে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা; এবং বিশ্ব পরিমণ্ডলে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের স্বার্থ আদায় করা।

বর্তমান বিশ্বে নভেল করোনা ভাইরাস এখন আতঙ্কের নাম যা মহামারী আকার ধারণ করেছে। চীনের উহান প্রদেশে এর আবির্ভাব, যা এখন ১৮০টির অধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশও অন্যতম। বলতে গেলে, বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজ থেকে বিচ্ছিন্ন। ইউরোপের কিছু কিছু দেশ আজ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মতে ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২২ হাজারের অধিক, রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে সুখের সংবাদ হচ্ছে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখেরও  অধিক। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে নিহত এবং আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। যার বিরূপ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশেগুলোতে। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়েছে আমাদের পোশাকশিল্পে। প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার অর্ডার বাতিল হয়েছে। বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৬ শতাংশ এবং পোশাকশিল্পের ৪০ ধরনের কাঁচামাল আসে চীন থেকে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হওয়ার দরুন এবং প্রাদুর্ভাব এড়াতে গিয়ে অনেকটাই বাধ্য হয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ পোশাকশিল্প বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, করোনার প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে পোশাকশিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করে টিকিয়ে রাখা আমাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। যা ভবিষ্যতে স্থায়ী টেকসই উন্নয়নে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় বাধা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশ থেকে পাঁচ লাখের অধিক প্রবাসী দেশে ফেরায় বৈদেশিক আয়ের বড় ধাক্কা লাগার পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারেও বড় আঘাত আসবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

করোনা ভাইরাস ছাড়াও ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। ২০১৭ সাল থেকে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী একটা বৈশ্বিক সমস্যা হলেও আন্তর্জাতিক মহল ওই সমস্যা সমাধানে খুব বেশি আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে না। এমনকি বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানে ভারত ও চীনের মতো নিকটতম পরাক্রমশালী দেশগুলোর সমর্থন আদায়েও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ইতোমধ্যে চীন সরকার রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাণিজ্যিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করার চুক্তি স্বাক্ষর করছে। যার ফলে রোহিঙ্গা ফেরত নিয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে দিন দিন কমে আসছে বৈশ্বিক ত্রাণ সহযোগিতার পরিমাণও। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ৬ কোটি ডলার এবং জাতিসংঘ ৮৮ কোটি ডলারের অনুমোদন দিয়েছে, যা অপর্যাপ্ত। তবে আশার আলো হচ্ছে, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার করা মামলা এবং অন্তবর্তীকালীন রায় কিছুটা মিয়ানমারকে চাপে রেখেছে। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ২০২০ সালে যৌথ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ।

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ুর প্রভাবে দিন দিন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ। সৃষ্ট হচ্ছে দাবানল, উজাড় হচ্ছে আমাজনের মতো বনাঞ্চল, বাড়ছে বিশ্বের তাপমাত্রা। দেখা দিচ্ছে, পঙ্গপালের মতো নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব দুর্যোগ মোকাবিলা করতে গিয়ে বিশ্ববাসী হিমশিম খাচ্ছেন। বলা যায়, অনেকাংশে ব্যর্থ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাজন আর আফ্রিকার হাজার হাজার একর বন ধ্বংস হয়েছে। ২০১৯ সালে শুধু আফ্রিকা, জাপান আর চীনে সাইক্লোনে ১ হাজার ২০০ লোকের মৃত্যু ঘটেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু সূচকে ২০২০ সালের তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ নম্বরে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর মাদ্রিদে জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনে (কপ-২৫) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী দিনে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে আসবে যা মোকাবিলার ক্ষমতা বিশ্ববাসীর নেই। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের জন্য ‘লস এবং ড্যামেজ’ ফান্ড গঠনের দাবি করছে বাংলাদেশ। এতে অধিক পরিমাণ আর্থিক অনুদান দিবে শিল্পোন্নত দেশগুলো। তবে দুঃখের বিষয় যে, কপ-২১-এ যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর করলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতাসীন হয়ে কপ-২১ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। এর ফলে বড় ধরনের আর্থিক অনুদান পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো। অথচ কার্বন নিঃসরণের দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দ্বিতীয়। তারা বছরে ৫ দশমিক ৩ গিগাটন, চীন ৯ দশমিক ৮ গিগাটন এবং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ২ দশমিক ৫ গিগাটন কার্বন ত্যাগ করে থাকে।ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, ২০১৫-১৯ সময়সীমায় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়েছে ২০ ভাগ। ১৯৯৩ সাল থেকে যেখানে সাগরের জলসীমার উচ্চতা বেড়েছে গড়ে ৩ দশমিক ২ মিলিমিটার আর শুধু ২০১৫-১৯ অল্প সময়সীমায় গড় উচ্চতা বেড়েছে ৫ মিলিমিটার। বাংলাদেশে উপকূলে প্রতিবছর ১৪ মিলিমিটার সমুদ্রের পানি বাড়ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন কপ-২৫ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি বা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক অনুদেনের অঙ্গীকার না করায় এবারের সম্মেলন সম্পন্ন ব্যর্থ হয়েছে। এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করবে।

উপরে বৈশ্বিক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বর্তমান বিশ্ব করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধসহ কঠিন সংকট মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশকে অদূরভবিষ্যতে আন্তর্জাতিকসহ দেশীয় চ্যালেঞ্জ সুদৃঢ়ভাবে মোকাবিলায় এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads