• বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

উন্নয়ন এবং কিছু প্রশ্ন

  • প্রকাশিত ২৫ অক্টোবর ২০২০

আল আমিন ইসলাম নাসিম

 

বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ কতটা প্রশস্ত হয়েছে তা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না। কেননা যেখানে বাংলাদেশকে নিয়ে প্রতিনিয়ত টেবিল টকশো হচ্ছে দেশের মাটিতে, ভারত, মিয়ানমার বা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে, সেখানে উন্নয়ন নিশ্চয়ই জোরালোভাবে হয়েছে বাংলাদেশের। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের ডাটাবেজ অনুসারে জানা যায়, ডলারের হিসাবে বাংলাদেশ তার মাথাপিছু জিডিপির ক্ষেত্রে ভারতকে পেছনে ফেলেছে। গত ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এ একটি দীর্ঘ ও কঠিন অগ্রগতি শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ২০২০ সালে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হবে, যা অন্যান্য উদীয়মান দেশের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাবে। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হবে। প্রবৃদ্ধির এই ধারা ভারতকে টপকে যেতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশ যখন করোনার এই পরিস্থিতিতেও জিডিপিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, ভারত সেখানে গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি অর্জন করেছে। ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৭৭ ডলার হবে বলে জানিয়েছে আইএমএফ, যেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৮৮৮ ডলার। এছাড়া গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ হারে, আর এই সময়ে ভারতে হয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

তবে কি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি হওয়া মানেই কি গোটা দেশের উন্নয়ন? মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেই কী গ্রামীণ মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়? নাকি গুটিকয়েক মানুষের জন্য মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়? মূলত একটি দেশের উন্নয়ন প্রকৃতপক্ষে তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন সে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন হয়। গত পাঁচ বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৬ হাজার। ব্যাংকগুলোতে জমা থাকা এবং আগাম অর্থের হিসাবে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ২৬৫ জন। আশঙ্কাজনকভাবে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে দেশে। কিন্তু আর্থিক প্রগতি কোটিপতির সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করা যায় না। দেশে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উন্নয়নের রেকর্ড গড়ছে। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। এবার ভাসানচরে নতুন আবাসন প্রকল্প করা হয়েছে ১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য, যা নিঃসন্দেহে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনো যে উন্নয়নের ভিড়ে একাকী সে বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি। যেখানে প্রতিনিয়ত মানুষের আয় বন্ধ হচ্ছে, পাটকল চিনিকল বন্ধ হচ্ছে, সিন্ডিকেট হচ্ছে নানা ধরনের। ব্যবসা সংকটের ফলে শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছে, এসব বিষয় কি লক্ষ করা হচ্ছে?

বাংলাদেশ আজ অফুরন্ত উন্নয়ন সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্তু এখনো এদেশের ২০ শতাংশ মানুষ একেবারেই দরিদ্র। করোনাকালে মধ্যবিত্তরাও এই খাতায় নাম লিখিয়েছে। ব্যয়ের শত পন্থা থাকলেও এদের আয়ের কোনো উৎস নেই। প্রতিনিয়ত বাজারদর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া এতো উন্নয়নের মাঝে বেড়েছে বেকারত্ব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ার হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২১ এপ্রিল ২০২০ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, খাদ্য সংকটে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলায় এক গৃহবধূ গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এছাড়া গত ২০ অক্টোবর ২০২০ তারিখে দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকা থেকে জানা যায়, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারদের বাজার করার চাকরি চাই। শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো— ‘কোনো স্যার ম্যাম কি তাদের ব্যক্তিগত কাজে আমাদের ১৪তম ব্যাচের কাউকে জব/চাকরি দেবেন? সেটা যেকোনো ধরনের হতে পারে। আমরা কয়েকজন আছি যাদের এতে অসুবিধা হবে না। আমাদের কেউ কেউ আপনাদের বাজার করে দেয়াসহ অন্যান্য কাজও করতে পারব। করোনার মধ্যে আমাদের অনেকের বাবা-মা যারা সরকারি চাকরি করেন না, তাদের আয়ের উৎসই বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে আছি আমরা।’

অনেকেই বলবেন, এগুলো সাময়িক সমস্যা। কিন্তু একথা তো ঠিক, উন্নয়নের পথে অন্তরায়। এরকম লাখো শিক্ষার্থীরা বিরাজ করছে এখন দেশে। শৈশব থেকেই আমরা একটি প্রবাদ শুনে আসছি, ‘উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট’। আমাদের এখন সেই সদরঘাটের অবস্থা। কিন্তু আমরা এমন চাই না। আমরা চাই উপরে-নিচে দুদিকেই ফিটফাট থাকতে। উন্নয়নের মহাসড়কে গ্রামীণ জনজীবনের যে বেহাল দশা তা অনুমান করা যায়, তাদের মুখ-নিঃসৃত বাণী থেকেই। ৭০ বছরের ভ্যানচালক যখন বলেন, এখন কোনো কাজ নেই, যেভাবে চলার চলছি, কোনো আশা নেই এবং কারোর কাছে চাওয়া নেই। তার এ কথাই বলে দেয়, উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে রবিঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার জমিদারের গায়ে, আমজনতার গায়ে নয়।

কলকাতা টিভির ১৫ অক্টোবর ২০২০-এর ‘বাংলাদেশ বনাম ভারত’ উন্নয়ন বিশ্লেষণে বলা হয়, দুই দেশের উন্নয়ন হয়েছে ব্যাপক। অথচ জীবনমান বদলায়নি দু’দেশের কোনো গ্রামের মানুষদের। অথচ এরাই উন্নয়নের হাতিয়ার। বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে প্রথম হয়, ওষুধ শিল্পে দ্বিতীয়। অথচ এদেশের মানুষের অনেকেই ঈদ আসলে পোশাক কিনতে পারে না। ওষুধের অভাবে রাস্তায় পড়ে মরে থাকছে। সিমেন্ট শিল্পে প্রথম, রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসন প্রকল্প হচ্ছে অথচ দেশে ঘরহীন মানুষের সংখ্যা কত তার হিসাব নেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো যেন এভাবেই শিখে নিয়েছে, যেমন চলছে, চলে যাবে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন বলতে আমরা কিসের উন্নয়ন ঘটিয়েছি? দেশের না ধনী তথা বিত্তশালীদের? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে এখন সাধারণ মানুষ।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads