• বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭
ads
করোনা ভাইরাস ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

করোনা ভাইরাস ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

  • প্রকাশিত ৩১ মার্চ ২০২০

না জ মু ল  হো সে ন

 

 

গত বছরের শেষের দিকে চীনের উহান প্রদেশে ধরা পড়ে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নীরব প্রাণঘাতী নভেল করোনা ভাইরাস যা ইতোমধ্যে সারা বিশ্বের মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বাংলাদেশও এর কবল থেকে রক্ষা পায়নি। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশেও ৮ মার্চ প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হন। তারপর সরকারি হিসাবমতে আজ পর্যন্ত (২৭ মার্চ) ৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আর এরই মধ্যে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও বেসরকারি হিসাবের দাবি আরো অনেক বেশি। বিশ্বজুড়ে ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবার খুঁটি। অসহায় মানুষ মৃত্যুগ্রাসে বন্দি আবার কোথাও মৃত্যুপুরী। এটি এমনই এক ভাইরাস যে সুযোগ পেলে নিমেষেই রাজা-প্রজা সবাইকে এককাতারে নিয়ে আসছে। দিনের পর দিন এই করোনা যে পথে হাঁটছে তাতে করে হয়তো ইতিহাসের লোমহর্ষক মহামারীগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে, সেই শঙ্কাকেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতিহাসবিদ থুসিডাইসের রচনাংশ ‘হিস্ট্রি অব দ্য পেলোপনেসিয়ান ওয়ার’ থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে স্পার্টান ও গ্রিকদের মধ্যে যুদ্ধ চলাকালীন ‘প্লেগ অব অ্যাথেন্স’ নামক ইতিহাসের প্রথম মহামারীতে হাজার হাজার সৈন্য মারা যায়। এই মহামারী গ্রামের পর গ্রাম জনমানবহীন করে দিয়েছিল। তারপর খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪০-৫৪১ সালে মিসর থেকে সৃষ্ট আরেক মহামারী ‘জাস্টিনিয়ান প্লেগে’ ফিলিস্তিন ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তাণ্ডব চালালে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ মারা যায় যা ছিল তখনকার হিসাবমতে, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ। ১৩৩৪ সালে ‘গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন’ হিসেবে স্বীকৃত মহামারীতে চীন এবং পুরো ইউরোপে মারা যায় আড়াই কোটি মানুষ আর শুধু ইতালির ফ্লোরেন্সেই মারা যায় ৯০ হাজার। এরপর থেকে যুগে যুগে, শতাব্দীতে বিভিন্ন মহামারী আসে, যেমন—দ্য ব্ল্যাক ডেথ, স্মলপক্স এপিডেমিক অব মেক্সিকো, স্মলপক্স এপিডেমিক অব আমেরিকা, ইয়েলো ফিভার অব এপিডেমিক অব আমেরিকা, দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক, দ্য পোলিও এপিডেমিক অব আমেরিকা, দ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক, স্মলপক্স এপিডেমিক অব ইন্ডিয়া, এইচআইভি ভাইরাস, সার্স এপিডেমিক, সোয়াইন ফ্লু এপিডেমিক, কলেরা এপিডেমিক অব হাইতি, হাম, ইবোলা এপিডেমিক এবং সবশেষে কোভিড-১৯ প্যানডেমিক তথা নভেল করোনা ভাইরাস।

বর্তমানে চলমান মরণঘাতী এই এপিডেমিকে এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বের ১৯৫টি দেশে আক্রান্ত ৩ লাখ ৭৯ হাজার এবং সাড়ে ১৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে সময় পাল্টে গেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এখন বিশ্বজুড়ে। নিত্যনতুন চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণায় বিশ্ব এখন মত্ত। তবে পরিতাপের বিষয়, এখনো করোনা ভাইরাসের কোনো কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তবে রাতদিন এই প্রতিষেধক আবিষ্কারে নির্ঘুম কাটাচ্ছেন গবেষকরা। চীনে কয়েক হাজার মৃত্যু হলেও এরই মধ্যে তারা প্রতিরোধে অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, নতুন করে সেখানে আর কেউ আক্রান্ত হয়নি। অন্যদিকে ইতালি, স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। ভ্যাকসিন বা টিকা না থাকায় এই ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধ করতে ভীত না হয়ে নিজেকেই প্রতিরোধযুদ্ধে সচেতন হতে হবে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ৭১-পরবর্তী আরো একটি যুদ্ধ ভেবে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকেই এককাতারে এসে সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুতই এর মোকাবিলা করতে হবে। অস্ত্র আমাদের নিজেদের হাতেই। এই মহামারী প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের আক্রান্ত ব্যক্তি তথা সবার থেকেই সামাজিক দূরত্ব (কমপক্ষে ১ মিটার) বজায় রাখার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। অতি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়া বা গণপরিবহনে যাতায়াত বর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মাস্ক, গ্লাভস অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে ঘি, মধু, ডাল, দানা শস্য জাতীয় খাবার, মাংস, টকদই, সবুজ শাকসবজি ইত্যাদি এবং বেশি করে ভিটামিন সি জাতীয় ফলমূল খেতে হবে। করমর্দন ও কোলাকুলি থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যবহার্য জিনিসপত্র, হাতমুখ সাবান বা জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গলাব্যথা, কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট, জ্বর বা মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রতিটি হাসপাতাল, রোগীর আস্তানা, গণজমায়েত স্থান, বিমানবন্দর ও গণপরিবহনে ব্যাপকভাবে ফিউমিগেশন করতে হবে ও জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে। ছোঁয়াচে না হয়ে যদি সংক্রমিত ব্যক্তিই কেবল আক্রান্ত থাকত তাহলে প্রতিরোধ অনেক আগেই করা যেত।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় করোনা সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, সন্দেহভাজনদের হোম কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা পর্যালোচনায় বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করছে। শুধু কাঁচাবাজার, খাবার, হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান ছাড়া প্রতিরোধের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা হিসেবে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও সামাজিক সভা-সমাবেশ, বিনোদনকেন্দ্র, সরকারি-বেসরকারি কর্মস্থল, সব ধরনের যোগাযোগ (সড়ক, নৌ ও আকাশ) ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে। মসজিদে জামাতে নামাজ পড়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কেবল জরুরি সেবাসমূহ (ওষুধ ও খাদ্য) এর আওতার বাইরে থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোথাও কোথাও কারফিউ, লকডাউন, শাটডাউন হলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় শুধু লকডাউন হয়েছে। এ ছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) করোনার চিকিৎসার জন্য ৫০০ জন চিকিৎসক প্রস্তুত রাখছে। তবে আমাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী, ডাক্তারদের নিরাপত্তার পোশাকসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যবস্থার অপ্রতুলতা রয়েছে। তাদের প্রতিও মানবিক হতে হবে। তাদের অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন এই শঙ্কায় অনেকে চাকরিও ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই চিকিৎসক, নার্সদের নিরাপত্তায় দরকার পিপিই তথা প্রটেক্টিভ গাউন, টুপি, জুতা, চশমা ইত্যাদি। এরই মধ্যে করোনা মোকাবিলায় আরো ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকারের অর্থ বিভাগ। চীন থেকে আনানো হচ্ছে পিপিই, মাস্ক, কীটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। পরিতাপের বিষয়, বিদেশফেরত বা নতুন করে আক্রান্তদের অনেকেই সরকারি তত্ত্বাবধান বা নিজস্ব হোম কোয়ারেন্টাইন মানছেন না। ফলে এটি আস্তে আস্তে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করছে। তাই এ ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি। অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিদেশি সাহায্যকারী সংস্থার নাগরিকদের কারণে ক্যাম্পগুলোও রয়েছে ঝুঁকির মুখে। যদিও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে।

বলা যায়, মহামারী আকারে করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। খেলাধুলা, আমদানি-রপ্তানি, পর্যটন, উৎপাদনসহ সব খাতেই দিনদিন ধস নামছে। এরই মধ্যে অলিম্পিক গেমস, কোপা আমেরিকা কাপ, ইউরোপের বিভিন্ন বড় বড় লিগ বা বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাইপর্বের খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশও এরই মধ্যে নানান সংকটে পড়েছে। আমাদের চাঙা অর্থনীতি এখন অনেকটাই ভঙ্গুর। করোনার ভয়ে ঘরবন্দি নিম্ন আয়ের মানুষগুলো রয়েছে রীতিমতো বিপাকে। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজারে চলছে সিন্ডিকেট। তরতর করে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। বিক্ষিপ্তভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করলেও নৈরাজ্য থেমে নেই।

এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, করোনা পরিস্থিতি অধিকতর খারাপের দিকে গেলে এক বছরে ৯ লাখ কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। এমন শঙ্কা অমূলক নয়। এই পরিস্থিতিতে মোটাদাগে বাংলাদেশে পাঁচটি খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা খাতে ১১৪ কোটি, কৃষি খাতে ৬৩ কোটি, হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং এ-সংক্রান্ত সেবা খাতে প্রায় ৫১ কোটি, উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে প্রায় ৪০ কোটি এবং পরিবহন খাতে সাড়ে ৩৩ কোটি ডলার অর্থাৎ সব মিলিয়ে এক বছরে ৩০২ কোটি ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অস্তিত্ব সংকটাপন্ন এই ভয়াবহ পরিস্তিতি চলমান থাকলে দেশ কোন পথে হাঁটবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন পুরো জাতি। তদুপরি বর্তমান সরকারের গৃহীত নানা উদ্যোগ যা আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গত ২৫ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে অবগত হলাম, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন কিছুটা হলেও এই মানবিক ও সামাজিক সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে মনে করছি।

 

লেখক : প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads