• সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

তারুণ্য ভাবনা

করোনা, অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম এবং বাস্তবতা

  • প্রকাশিত ২২ অক্টোবর ২০২০

ইকবাল হাসান

 

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহ অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা একটি যুগান্তরকারী সিদ্ধান্ত। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত না করতে পারলে বিশ্বায়নের এ যুগে টিকে থাকা মুশকিল। তবে বর্তমান দেশের প্রযুক্তিব্যবস্থা বিবেচনায় আনলে অনলাইনে ক্লাস বাস্তবায়ন একটি চ্যালেঞ্জ। কেননা, এর জন্য যে টেকনিক্যাল সাপোর্ট প্রয়োজন, সেটি হয়তো সব শিক্ষার্থীর নেই। বিশেষ করে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করে, তার বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত ও গ্রামাঞ্চলের। দেশে এখনো অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল আছে, যেখানে নেটওয়ার্কের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। অথচ করোনার জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশের শিক্ষা কর্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলেও উন্নত দেশগুলো এই ক্ষতি অনলাইনের মাধ্যমে পুষিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো পড়েছে বিপাকে। পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্ঞান এবং অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না শিক্ষকরা।

অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা আমাদের দেশে  একেবারেই নতুন। করোনা না আসলে হয়তো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার কথা আরো পরে ভাবা হতো। কিন্তু হঠাৎ এই পদ্ধতিতে ক্লাস নেওয়ার ফলে অনেক শিক্ষকরাই কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস করছে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। এই দুই পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদানের জন্য কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অ্যাপসের ব্যবহার করছে অথবা ইউটিউবে ভিডিও আকারে লেকচারগুলো দিয়ে দিচ্ছে। এতে ক্লাসরুমে ক্লাস নেওয়ার অনুভূতির বিন্দুমাত্র পাওয়া না গেলেও বাধ্য হয়ে  করতে হচ্ছে। যখন জুম অ্যাপস বা অন্য অ্যাপসে যখন ক্লাস নেওয়া হয় তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিজেদের ভাব আদান-প্রদানের একটি পরিবেশ থাকে। এই পদ্ধতি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করলেও কিছু কলেজ শুরু থেকেই ইউটিউবে লেকচারগুলো দিয়ে আসছিল। এতে দেখা যায় শিক্ষকগণ একা একা একটি মোবাইল ফোনের সামনে বসে ক্লাস নিচ্ছেন, নিজের মতো করে বুঝিয়ে যাচ্ছেন। ফলে, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ থাকছে না। এতে শিক্ষার্থীরা কিছু বুঝে উঠতে পারে না আবার শিক্ষকরাও ঠিকমতো ক্লাস নিতে পারেন না।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য কিছু কলেজ জুম অ্যাপসে ফিরে আসলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ, যখন প্রতিষ্ঠান থেকে ইউটিউবে ভিডিও দেওয়া হতো তখন একটা বিষয়ের যত শিক্ষক আছে তারা সবাই আলাদা আলাদা অধ্যায়ে ভিডিও  বানিয়ে একই দিনে দিয়ে দিতো। এতে, শিক্ষকদের দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জন্য সেটা হতো শিক্ষার বোঝা! তাই, এখন জুম অ্যাপসে ক্লাস নিয়েও আশানুরূপ ফল আসছে না। এছাড়া, উচ্চ মাধ্যমিকে অনলাইনে ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়ার ঘটনা   লক্ষ্য করা গিয়েছে। এতে অনলাইনে শুধু শিক্ষক দেখিয়ে যাচ্ছেন, শিক্ষার্থী শুধু খাতায় উঠিয়েই যাচ্ছে! ব্যবহারিক শিক্ষার যে মূল বিষয়; হাতে কলমে শেখানো সেটাই হচ্ছে না। এতে, সামনের দিনে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যারিয়ারে কিংবা শিক্ষাগত জীবনে কতটা দক্ষ হতে পারবে সেটা নিয়েও সন্দেহ থেকে যাচ্ছে! ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা কিছু কলেজ এই করোনার জন্য তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লাভ করার কোনো পন্থাতেই ছাড় দেয় নি। শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার নাম করে লুটে যাচ্ছে অভিভাবকদের টাকা। নামমাত্র অনলাইন ক্লাসের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে।

উচ্চ মাধ্যমিকের সমস্যার কথা শেষ হলেও এখনো বাকি আছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা। করোনার কারণে দেশে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আছে সেটাই ভুলতে বসেছে অনেকে। অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বয়স চলে যাচ্ছে কিন্তু অনার্স আর পাশ করা হলো না। এখনো তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ! প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়েই অনলাইন ক্লাস ভালো মতো হচ্ছে এবং সেটা শিক্ষকদের সহযোগিতামূলক মনোভাবের কারণেই শুধু সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে গিয়েছে নৈশ বিদ্যালয়! সেগুলো আর বিশ্ববিদ্যালয় নেই। তার কারণ,  কিছুসংখ্যক শিক্ষক ক্লাস নেন রাতের দিকে। ক্যাম্পাস খোলা থাকলে আগে সান্ধ্যকালীন স্নাতকোত্তর ক্লাস করাতেন নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাসের সময়ে অথবা কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যেতেন ক্লাস নিতে। এই বন্ধেও সেটাই হচ্ছে। যে সময়টা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দেওয়ার কথা ছিল সেটা দিচ্ছেন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে আর নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সময় দিচ্ছেন রাতে। এতে করে শিক্ষার্থীরা আছেন নানারকম ঝামেলায়।

আমাদের দেশ ডিজিটাল হওয়ার পথে কিন্তু মোবাইল ডাটা বা অন্য নেটও সেভাবে কাজ করে না। তাই, বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষার্থী ঘরের বাইরে কোনো গাছতলায় বসে ক্লাস করে। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীও রয়েছে! এই ধর্ষণ মহামারীর যুগে একজন নারী শিক্ষার্থী কি রাতে বাইরে গিয়ে ক্লাস করতে পারে? সেই নিরাপত্তা বা সক্ষমতা কি তার আছে? যদি নাই থাকে তাহলে একজন শিক্ষক হিসবে কি সেটা বুঝেন না শিক্ষকরা?

সব বিশ্ববিদ্যালয়ে মোটামুটি অনলাইন ক্লাস ভালোভাবেই চলছে কিন্তু গুটিকয়েক শিক্ষকের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাই, সবার কথা চিন্তা করে ক্লাসের সময়সূচি নির্ধারণ করলে সবাই অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে পারে। এছাড়া, বিভিন্ন কলেজে যে ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেগুলো বন্ধ করার আহ্বান করছি। কারণ, এরকম দায়ছাড়াভাবে শুধু দায়িত্ব পালন করে গেলে শিক্ষার্থীরা কিছু শিখতে পারবে না। শিক্ষাবর্ষের সময় বৃদ্ধি করা হোক, চাকরিতে প্রবেশের সময় বৃদ্ধি করা হোক। না হলে এরকম অটো পাশ এবং অনলাইন ব্যবহারিক ক্লাস চলতে থাকলে বর্তমান প্রজন্ম নিয়ে এই বাংলাদেশ কী করবে ভেবে দেখতে হবে। ১৯৭২ সালেও অটো পাশের ঘটনা ঘটেছে এতে, প্রয়াত আনিসুজ্জামান স্যার তার ভাবনা ‘বিপুলা পৃথিবী’তে উল্লেখ করেছেন। করোনার জন্য পরীক্ষা নেওয়ার দাবি করা যায় না কিন্তু করোনা শেষ হলে একই জায়গা থেকে শিক্ষাবর্ষ শুরু করা যায়। আর যেসব শিক্ষার্থী শেষ বর্ষে আছে তাদের সংখ্যাতো কম তাই তাদের না হয় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হোক কিংবা চাকরিতে প্রবেশের সময় বাড়ানো হোক। তাই, দায়িত্ব পালনের জন্য পালন না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলার বোধ নিয়ে দায়িত্ব পালন করা উচিত বলে মনে করি।

সবশেষে বলবো, শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদণ্ড তেমনি এই মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে গবেষণাহীন একটি শিক্ষিত প্রজন্মই যথেষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদকে একটি চাকরির নিশ্চয়তা না ভেবে, গৎবাঁধা জীবনের বাইরে চিন্তা করতে হবে। নতুন একটি প্রজন্মকে তৈরি করতে হলে গবেষণা অত্যাবশ্যক। গবেষক তৈরি করতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়াও অন্যান্য কাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা থাকতে হয়। তাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে তৎপর হতে হবে। সুতরাং অনলাইন ক্লাসের কাঠামো ও পরিধি বিন্যাসেও গবেষণার ক্ষেত্রেটিতে জোর দেওয়া আবশ্যক বলে মনে করছি।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

mdikbalhassansajib29¦gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads