• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৬
বিশ্বের মনোযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন

ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদকীয়

বিশ্বের মনোযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন

  • অলোক আচার্য
  • প্রকাশিত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য এখন বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গণতন্ত্রের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রহর গুণছে। নির্বাচনী যুদ্ধ এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। দিনের পর দিন কথার যুদ্ধ জমে ওঠেছে। দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী একজন আরেকজনের দিকে অভিযোগের তীর ছুঁড়ছে। ভোটারদের নিজের দিকে টানতে নিজের পরিকল্পনা ভোটারদের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জানাচ্ছেন। এসবের মধ্যে নির্বাচনে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপের ইস্যুটিও সামনে এসেছে। বাদ যায়নি করোনা ভ্যাকসিনের বিষয়টিও। নভেম্বরে নির্বাচনের আগেই করোনার টিকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও এ নিয়ে সেখানে দ্বিমত রয়েছে। করোনা মার্কিন রাজনীতিতে একটি ইস্যু হয়ে গেছে। সেখানে করোনায় প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন বিষয়টি নির্বাচনী হাতিয়ার বানিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। নির্বাচনে আলোচনা হয়েছে জলবায়ু ইস্যুটি। নির্বাচনটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই এতটা আগ্রহ। কারণ বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে এখনো ট্রাম্পের আমেরিকাই রয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিবর্তন এসেছে বা আরো পরিবর্তন আসতে চলেছে তার অন্যতম কারিগর ডোনাল্ড ট্রাম্প। শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার অবস্থান নির্বাচনের আগে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাবে। বিভিন্ন মাধ্যমে জরিপের ফলাফল আসছে। তাতে অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগিয়ে রয়েছেন ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ প্রার্থী জো বাইডেন। তবে জরিপ সবসময় সঠিক হিসাব দিতে পারে না। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তাছাড়া জরিপের ফলাফলও ওঠানামা করে। ২০১৬ সালেও বেশিরভাগ জরিপে এগিয়ে ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। শেষ পর্যন্ত ইলেকটোরাল কলেজ ভোট কম পাওয়ায় তিনি হেরে যান। এশিয়ান-আমেরিকানদের সর্মথনে বাইডেন এগিয়ে থাকলেও তাদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সম্প্রতি এক জরিপে উঠে এসেছে। যা বাইডেন শিবিরের জন্য চিন্তার কারণ। কারণ এই ভোট ব্যাংক নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের বৈশ্বিক সংগঠন ইন্ডিয়াস্পোরা ও প্যাসিফিক ইসল্যান্ডার্সের (এএপিআই) যৌথ জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৬৬ শতাংশ এশীয় বাইডেনের পক্ষে এবং ২৮ শতাংশ ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন । ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দিয়েছিলেন ৭৭ শতাংশ এবং ট্রাম্পকে ১৬ শতাংশ। সময় দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে যতই নির্বাচনের সময় কাছে আসছে। ইতোমধ্যেই নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য মিনেসোটা, ভার্জিনিয়া, সাউথ ডাকোটা ও উইয়োমিংয়ের ভোটাররা ব্যালট বাক্সে তাদের ভোট দিতে শুরু করেছেন। আগেভাগে ভোটিং কার্যক্রম শুরু হবে নিউ জার্সি, মিশিগান, ভারমন্ট ও ইলিনয়সে। আরও ২৯ অঙ্গরাজ্য এবং ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ার ভোট শুরু হবে অক্টোবর থেকে। অর্থাৎ ভোটযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সারা বিশ্বের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা অথবা ডেমোক্র্যাটদের বিজয় দিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করা-কোনটি ঘটবে তা এখন সময়ের অপেক্ষা। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানে। আমেরিকা তার সময়ে কতটা গ্রেট হয়েছে তার বিচার করার সময় এসে গেছে। এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার একটি বড় নিয়ামক হতে পারে ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। বলা হয় তার সময়ে অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে এই শক্তিশালী অর্থনীতি তার নির্বাচনের একটি বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারতো। কিন্তু করোনা সব হিসাব উল্টে-পাল্টে দিয়েছে। তবে সম্প্রতি মার্কিন শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন ইতিবাচক খবরই দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বেকারত্বের হার কমে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা গত জুন মাসে ১০ দশমিক ২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। এই ধারা অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের আগে অর্থনীতি আরও সুসংহত অবস্থানে পৌঁছাবে যা ট্রাম্পের পক্ষে একটি শক্তি হিসেবে কাজ করবে। মোটকথা, অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ একটি বড় নিয়ামক হতে পারে। নির্বাচনে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন একটি পরীক্ষা। প্রথম দিকে করোনা ভাইরাস নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এবং মাস্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় করা মন্তব্য তার বিরুদ্ধে সমালোচনার জন্ম দেয়। নিজ দেশেই তিনি বহুবার সমালোচনার শিকার হয়েছেন। বিশেষত বিভিন্ন সময় করা মন্তব্যের কারণে। তাছাড়া তার ক্ষমতার পুরো সময়জুড়ে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিকেও ভুগতে হয়েছে। এরপরই করোনার থাবা সেই ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই যখন পুলিশের গুলিতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড নিহত হয়, তখন পুরো আমেরিকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। জর্জ ফ্লয়েড হত্যার পর থেকে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংসতা নিয়ে উভয়েই কথার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছেন। এই পরীক্ষায়ও ট্রাম্পকে পার হতে হবে। ট্রাম্পের সময়কালে আমেরিকা বিশ্ব রাজনীতিতে কতটা শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে অথবা পারেনি সেটা আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়। তার সময়েই একে একে বিভিন্ন চুক্তি, যেমন— প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।

সম্প্রতি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের সঙ্গে ইসরাইলের ঐতিহাসিক চুক্তি। যা ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সম্ভব হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ট্রাম্পের জন্য ভালোই হবে বলে মনে হয়। দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে আমেরিকার অবস্থান, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় সামর্থ্য অর্জন, দেশের অর্থনীতি, চাকরি, অভিবাসনের মতো ইস্যু আগামী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে নির্বাচনে জয়পরাজয়ে ‘ব্যাটল গ্রাউন্ড’ বলে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলো নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। আমেরিকার নির্বাচনে রিপাবলিকান দুর্গ বলে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোকে বলা হয় ‘রেড স্টেট’ আর ডেমোক্র্যাটদের প্রাধান্য পাওয়া অঙ্গরাজ্যগুলোকে বলা হয় ‘ব্লু স্টেট’ এবং যে অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোট যে কোনো শিবিরেই যেতে পারে সেই রাজ্যগুলোকে বলা হয় নির্বাচনী রণক্ষেত্র বা ‘ব্যাটল গ্রাউন্ড’। এছাড়া এই রাজ্যগুলোকে ‘সুইং স্টেট’ বা ‘দোদুল্যমান রাজ্য’ বলা হয়। কারণ যে কোনো সময় এই রাজ্যগুলোর ভোটের হিসাবনিকাশ বদলে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটই জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে আলোচনা এখন এসব ‘সুইং রাজ্য’ নিয়ে। এসব রাজ্য পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। অপেক্ষার সময় কমে আসছে। খুব দ্রুতই সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

sopnil.roy¦gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads