• বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

শাক-সবজি করলে চাষ, আয় হবে বারো মাস

  • প্রকাশিত ২৬ অক্টোবর ২০২০

জি. এম. আরিফ

 

আমাদের প্রায় সবারই বসতবাড়ির আশপাশে পতিত জায়গা বা খালি জায়গা পড়ে থাকে বছরের পর বছর। আমরা নিজেরা যদি একটু পরিশ্রম করে কিছু শাক-সবজি রোপণ করি তা দিয়ে নিজেদের খাবারের চাহিদার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ছোটবেলায় দেখতাম (৯০ দশকের মাঝামাঝি) আমার মা বাড়ির আশপাশে খালি জায়গায় বিভিন্ন রকমের শাক-সবজি লাগাতেন এবং এগুলো একটু বড় হলে রান্না করে নিজেরা খেতেন, এভাবে দেখা যেত বছরের অধিকাংশ সময় আমাদের তরিতরকারি কেনার কোনো দরকার হতো না। এইসব সবুজ-সতেজ শাক-সবজি খেতেও খুব ভালো লাগতো এবং পুষ্টিগুণও সবচেয়ে বেশি থাকতো। আমার মা যেসব শাক-সবজি চাষ করতেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-মিষ্টি কুমড়া, লাউ, কলমি শাক, পালং শাক, ডাঁটা শাক, চালকুমড়া, কচু শাক, শিম, ঢেঁড়শ, মরিচ, আলু শাক, বেগুন, করলা, পেঁপে, টমেটো, কাঁচকলা, কচু ইত্যাদি। এইসব তরিতরকারি অল্প পরিমাণে বাড়ির আশপাশে সারাবছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে লাগাতেন এবং অবসর সময়ে এগুলো পরিচর্যা করতেন। অনেক সময় দেখা যেত যে, শাক-সবজির ফলন বেশি হলে, কিছু শাক-সবজি আমি  স্থানীয় বাজারে নিয়ে বিক্রি করতাম এবং ঐ টাকা দিয়ে ঘরের জন্য অন্য খরচ ( তৈল, লবণ, পেঁয়াজ, মুড়ি, কেরোসিন, চিনি ইত্যাদি) অল্প পরিমাণে কিনে আনতাম। এভাবে প্রতিটি বাড়িতে যদি অল্প পরিমাণে শাক-সবজির আবাদ করা যায় তাহলে পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি চাহিদার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের মাধ্যমে অভাব অনটনও দূর হবে।

বর্তমানে বাড়ির আশপাশে খালি জায়গা থাকলেও মহিলারা বা গৃহকর্তা শাক-সবজি চাষে খুব একটা আগ্রহী নয়, ফলে সংসারে অভাব অনটনের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের পুষ্টির অভাব দেখা দেয়। ফলে দেখা যায়, পুরুষেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও সংসারের সচ্ছলতা আনতে পারে না, শুধুমাত্র একটুখানি বুদ্ধির অভাবে। পুরুষের আয়ে পুরো মাসের সংসার খরচের পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারের দুজনকেই। একটু বুদ্ধি খরচ করে কিছু শাক-সবজির চাষ করলে খুব সহজেই তরিতরকারির চাহিদা মিটানো সম্ভব এবং এর ফলে অনেক অর্থ সাশ্রয়ী হবে।

বর্তমান করোনাকালীন সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সব জিনিস হাতের নাগালের বাইরে, ফলে সাধারণ মানুষ শাক-সবজি কিনে খেতেও হিমশিম খাচ্ছে।  এই মানুষেরা যদি একটুখানি খালি জায়গায় কিছু শাক-সবজি রোপণ করতো তাহলে এভাবে কষ্ট করতে হতো না। এক প্যাকেট বীজের দাম ৩০-৫০ টাকা কিন্তু এই এক প্যাকেট বীজ রোপণ করে ভালোমত পরিচর্যা করতে পারলে নিজেরা খেয়ে বাড়তিগুলো বিক্রিও করতে পারবে, এইভাবে প্রতিটি পরিবারে পুষ্টি চাহিদার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের উৎস হবে। আবার আমরা যদি তরিতরকারি বাজার থেকে কিনি তখন দেখা যায় যে, নানান রকম ফর্মালিন এবং কীটনাশক  মেশানো তরিতরকারিতে বাজার সয়লাব এগুলো খেলে বিভিন্ন রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে এবং খাবারের আসল স্বাদ পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা যদি বাজার থেকে না কিনে অল্প পরিমাণে চাষ করি তাহলে ফ্রেশ এবং টাটকা শাক-সবজি খেতে পারবো।

বর্তমান সময়েও কৃষি বিভাগ থেকে স্বল্প মেয়াদে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সেখানে দেখা যায় যে, তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকেরাই আসলে কৃষিকে এখনো ধরে রেখেছে। তিন দিনব্যাপী কৃষি প্রশিক্ষণে কোন মৌসুমে কী কী শাক-সবজি লাগাতে হবে, কোন ফসল সবচেয়ে বেশি লাভজনক এবং বাজার ভালো, কোন রোগে কী কী ওষুধ ব্যবহার করতে হবে এবং কী পরিমাণ ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি। এই প্রশিক্ষণে অনেক কিছু দেখলাম এবং বুঝলাম, এই প্রশিক্ষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি নিজেও বিভিন্ন ধরনের শাক ও সবজি রোপণ করি। রোপিত এইসব শাক-সবজি মাস দুয়েক পরে খাওয়ারও উপযুক্ত হয়েছে এবং নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু আত্মীয়স্বজনের মাঝেও বিলি-বণ্টন করেছি। নিজের রোপিত সতেজ শাক-সবজি যখন তখন তুলে রান্না করে খাওয়া যায় এতে তরিতরকারির পুষ্টিগুণ ঠিক থাকে এবং খাবারের মানও ভালো থাকে।

 দেশের প্রত্যেকটি ইউনিয়নে একটি করে কৃষি অফিস আছে এবং একজন করে কৃষি কর্মকর্তা আছে। প্রত্যেক কৃষকের উচিত এইসব কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে বাড়ির পতিত  জায়গায় উন্নতমানের শাক-সবজি চাষ করা। রোগবালাই দমনে কার্যকরী ওষুধ প্রয়োগের জন্য মাঝে-মধ্যে কৃষি কর্মকর্তার সহায়তা ও পরামর্শ চাওয়া। আধুনিক কৃষি বীজ ব্যবহার করলে যেমন বেশি ফলন পাওয়া যাবে, তেমনি পরিবারের আয়ও বাড়বে। আর এইসব শাক-সবজি লাগাতে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না, আবার খুব একটা খরচও লাগে না। বেকার যুবকেরা ইচ্ছা করলে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প থেকেও লোন নিয়ে বাড়ির আশপাশে  পতিত জমিতে শাক-সবজির খামার গড়ে তুলতে পারে। এতে যেমন নিজের কর্মের সংস্থান নিজেই করতে পারবে, তেমনি বেকারত্ব ঘুচিয়ে অন্যের কর্মসংস্থানও করতে পারবে।

বর্তমান করোনাকাল আমাদের অনেকভাবেই শিক্ষা দিচ্ছে চারিদিকে খাদ্যের হাহাকার এবং অর্থনৈতিক সংকট। মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে শান্তিমতো খেতে পারছেনা, বাজারের  দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কৃত্রিম সংকট। এখন আমরা নিজেদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে যদি বারোমাস শাক-সবজি একটু একটু  লাগাই তাহলে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে পারবো এবং এর মাধ্যমে বেকার যুবকেরা খুব সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারবে।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads