• রবিবার, ৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
লকডাউনে শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা

সংগৃহীত ছবি

সম্পাদকীয়

লকডাউনে শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা

  • প্রকাশিত ০৫ এপ্রিল ২০২০

জি কে সাদিক:

চীনের হুবেই প্রদেশে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে শুরু হয় করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাসের আক্রমণ। চীনে করোনায় আক্রান্তে মৃত্যুর মিছিল পুরোপুরি বন্ধ হয় এ মাসের মাঝামাঝি এসে। ভাইরাসটির আক্রমণে চীনের অর্থনীতির চাকা একরকম বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে বিশ্ব বাজারেও। চীনের প্রযুক্তি পণ্যের অন্যতম বাজার বাংলাদেশ। করোনায় অবরুদ্ধ চীন থেকে পণ্য না আসায় বাংলাদেশেও চীনা প্রযুক্তি পণ্যে দাম খুচরা পর্যায়ে ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। স্থবির হয়ে পড়ে চীনা সহায়তায় ও চীনা কোম্পানিগুলোর দায়িত্বে থাকা দেশের বৃহৎ নির্মাণ কাজগুলোও। কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়াই অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে নয়, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান সব দেশের সঙ্গেই এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। মহামারী এই ভাইরাসের আক্রমণ চীনে বন্ধ হলেও এখন সারা বিশ্বের ১৯০টির মতো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালি, স্পেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানিসহ বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির অনেক দেশ এখন ভাইরাসটির আক্রমণে নাস্তানাবুদ। চীনের পর ভাইরাসটি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়াতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। অন্যদিকে সবচেয়ে খতরনাক পরিস্থিতির শিকার ইউরোপের ইতালি, স্পেন, এশিয়ার ইরান। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। দেশগুলোর অর্থনীতির চাকা পুরো বন্ধ, লাশের সংখ্যা ক্রমাগত ঊর্ধ্ব গতিতে বাড়ছে। সারা বিশ্বে কত মানুষ আক্রান্ত ও কত মানুষের প্রাণহানি হয়েছে সে বিষয়ে স্থির কোনো পরিসংখ্যান নেই। বলা যায়, সারা বিশ্বে প্রতি দুই মিনিটে একজন করে আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যাচ্ছে।

করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে, ইতালিতে ঘর থেকে বের হওয়া আইনত নিষিদ্ধ, কানাডায় মানুষের ঘর থেকে বের হওয়া নিষিদ্ধ, স্পেনেও নাগরিক জীবন অবরুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সবকিছু বন্ধ, এমনকি মসজিদে জামাতে নামাজ পড়াও সাময়িকভাবে নিষেধ। বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ দেশ তাদের স্থল ও আকাশ সীমানা বন্ধ করে দিয়েছে। এমতাবস্থায় সারা বিশ্বের উৎপাদনের চাকাও বন্ধ। ইউরোপের ধনী দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে পারলেও অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সেটা অনেকাংশেই সম্ভব হয়ে উঠছে না। ফলে এই দেশগুলোতে করোনার মহামারী ঠেকাতে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ার ফলে শ্রমজীবী, মেহনতি গরিব মানুষের জীবন বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। করোনা ভাইরাসের আক্রমণে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ২ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে। টাকার অঙ্কে যা ৬০ বিলিয়ন ডলার। করোনা আক্রমণের দরুণ এ বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নেমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, যা হবে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এই পূর্বাভাস ছিল গত মাসের। কিন্তু চলতি মাসের শুরু থেকে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, কানাডা, জার্মানির মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির দেশগুলোতে আক্রমণ মহামারী রূপ ধারণ করেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কতটা খতরনাক হবে তা এখনই পুরোপুরি আন্দাজ করা যাচ্ছে না। কারণ চীনের পর দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আক্রমণের ফলে বিশ্বের গাড়ি শিল্প, প্রযুক্তি পণ্যসহ সব ধরনের শিল্পোৎপাদনে ভাটা নামে। চীন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারলেও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এখনো পুরো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে ভাইরাসটি এখন সারা বিশ্বের ১৯০টির মতো দেশে ছড়িয়েছে ফলে বাণিজ্যের ভাটা আরো বেড়েছে। মোট কথা বলতে গেলে বিশ্ব অর্থনীতি এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএফএম) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, স্বল্প মেয়াদে হলেও করোনা ভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতির গতি মন্থর করে দিবে। দীর্ঘ মেয়াদে কী হবে এখনো তা বলা যাচ্ছে না।

করোনা ভাইরাসের আক্রমণ ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে। চীনে আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশকে সতর্ক করে আসছিলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। কিন্তু সেভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। হাসপাতালগুলোতে যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার তা একেবারেই নগণ্য দশায় রয়েছে। এমনকি দেশের সেরা হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার সময় ডাক্তার ও নার্সদের জন্য প্রয়োজনী সর্তকতামূলক পোশাক পিপিই এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। ডাক্তার-নার্সদের জীবনও এখন হুমকির মধ্যে। ইতোমধ্যে কয়েকজন ডাক্তারের আক্রান্তের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। করোনা শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় কিট সংকট রয়েছে। যার ফলে গণহারে পরীক্ষা করাও যাচ্ছে না। আইসিডিআর-এর পক্ষ থেকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে দেশের সার্বিক বিষয় জানানো হচ্ছে। প্রতিদিন সারা দেশে আক্রান্তের সংখ্যা জানানো হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই নগণ্য। কিন্তু সরকার যে কৌশলে এই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ঠেকিয়ে রেখেছে, সেটা দিয়ে কোনো ভালো ফল আশা করা যায় না। কম রোগী পরীক্ষা করার ফলে আক্রান্তের সংখ্যাও কম। কিন্তু এর মানে এই না যে, ভাইরাসটি দেশে আক্রমণ করছে না। দেশের সব হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ইউনিট করা হয়েছে, কিন্তু শনাক্তের জন্য কিট ও ডাক্তার-নার্সদের জন্য পিপিইসহ অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। তাহলে এই প্রস্তুতিতে কী ফল আসবে?

অন্যদিকে দেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে চরম অসচেতনতা। দেশের বিরাট একটা সংখ্যার মানুষ এই ভাইরাস নিয়ে গুজবের মধ্যে নিপতিত। ভাইরাস ছড়ানো, আক্রান্তের প্রাথমিক লক্ষণ এবং করণীয় বিষয়ে বলতে গেলে শূন্য-জ্ঞান। সরকার গত ২৪ তারিখ থেকে সারা দেশের সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং গত ২৬ তারিখ থেকে সারা দেশ অঘোষিত লকডাউন করে দিয়ে মাঠে সেনাবাহিনী নামিয়েছে। সারা দেশের হাট-বাজার থেকে শুরু করে হাসপাতাল, ফার্মেসি ও কাঁচামালের বাজার বাদে বাকি সব বন্ধ। পুলিশ ও সেনাবাহিনী লোকজন ঘরে রাখতে প্রচার-প্রচারণা, সতর্কতা থেকে শুরু করে অ্যাকশন পর্যন্ত নিচ্ছে। সরকারের এমন সচেতনতা ও কঠোর অবস্থানের ফলে অর্থবিত্তসম্পন্ন ও মধ্যবিত্তশ্রেণি ঘরে অবস্থান করতে পারলেও গরিব মেহনতি মুটে-মজুরদের পক্ষে ঘরে বসে থাকা সম্ভব নয়। আর তাই এই শ্রেণির লোকজন ঘরে থাকতে পারছে না। ফলত সারা দেশে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের শিকার এই শ্রেণিটিই। সরকার করোনা মোকাবিলায় এমন কঠোর অবস্থান নিয়েছে কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি। এই মানুষগুলোকে হয় না খেয়ে ঘরে পড়ে মরতে হবে আর না হয় করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি নিয়ে বাইরে এসে উপার্জন করতে হবে। সারা দেশ লকডাউন হওয়ার পর শ্রমজীবী, রিবশাচালক, গরিব খেটে খাওয়া মানুষের উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে; হাট-বাজার বন্ধ ঘোষণার ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও পাইকাররা জীবিকা নিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে করোনা মোকাবিলায় যতটা কঠোরতা নেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে এই মানুষগুলোর জীবিকার বিষয়ে তেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যেটা নেওয়া উচিত ছিল।

বাংলাদেশের গরিব মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের বড় একটা অংশই বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে লোনের মাধ্যমে জীবন চালায়। প্রতিদিনের মাইনে বা আয় থেকে তা পরিশোধ করে এবং পরিবারও চলায়। এখন সব দিকে উপার্জন বন্ধ হওয়ার ফলে পরিবার চালাতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেও এনজির কিস্তির টাকা দিতে হচ্ছে, ব্যাংক লোনের কিস্তি দিতে হচ্ছে। সরকার এ ব্যাপারে সাময়িক কিস্তি নেওয়া বন্ধ রাখার নিদের্শনা দিলে দিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই এই মানুষগুলো একই সঙ্গে পরিবার ও কিস্তি দুটাই চালাতে পারবে না। তাই এ ব্যাপারে সরকারের বিকল্প ভাবনা থাকা চাই। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এর মধ্যে ২ কোটি ৪১ লাখ মানুষ চরম হতদরিদ্র। ঢাকাতেই ৪ হাজার ২৭০টি ছোটবড় বস্তিতে ৪০ লাখ মানুষের বাস। করোনা সংক্রামণের ভয়ে শুধু ঢাকাতেই ১৬ লাখ রিকশা চালকের জীবন বিপন্ন প্রায়। এছাড়াও সারা দেশে কয়েক লাখ রিকশা, সিএনজি, অটোরিকশা চালকের জীবিকা হুমকির মুখে। পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ। শ্রমিক-মজুর শ্রেণি কাজ পাচ্ছে না; সিএনজি, অটোভ্যান, রিকশা, বাস চালকেরা যাত্রী পাচ্ছে না, নিত্যপণ্য জিনিসের দাম বাড়তি। ফলে এই হতদরিদ্র মানুষগুলো জীবন বিপন্ন দশায় পতিত হয়েছে। তাদের জীবন বাঁচাতে সরকারের সহযোগিতা ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তা একান্ত প্রয়োজন।

বর্তমান সংকটময় মুহূর্তে দেশের বৃহৎ এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকার দায়িত্ব এসে পড়ে প্রথমত সরকারের ওপর। আগামী ৩ মাস যদি এই মানুষগুলোর দায়িত্ব নেওয়া যায়, তাহলে একদিকে যেমন করোনা মোকাবিলা সহজ হবে, অন্যদিকে এই মানুষগুলোর জীবনও রক্ষা পাবে। তার জন্য সরকাররে আনুমানিক ১০ হাজার কোটি টাকার মতো একটা তহবিল দরকার, যা হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়া দেশে জোগাড় করা বড় কিছু নয়। বিশ্বব্যাপী এই সংকটময় মুহূর্তে দেশের এসব দরিদ্র, মুটে-মজুর, শ্রমজীবী মানুষের দায়িত্ব আমাদেরকে নিতে হবে। অন্যথায় একদিকে প্রাণ ঝরবে করোনা ভাইরাসের আক্রমণে, অন্যদিকে খাদ্যাভাবেও মারা যাবে নিম্ন আয়ের অগণিত মানুষ।

 

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads