• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭
গল্পের পাহোম এবং একজন গাড়িচালক

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

গল্পের পাহোম এবং একজন গাড়িচালক

  • প্রকাশিত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

এমদাদুল হক বাদল

 

 

গল্পের নায়ক পাহোম (পাখোম) একজন কৃষক, যিনি প্রায়ই তার স্ত্রী ও শ্যালিকার সঙ্গে শহুরে জীবন আর গ্রামীণ খামার জীবন নিয়ে তর্ক করতো। ‘যদি আমার প্রচুর জমি থাকে তবে আমার নিজের শয়তানকে ভয় করা উচিত নয়!’ শয়তান একথা শুনে ফেলে এবং সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে যে, সে পাহোমকে প্রচুর জমি দেবে, তারপর তার কাছ থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নেবে। একপর্যায়ে জমির নেশা পাহোমকে পেয়ে বসে। শেষ পর্যন্ত বাশকিরদের গ্রামে যায় এবং এক অদ্ভুত নিয়মের সঙ্গে পরিচিত হয় পাহোম। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সে যতখানি জমি দৌড়ে ঘেরা দিতে পারবে, ততখানি জমির মালিকানা তার হবে। পরিণতি কী হয়েছিল তা পাঠকমাত্রই জানেন। কাউন্ট লিও টলস্টয়ের ছোটগল্প (ইংরেজি অনুবাদের শিরোনাম : How Much Land Does a Man Need?) পড়েননি, নিদেনপক্ষে শোনেননি এমন মানুষ এ ধরাধামে কজন আছেন আমি জানি না। তবে পড়ে, শুনে পাহোমের মতো লোভে পড়ে— এমন মানুষ অনেক আছে। পার্থক্য শুধু এই যে, পাহোম গল্পের নায়ক আর তারা বাস্তবের। আবার পাহোম জমির পিছনে দৌড়েছে, আর এরা টাকা এবং জমি দুটোর পেছনেই দৌড়ায়।

একটা মানুষের ২৪টি ফ্ল্যাট কেন লাগে, তিনটি (সাত তলা, ১০ তলার) বিল্ডিং কেন লাগে, কোটি কোটি টাকা কেন লাগে? কেন লাগে বিদেশে আলিশান বাড়ি? উত্তর জানা আছে কি? এর স্বতঃসিদ্ধ কোনো উত্তর অন্তত আমার জানা নেই। তবে হ্যাঁ, এটুকু বলা যায় যে, লোভ আর নেশা! যে এর পেছনে ছোটে সে নিজেও জানে সবটুকু সে ভোগ করতে পারবে না। তারপরও দৌড়ায়। কেউ ধরা পড়ে, কেউ পড়ে না।

গৎবাঁধা কথা : কেউ একমুঠো ভাতের আশায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, আর কেউ...। কেউ আক্ষেপ করে মরে কেউ বা ভেতরে ভেতরে ফন্দি আঁটে। যেমন— আমার সাংবাদিক বন্ধু বলেন, ‘মনডা কয় সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা, নেতাগিরি সব ছাইড়্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক, তিতাসের পিয়ন, বিদ্যুতের মিটার রিডার কিংবা গণপূর্তের ঠিকাদার হইয়্যা যাই। কিন্তু এসবের তো বয়সও নাই, তাইলে এখন কী করা যায় কন? প্রসঙ্গ শত শত কোটি টাকার মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজির গাড়িচালক আবদুল মালেক গ্রেফতার। মোর্যাল অব দ্য স্টোরি : আমাদের কাছে আলাদিনের চেরাগের গল্প আছে, আর ওদের কাছে আলাদিনের চেরাগ আছে।’

গ্রামের একজন কৃষক কিংবা একজন দিনমজুর সারাদিন মাঠেঘাটে কাজ করে দিনের খোরাকি পেলেই খুশি। একজন সাধারণ চাকরিজীবী ৯টা-৫টা অফিস করে, ওভারটাইম করে, মাস গেলে বেতন পেলেই কী খুশি! তারপর যদি সে একটু বাড়তি টাকা, বোনাস পায় সেকি আনন্দ ধরে তার চোখেমুখে। বেশি পেতেই সবাই চায় কিন্তু তারও একটা লিমিট আছে। লোভেরও একটা মাত্রা আছে (একমত সবাই নাও হতে পারেন), কিন্তু এ লোভ যে মাত্রা ছাড়া, এ নেশা যে মাদক নেশার চাইতেও ভয়াবহ। এনু-রুপমের শুনেছি ১০০+ ফ্ল্যাট। শুনেছি সম্রাটরা জুয়ায় দিনেই ওড়াতো কোটি টাকা। সাহেদ, সাবরিনা, আরিফ-শুনেছি এরা চুনোপুঁটি তাহলে রাঘব-বোয়াল কারা?

বন্ধুবর যেমন লিখেছেন, ‘ওদের কাছে আলাদিনের চেরাগ আছে’; সত্যিই আছে কি না জানি না তবে শঠতা, ধূর্ততা, ছলনা যে আছে— এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই যে এত এত সম্পদের মালিক তারা হয়েছেন, নিশ্চয়ই এগুলো পৈতৃক-মাতৃক-ঐশ্বরিক নয়! এগুলো এই খেটে খাওয়া নিরীহ সাধারণ মানুষগুলোর। লজ্জা, অনুশোচনা, বিবেকবোধ— এগুলোর কোনোটারই বালাই নেই এদের কাছে। কীভাবে সম্পদ আসলো এটাই মুখ্য। নীতিকথা, ধর্মকথা এদের কাছে ছেলেখেলা। এরা অবিনাশী হাইড্রা। একজন বিনাশ হলে হাজারটা গজিয়ে যায়। অনেকে বলবেন আইনের যথাযথ প্রয়োগই এদের থামাতে পারে। প্রয়োগেই তো সর্ষের ভূত। সর্ষের ভূত তাড়াতে পারলে মালেক, আবজাল, সম্রাট, রুপম, সাহেদ— এরকম হাজারো হাইড্রার বিনাশ সম্ভব।

কোনো কিছু অধিগ্রহণ বা ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য অনিয়ন্ত্রিত, অসংযত, স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষাই লোভ। হতে পারে সেটা বস্তুগত কিংবা সামাজিক। মানব ইতিহাসজুড়ে লোভ ছিল, আছে, থাকবে। তবে সর্বাবস্থায় তা অনাকাঙ্ক্ষিত যা ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক সংঘাতের অন্যতম অনুষঙ্গ। লোভের কারণে কেউ ফুলেফেঁপে ওঠে আবার কেউ হয় সর্বস্বান্ত। ভেঙে পড়ে সামাজিক, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কারণ কেউ কেউ এদের ব্যবহার করে ওপরে উঠার সিঁড়ি হিসেবে। আবার ঠিক উল্টোটাও হতে পারে— রাজনৈতিক, সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণেও এদের জন্ম হতে পারে।

আমার বাবার মুখে শুনেছি, তার কোনো এক কলিগ নাকি বলেছিলেন, হারাম (অবৈধ) পয়সায় ভাই মানুষ করলে সেই ভাই ‘দাদা’ ডাকে না, হারাম পয়সায় ছেলে মানুষ করলে সেই ছেলে ‘বাবা’ ডাকে না। অর্থাৎ হারাম পয়সার দায় অন্য কেউ (নিজের একান্ত কাছের লোকজন) নিতে চায় না। যারা অবৈধ আয়-উপার্জন করেন তাদের সবার ক্ষেত্রে এটা ঘটে কিনা জানি না, তবে উড়িয়ে দেওয়ার মতো কথা নয়। সমাজে এর উদাহরণও কম নেই। কিছু মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এরকম যে, তারা সহজে এসব উদাহরণ দেখে শিখতে চায় না।     

আচ্ছা তাহলে তাদের পরিণতি কী? পরিণতি এরা সবাই জানে। যেমনটা আগেই জেনেছিল পাহোম। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দৌড়ানোর আগের রাতে সে একটি পরাবাস্তব স্বপ্নের অভিজ্ঞতা পেয়েছিল যাতে সে হাসতে হাসতে শয়তানের পায়ে নিজেকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। তারপরও পাহোম দৌড়েছিল, বিশাল এলাকার জমি সে পেয়েও গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার ঠাঁই হয়েছিল ছয় ফুট দীর্ঘ একটি কবরে। এরপরও কী শেষ হবে না লোভের গল্প! থামবে না লোভীদের অযৌক্তিক, অনৈতিক আস্ফাালন! পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘আমি যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়েত দান করি’। সত্যি এদের দিলে সীলমোহর এঁটে গেছে। আবার পবিত্র কোরআনে মনুষ্যত্বের বিচারে ক্ষমা করাকে মহা উত্তম কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং আমরাও পাপীকে নয়, শেষ পর্যন্ত পাপকেই ঘৃণা করি।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads