• সোমবার, ১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
এত প্রশ্ন কেন

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

এত প্রশ্ন কেন

  • মো. আখতার হোসেন আজাদ
  • প্রকাশিত ৩১ মার্চ ২০২০

প্রশ্ন কাকে বলে এর কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। নির্দিষ্ট কোনো প্রকারভেদও নেই। তবে মূলত জানার ইচ্ছে বা আগ্রহের জন্যই প্রশ্ন করা হয়, এটি মানতেও কারো দ্বিমত নেই। প্রশ্ন করা বিষয়টিকে আমাদের সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত যে, জ্ঞানার্জনের জন্য, স্বচ্ছতার জন্য, জবাবদিহিতার জন্য প্রশ্নের বিকল্প কিছুই নেই। অথচ প্রশ্ন করা আমাদের সমাজে যেন অপরাধের মতো কর্ম!

শিশুরা হলো কাদামাটির মতো। কাদামাটিকে যন্ত্র বা হাতের সাহায্যে যেমন আকৃতি দেওয়া হয়, পরে তা শক্ত হয়ে বা পোড়ালে সেই আকৃতির স্থায়ী রূপ ধারণ করে। তেমনি একটি শিশুকে ছোটকাল থেকে যেভাবে গড়ে তোলা হয়, পরিণত বয়সে তেমনই আচরণ করে। আমাদের সমাজে একটি শিশু কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে বা জানতে চাইলে ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। ধমকানো সুরে কোমলমতি শিশুকে বলা হয়, এত প্রশ্ন কীসের? এত জেনে তোমার লাভই বা কী? বড় হও, সব জানতে পারবে। এখন চুপ থাকো। কিছুদিন পর যখন শিশুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শুরু করে, পাঠ্যসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে কিংবা এর বাইরে কোনো কিছু শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলেও ধমকের সুরে শুনতে হয়, যা পড়াচ্ছি তা বোঝ। এত প্রশ্ন কীসের?

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গমন করলে শিক্ষকের থেকে কোনো বিষয় জানতে চাইলে অবশ্য একটু ভিন্ন উত্তর পাওয়া যায়। কৌশলের সুরে শিক্ষকের থেকে উত্তর আসে— তুমি আমার ক্লাসে মনোযোগ দাও। মনোযোগ দিলে এমনিতেই সব উত্তর পেয়ে যাবে। আর ক্লাসে মনোযোগী না হলে তুমি বুঝবে না। শত মনোযোগ সত্ত্বেও বিষয়টি বোধগম্য না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করলে শিক্ষকের থেকে কটু বাক্য আসে— ক্লাসে মনোযোগ থাকে কোথায়? এত সহজ জিনিস তাও বোঝ না! গবেট কোথাকার! শিক্ষকের এমন বিষোদ্গারপূর্ণ তিক্ত বাক্যের ভয়ে অনেক সময় কোনো কিছু না বুঝেই কোমলমতি বালকরা বলে জি স্যার, সব বুঝেছি। আর এতে কোনো সমস্যা নেই।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলে। ফলে উচ্চ পর্যায়ের পড়ালেখায় শিক্ষকের লেকচার এক কান দিয়ে শুনে বিপরীত কান দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পড়ার টেবিলে নোট বা বই মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় জ্ঞানের বমি করে দিয়ে আসা হচ্ছে বর্তমানের উচ্চশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এমন পরিস্থিতি আরো মারাত্মক। এখানে আরেকটু কঠিন শব্দ শোনা যায় শিক্ষাগুরুদের থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো, আর সামান্য এ বিষয় বুঝতে পারো না? কী করে খাবে তুমি! কেউ কেউ এমন বাক্যও যোগ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রমের বাইরে আরো বিভিন্ন বিষয় আছে। প্রশ্ন বা দ্বিমত পোষণ করলেই আসে হরেক রকমের চাপ। সরকারি ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে কিছু বললে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে দমন-পীড়ন যেন এক প্রকার স্বীকৃতি পেয়েই বসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্তের যুক্তিসঙ্গত বিরোধিতা করলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চলে নানারকম চাপের স্টিমরোলার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছ, পড়ে বের হয়ে চলে যাবে। এত প্রশ্ন কীসের তোমাদের? এমন যুগান্তরী (!) প্রশ্নও শোনা যায় কর্তাব্যক্তিদের থেকে।

সামাজিক পর্যায়ে প্রশ্ন করার পরিণতি আরো ভয়ংকর। আমাদের গ্রামপ্রধান সমাজে অধিকাংশ গ্রামের নেতৃত্ব প্রদান করেন গ্রাম্য মোড়ল-মাতব্বর। এদের অধিকাংশই অর্ধ-শিক্ষিত বা নিরক্ষর। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব হোক অথবা পারিবারিক ঐতিহ্যের বদৌলতে হোক এমন অক্ষরজ্ঞানহীন লোকের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে সিংহভাগ গ্রাম। জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ, বিভিন্ন অপরাধের বিচার-সালিশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকেন তারা। কিন্তু শিক্ষিত কোনো যুবক কখনো তাদের অন্যায় ও একচেটিয়া সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে বিপথগামী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।

জাতীয় পর্যায়ে প্রশ্ন করার পরিণতি ভয়াবহ মারাত্মক। সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সকলেই এমন নীতি অবলম্বন করেছে। ভারতের সাথে চুক্তি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করায় বুয়েট শিক্ষার্থী আবরারকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। এ রকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে আমাদের সামনে।

কোনো কিছু কি, কেন, কীভাবে দিয়ে প্রশ্ন করলে এর উত্তরে প্রশ্নকর্তার জানার তৃষ্ণা মেটে। কোনো একটি কাজ, সিদ্ধান্ত, চুক্তি বা প্রকল্পে যে কেউ প্রশ্ন করতেই পারে। এটি একটি মৌলিক অধিকারও বটে। কিন্তু প্রশ্ন করাকে বিরোধিতা মনে করা দুঃখজনক। এটি প্রমাণিত যে, কোনো ক্ষেত্রে যত প্রশ্ন করা হবে এর দুর্বলতা তত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সমাজের পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। তবেই আমরা সকলে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হব।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads