• সোমবার, ১ জুন ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

সম্পাদকীয়

করোনা ভাইরাসবিরোধী সরঞ্জামসহ সব উপকরণ দ্রুত প্রয়োজন

  • প্রকাশিত ০১ এপ্রিল ২০২০

বাবুল রবিদাস

 

 

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য ও দায়িত্ব। পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন মানুষকে রোগ থেকে বাঁচাতে পারে। তাই বলা হয়ে থাকে, চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব। রোগবালাই যাতে না হয়, সেটিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ পন্থা। পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের অভ্যাসটি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরাট প্রভাব রাখতে পারে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৮০০ সালের দিকে ভিয়েনার একটি হাসপাতালে কাজ করতেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ইগনাল সেমেলউইজ। এই হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে মাতৃমৃত্যুর হার হঠাৎ বেড়ে যায়। আতঙ্কিত রোগীরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে যেতে থাকেন।

অতঃপর ডা. সেমেলউইজ এর কারণ খুঁজতে লাগলেন। তিনি অনুসন্ধান করে দেখলেন, নবীন চিকিৎসকরা অ্যানাটমি ক্লাসে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে হাত ভালোভাবে না ধুয়েই প্রসূতি ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসা করছেন। তিনি মতামত দিলেন যে, এভাবে অপরিষ্কার হাত দিয়ে রোগীদের সংস্পর্শে আসায় সংক্রমণ বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যুর হার।

তিনি উদ্যোগ নিয়ে হাত ধোয়া কর্মসূচি শুরু করেন, যার ফলে জীবাণু সংক্রমণ কমে যায় এবং মৃত্যুর হার কমে আসে। ডা. সেমেলউইজের এই কর্মসূচি হাসপাতালে হাত ধোয়ার গুরুত্বকে তথা পরিচ্ছন্নতাকে প্রমাণ করে। রোগ প্রতিরোধে হ্যান্ড ওয়াশিং বা হাত ধোয়ার ভূমিকা এখন শুধু হাসপাতালে সীমাবদ্ধ নয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হোটেল/রেস্তোরাঁ, বাড়িঘরে, ভাত খাওয়ার আগে, টয়লেট থেকে প্রতিবার বের হয়ে, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের পর, বাইরে বেড়াতে যাওয়া, অফিস থেকে আসা, হাঁচি-কাশি দেওয়া, অসুস্থ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসার পর, ক্ষত ধোয়া, জীবজন্তু স্পর্শ করা, নোংড়া কাপড় পরিষ্কার করার পর এবং বর্জ্য অপসারণের পর হাত ধোয়া ও পরিষ্কারের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত থাকা প্রয়োজন। শুধু পানি দিয়ে পরিষ্কার করলে জীবাণুমুক্ত হওয়া যায় না। অপরিচ্ছন্ন অবস্থায়, নাকে-মুখে, চোখে হাত দেওয়া বা হাত ভালোভাবে না ধৌত করলে, খাদ্যের ওপর হাতে থাকা বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য অদৃশ্য জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এর ফলে সাধারণত ঠান্ডা বা ফ্লু থেকে শুরু করে ডায়রিয়া, জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েড ইত্যাদিসহ বিভিন্ন পানি ও খাদ্যবাহিত রোগে মানুষ আক্রান্ত হয়। অনেকেই আবার হাঁচি-কাশি ইত্যাদি অপরিষ্কার জামা বা রুমালে মোছেন। এসবের মাধ্যমে এমনকি করমর্দনের মাধ্যমেও রোগ ছড়াতে পারে। কারণ হাতের গোড়ায় লোমকূপের জায়গায় অনেক জীবাণু থাকতে পারে। এই হাতে অন্যজনকে স্পর্শ করলে তার মাধ্যমেও জীবাণু ছড়ায়।

মানুষের একটি হাতের মাঝে যে পরিমাণ জীবাণু থাকে তা সারিবদ্ধভাবে রাখলে পুরো এশিয়া মহাদেশের সমান আয়তন হবে। এত বিপজ্জনক ও ভয়ংকর ভয়ংকর জীবাণু খালি হাতে থাকে, যা আমরা পাত্তাই দিতে চাই না। অথচ নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও হাত ধৌত করা হলে অনেক রোগ-জীবাণু থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। মিল-কলকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত তৈরিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। কিন্তু পরিচ্ছন্ন থাকার ব্যাপারে সাবান, স্যানিটাইজেশনসামগ্রী কর্মীদের জন্য রাখার ব্যবস্থা নেই। যদি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের বিনামূল্যে জীবাণু প্রতিরোধী পোশাক, সাবান, শ্যাম্পু, ডেটল, স্যাভলন, গ্লাভস, মাস্ক ইত্যাদি সরবরাহ করতেন তাহলে বহু লোক ও তার কর্মীরা নানা রোগ থেকে রক্ষা পেত। বহুদিন আগে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, মিল-কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ সব প্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখলে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে যাবে।

অতিসম্প্রতি বিশ্বব্যাপী একটি ভাইরাস দেখা দিয়েছে যার নাম ‘করোনা ভাইরাস’। বর্তমানে এ থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব পড়েছে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই। উৎপত্তিস্থল চীনের পরেই এখন ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা খুবই নাজুক। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি খুবই গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছেন। সরকার ইতোমধ্যে ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছেন এবং সেনাবাহিনী মাঠে নামিয়েছেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে সহযোগিতার জন্য। ১৮ কোটি জনগণের নিরাপত্তার জন্য সরকার এ মহামারী ও প্রাণঘাতী রোগ বা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনবে বলে আশা করছি। এই করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে বেশকিছু সতর্কমূলক করণীয়র কথা বলা হচ্ছে। যেমন— পরস্পর কোলাকুলি থেকে বিরত থাকা ও একে অন্যের কাছ থেকে কমপক্ষে ৩ ফুট দূরত্বে থাকার চেষ্টা করা; প্রচুর ফলের রস এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা; চোখ, নাক ও মুখ হাত দিয়ে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা; হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় আগে টিস্যু, রুমাল বা কনুই দিয়ে মুখ ঢাকা এবং পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া; ঘরের বাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করা; জনবহুল স্থান, সভা-সমাবেশ ও সামাজিক অনুষ্ঠান পরিহার করা; কিছুক্ষণ পরপর ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে দুই হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা; ডিম, মাছ বা মাংস রান্নার সময় ভালো করে সেদ্ধ করা; নিজের জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট থাকলে সুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে দুরে থাকা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে আনুমানিক প্রায় ৭০ লাখের বেশি দলিত-বঞ্চিত ও হরিজন সম্প্রদায় রয়েছে। তারা ভয়ংকর ও বিপজ্জনক পেশায় জড়িত। যেমন- ঝাড়ু দেওয়া, টয়লেট পরিষ্কার করা, মলমূত্র অপসারণ করা, জীবজন্তুর মৃতদেহ ভাগাড়ে ফেলা ইত্যাদি। এমনিতেই তারা এ কাজ করার ফলে অ্যামিনিয়া, উদরাময়, বমি, জন্ডিস, ট্রমা ও চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তার ওপর আবার বর্তমান সময়ে করোনা ভাইরাস রোগের প্রাদুর্ভাব। তাই দলিত-বঞ্চিত ও হরিজনদের বিন্যামূল্যে সাবান, নিরাপত্তা পোশাক, ডেটল, স্যাভলন, শ্যাম্পু, গ্লাভস, নতুন পোশাক ইত্যাদি সরবরাহ করবেন এবং তাদের এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে রক্ষা করবেন বলে সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধসহ আশা করছি। পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের কাছে আরো আশা করছি করোনা ভাইরাসের উৎপত্তির কারণ ও ধ্বংসের উপায় দ্রুত বের করার চেষ্টা করবেন এবং দ্রুত বিশ্ববাসীকে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচাবেন।

 

লেখক : আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads