• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৬

সম্পাদকীয়

ডাক সেবায় দৃষ্টিপাত জরুরি

  • প্রকাশিত ১৭ অক্টোবর ২০২০

মো. হাবিবুর রহমান মুন্না

 

 

ডাক সেবা প্রাচীন হলেও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির উৎকর্ষে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের অভ্যাস পরিবর্তনেও সংকোচবোধ করেনি। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর ইলেকট্রনিক মেইলের পরস্ফুিটনে ডাক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা দিয়েছে ভীষণ খরা। পরীক্ষার খাতার বাইরে চিঠি লেখার মতো সময় মানুষের আর নেই। পত্রের শেষে ‘চিঠি দিও’ শব্দটি এখন আর স্কুল কিংবা চাকরির পরীক্ষার খাতার সীমানা পেরোতে পারে না। আমাদের আবেগ, অনুভূতি, চিন্তাশক্তি আর উপস্থাপনা এখন চারকোনা এলইডি কিংবা আইপিএস পর্দার আড়ালে নিমজ্জিত। কাগজ, কলম, হলুদ খাম, লাল পোস্টবক্স আর ডাক পিয়নের লম্বা হাঁকের বিপরীতে অণুজীবের মতো দখল করে নিয়েছে ইনবক্স আর নোটিফিকেশনের টুংটাং শব্দ। এই অতি-আধুনিকায়ন আপাত দৃষ্টিতে উৎকর্ষ সাধন করলেও নীরব ঘাতকের মতো নষ্ট করে ফেলছে উৎফুল্ল ও কাঙ্ক্ষিত জীবনে বেঁচে থাকার সঞ্চার। তাই তো দেশে আত্মহত্যার মতো সামাজিক ব্যাধি ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাস্তার পাশে জীবনগল্পের বাহক লাল পোস্টবক্সগুলো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো এখন কেউ কেউ জনচক্ষুর অগোচরে ডাস্টবিনরূপে ব্যবহার করে। অথচ ১৫ বছর আগেও দেশে ২৪ কোটি চিঠি বিনিময় হয়েছিল; ৫ বছর আগে চিঠি বিনিময়ের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৪ কোটি। অর্থাৎ দশ বছরের ব্যবধানে চিঠি ব্যবহার হ্রাস পায় প্রায় পাঁচ গুণ; আর ডাক যোগাযোগের প্রতি মানুষের অনাগ্রহতার অনেকগুলো যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের পরও গ্রাহকের কাছে চিঠি পৌঁছাতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় নেওয়া, অদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রাহকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও আধুনিক কৌশল অবলম্বনে অপারগতা, প্রেরক কিংবা প্রাপক প্রেরিত মালামাল আত্মসাৎ, জনবলের অভাব, ডাকঘরগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংকট, আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবা প্রদানে ঘাটতি, নিয়মহীন পরিবহন ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতা, সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত অর্থে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্বার্থসিদ্ধি এবং সীমাহীন দুর্নীতি ইত্যাদি বাংলাদেশের ডাক বিভাগের অচলাবস্থার মূল কারণ। সম্প্রতি একটি জাতীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে ডাক বিভাগের ৫৪১ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যয়কৃত অর্থে কেনা সরঞ্জামের অস্তিত্বহীনতা এবং ‘ডাকের ডিজির’ ১৬০ কোটি টাকার হদিস না পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়। শুধু তাই নয়, কাগজে-কলমে ডাক বিভাগের বরাদ্দকৃত ই-সেন্টার থাকলেও বাস্তবে তার কোনো চিহ্ন নেই। এখনো এ দেশের ডাক পরিবহন ব্যবস্থা রেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চিঠি পৌঁছাতে ৫ থেকে ৭ দিন লেগে যায়। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো দ্রুত এবং পরিপূর্ণ জবাবদিহিতার সঙ্গে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অথচ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সরকার শত শত কোটি টাকা লোকসান না গুণে কোষাগার ভর্তি মুনাফা অর্জন করতে পারত; পাশাপাশি জনসাধারণ পেত স্বল্পমূল্যে তথ্য ও বিবিধ আদান-প্রদানের সুবিধা।

তথ্য সঞ্চালনের এই প্রক্রিয়াটি অনেক পুরনো। পূর্বে মানুষ পশুর চামড়া কিংবা বাকলে লিখে তথ্য প্রেরণ করত। প্রাচীন যুগে কবুতরসহ বিশ্বস্ত পশুপাখি দ্বারা বার্তা বা চিঠি পাঠানো হতো। বিশ্বে প্রথম সমুদ্র পথে ডাক ব্যবস্থা চালু হয় ১৬৩৩ সালে। ভারতীয় উপমহাদেশে ডাক সেবা প্রচলন ঘটে ১৭৭৪ সালে। বিশ্বব্যাপী মুদ্রণকৃত খামের ব্যবহার শুরু হয় ১৮৩০ সালে এবং ডাক টিকিটের প্রকাশ ঘটে ১৮৪০ সালে। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ডাক টিকিটের ব্যবহার চালু হয় ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ৯৮৮৬টি ডাকঘর রয়েছে। এর মধ্যে বিভাগীয় ডাকঘর ১৪২৬টি এবং অবিভাগীয় ৮৪৬০টি; যেগুলোকে ইডি পোস্ট অফিস বলে। প্রায় ৫০ শতাংশ অবিভাগীয় ডাকঘর মেরামতহীন অবস্থায় পড়ে আছে। সামান্য সুযোগসুবিধা এসব ডাকঘরে পৌঁছায় না। আর অবিভাগীয় ডাকঘরগুলোর মধ্যে প্রায় ২৪ হাজার কর্মচারী নিম্নমানের বেতন স্কেল দিয়ে দিনানিপাত করছেন। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক কর্মচারী ন্যূনতম সুবিধা হতে বঞ্চিত। ডাক শিল্পকে বাঁচাতে হলে প্রথমত কর্মচারীদের সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন দরকার। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মানোন্নয়নই পারে ঘুণে ধরা ডাক ব্যবস্থায় শক্তি জোগাতে।

চিঠি ছাড়াও ডাক বিভাগ দুই ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। যদিও প্রচারণার অভাবে জনগণের কাছে বিষয়গুলো স্পষ্ট নয়। দুই ধরনের সেবার মধ্যে একটি মূল সার্ভিস, আরেকটি এজেন্সি সার্ভিস। চিঠিপত্র, রেজিস্টার চিঠিপত্র, জিইপি, ইএমএস, মানিঅর্ডার, পার্সেল, ভিপিপি, ভিপিএল, ডাক টিকিট বিক্রয় এবং ডাক দ্রব্য গ্রহণ, প্রেরণ ও বিলি— এগুলো সবই মূল সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে এজেন্সি সার্ভিসের মধ্যে রয়েছে— বীমা, সঞ্চয়, প্রাইজবন্ড, লাইসেন্স ফি গ্রহণ ইত্যাদি। ডাক বিভাগ অঞ্চল নির্বিশেষে দেশের সকল স্তরের মানুষের কাছে সর্বজনীন ও সর্বোত্তম ডাক সেবা প্রদানের মানসিকতা, গ্রাহকের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহযোগিতামূলক আচরণ এবং আমানতের নিশ্চয়তা প্রদান করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু ডাক মহাপরিচালকসহ সরকারি পক্ষের যথেচ্ছাচারের কারণে দেশের মানুষ প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত ও প্রতারিত হচ্ছে।

স্থবির ডাক বিভাগের সচলাবস্থা ফিরিয়ে আনতে ২০১৯ অর্থবছরে ই-কমার্স ‘নগদ’ চালু করা হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৭০ হাজার আউটলেট দিয়ে নগদের সেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ঘরে বসে কেনাবেচা, ক্রয়কৃত পণ্য ডাকঘরের মাধ্যমে ক্রেতার নিকট পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি ই-কমার্স সেবার প্রচলন রয়েছে ডাক বিভাগে। ই-কমার্স সেবার উদ্যোগ গ্রহণের পর থেকেই অলস ডাক যোগাযোগ খাতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করে ঠিকই, তবে আধুনিকতার বাজারে টিকে থাকতে এই পুনরুজ্জীবনী শক্তি যথেষ্ট নয়। দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে আর এরই পদোন্নতিতে ই-কমার্সের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ২৫-২৬ হাজার অর্ডার আসে। কাজেই পরিমিত পরিষেবা প্রদান করে তাদের দিকে মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়াতে পারলে সমানুপাতিক হারে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ঘটবে বলে আশা করা যায়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জনগণ এখনো ডাক সেবার ওপর নির্ভরশীল। আর প্রতিটি দেশেই ডাক বিভাগ সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। অথচ আমদের দেশে চলতি বছরেই ডাক খাতে সরকারকে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়। ই-কমার্স, পার্সেল সার্ভিস, সরকারি টেলি যোগাযোগের সঙ্গে একীভূতকরণ, অফিসিয়াল তথ্যাদিতে ডাকের নির্ভরতা বাড়ানো এবং লজিস্টিক পরিবহন সেবা সম্প্রসারণ ডাক বিভাগের নিষ্প্রভ পথ চলাকে আলোড়িত করতে পারে।

বর্তমানে ডাক অফিসগুলোতে আবেগমাখা চিঠির খোঁজে আর কেউ আসে না, যারা আসে তাদের বেশিরভাগই নোটিশ, পার্সেল, নথিপত্র ইত্যাদি নিয়ে চলে যায়। আগের মতো আর চিঠি লেখা, ডাকঘর, ডাকপিয়ন কিংবা পোস্টবক্স কেন্দ্রিক সিনেমা, নাটকও বানানো হয় না। কম্পিউটার আর মোবাইলের কিবোর্ডের স্পর্শে মানুষ কলম ধরতে ভুলে গেছে, সাহিত্য ভুলে গেছে। একেকটা চিঠি ছিল বাংলা চর্চার মাধ্যম, সাহিত্যের আধার। প্রত্যেকটি চিঠি বহন করত একেকটি মৌলিক গল্প। আর তাই তো বুদ্ধদেব গুহ চিঠি দিয়েই ‘সবিনয় নিবেদন’ বইটি লিখে ফেলেছেন। মানুষের আবেগানুভূতি ও নিবেদনের স্মারক বহনকারী এই চিঠির স্মৃতিগুলো জমা থাক প্রত্যেকের হূৎ-প্রকোষ্ঠে।

 

লেখক :  শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads