• বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

জেসিন্ডা আরডর্ন

দেশপ্রেমে অত্যুজ্জ্বল এক নেতার কথা

  • প্রকাশিত ২৭ অক্টোবর ২০২০

মো. জিল্লুর রহমান

 

 

জেসিন্ডা আরডর্ন নামটি বিশ্ববাসীর সামনে চলে আসে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলার পর। পৃথিবীর ইতিহাসে বয়োকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের মন কেড়েছেন তার সদালাপ আচরণ দিয়ে। দেশটির সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে জেসিন্ডা আরডর্ন ও তার দলের নিরঙ্কুশ বিজয় এখন সে কথাই বলছে। গত ১৭ অক্টোবর ২০২০ তারিখ অনুষ্ঠিত নিউজিল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন জেসিন্ডা আরডর্ন। পুরো নাম জেসিন্ডা কেটি লওয়েরেল আরডর্ন। জন্ম ১৯৮০ সালের ২৬ জুলাই। এশিয়া-প্যাসিফিকের গুরুত্বপূর্ণ দেশ নিউজিল্যান্ডের রাজনৈতিক ক্ষমতায় এসেই সবার নজর কাড়েন এই তরুণ নেত্রী।

গত সেপ্টেম্বর মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে নির্বাচন পিছিয়ে যায়। ভোট গণনায় দেখা গেছে, আরডর্নের দল ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ ন্যাশনাল পার্টির প্রায় দ্বিগুণ বেশি ভোট পেয়েছে। জেসিন্ডা আরডর্নের লেবার পার্টি মোট ভোটের ৪৯ ভাগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ ন্যাশনাল পার্টি পেয়েছে ২৭ ভাগ ভোট। অর্থাৎ দেশটির ১২০ আসনের মধ্যে ৬৪টি আসনে জয় পেয়েছে লেবার পার্টি।

তিনি ২০০৮ সালে যখন প্রথম নিউজিল্যান্ডের সংসদে প্রবেশ করেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর। তখন তিনিই নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে তরুণ সংসদ সদস্য ছিলেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি তার পেশাগত দক্ষতা দেখিয়ে সকলের নজর কেড়ে ছিলেন। ২০১১ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্কের গবেষক হিসেবে কাজ করেন। তারপর কিছুদিন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারেরও নীতিনির্ধারক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি ২০০৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্কলাসটিক ইয়ুথ সংগঠনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালে তিনি নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির নেতৃত্বে চলে আসেন। কেউ কল্পনাও করেনি লেবার পার্টি এক সময় ক্ষমতায় যাবে। সবাইকে বিস্মিত করে তিনি তার নিজের প্রচণ্ড কর্মদক্ষতার গুণেই দলকে জিতিয়ে ক্ষমতাসীন করেন।

২৪ বছর আগে ১৯৯৬ সাল থেকে দেশটিতে মিশ্র সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (এমএমপি) ব্যবস্থা চালুর পর কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে জেসিন্ডা আরডর্নের দল লেবার পার্টি এ ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। এমএমপি ব্যবস্থায় ভোটারদের দুটো ভোট দিতে হয়। একটি দিতে হয় পছন্দের দলকে, অন্যটি নির্বাচনী আসনের পছন্দের প্রার্থীকে। এমএমপি ব্যবস্থা চালুর পর এখন পর্যন্ত দলটি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ফলে এবারই প্রথমবারের মতো একক দলের সরকার গঠন করতে পারবেন জেসিন্ডা আরডর্ন।

জেসিন্ডা আরডর্ন প্রথমবার গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনামে পরিণত হন যখন তিনি সারাবিশ্বে প্রথমবারের মতো সবচেয়ে কম ৩৭ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিউজিল্যান্ডের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। নিউজিল্যান্ডের ১৫০ বছরের ইতিহাসেও তিনি সবচেয়ে কম বয়সি সরকারপ্রধান। দ্বিতীয়বার তিনি সংবাদ শিরোনামে পরিণত হন যখন তিনি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় তার বাচ্চা প্রসব করার জন্য ছয় সপ্তাহের ছুটি গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০১৮ সালে তিনি একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন এবং প্রায় তিন দশক পর তিনি পূর্ববর্তী রেকর্ড ভঙ্গ করেন। এর আগে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ১৯৯০ সালে ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় একটি সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন।

ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৫১ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডর্ন এক সংকটপূর্ণ মুহূর্তে যে নেতৃত্বগুণ দেখিয়েছেন তা বিশ্বব্যাপী বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি সারা বিশ্বে সবচেয়ে প্রশংসিত হন যখন ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা বেশ দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। তিনি ঘটনার পরপরই নিউজিল্যান্ডের পার্লামেন্ট অধিবেশন আহ্বান করেন এবং মুসলিম কমিউনিটির সঙ্গে সংহতি জানানোর জন্য পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অধিবেশন শুরু করেন। তিনি কালো হিজাব পরিধান করে অধিবেশনে উপস্থিত হন, আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমবেদনা জানান এবং অধিবেশনে তিনি আসসালামু আলাইকুম বলে তার বক্তব্য শুরু করেন। তার বক্তব্যে তিনি হামলাকারীর নাম ঘৃণাভরে শুধু প্রত্যাখ্যানই করেননি, তিনি তার নাম উচ্চারণ করতেও অস্বীকৃতি জানান যা সারা বিশ্বে বেশ প্রশংসিত হয়। তিনি হামলাকারীকে আইনের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন, তাকে সন্ত্রাসী, অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তা ছাড়া তিনি সন্ত্রাসী হামলার দিনটিকে মুসলিম কমিউনিটির জন্য ‘অন্ধকারতম দিন’ এবং যারা হামলার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন, তাদের তিনি কৃতজ্ঞতা চিত্তে স্মরণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম কমিউনিটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নিউজিল্যান্ডের সমস্ত রেডিও ও টেলিভিশন স্টেশনকে কোরআন তেলাওয়াত ও আজান প্রচারের নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য, তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্প্রতি ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলার বিচারের রায় প্রকাশিত হয়েছে।

একজন শক্তিশালী নেতার নেতৃত্বের দক্ষতা তখনই প্রমাণিত হয়, যখন কোনো দুর্যোগ খুব দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দূত এই নেত্রী বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস মোকাবিলায়ও ছিলেন দারুণ সফল। সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন করোনাভাইরাস মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছিল, তখন জেসিন্ডা আরডর্ন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিউজিল্যান্ডের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করে সারা বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন। ৫ মে ২০২০ তারিখ তিনি নিউজিল্যান্ডকে করোনামুক্ত দেশ বলে ঘোষণা করেন। করোনাকালে তিনি তার নাগরিকদের কাছে দ্রুততার সঙ্গে তথ্য বিনিময় করেছেন, তাদের সহযোগিতায় সক্রিয়ভাবে লকডাউন কার্যকর করেছেন। তিনি তার কর্মীদের ২০ শতাংশ বেতন কমিয়েছেন, যারা কর্মহীন হয়েছিল তাদের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন। যারা করোনায় সংক্রমিত হয়েছিল, তাদের প্রতি যে মমত্ববোধ ও সহমর্মিতা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই একজন মানবিক নেতার আচরণ হিসেবে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

বিশ্বে প্রথমবার যে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের কক্ষে সন্তান নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি আর কেউ নন, এই জাসিন্ডা আরডর্ন। গত বছর নেলসন ম্যান্ডেলা পিস সামিটে অংশ নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছেন এই নারী। বক্তৃতা দেওয়ার সময় তার সন্তান ছিল জীবনসঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ডের কোলে। তিনি পরমাণুমুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন দেখেন। তিনি ফিলিস্তিন ও ইসরাইল দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সমর্থক এবং অন্যায়ভাবে গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রবক্তা।

তিনি আগামী এক দশকে নিউজিল্যান্ডে একশ কোটি বৃক্ষ রোপণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তার দেশের সমস্ত বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পরিণত করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। তিনি ২০৫০ সালের মধ্যে তার দেশের কার্বন নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনতে ইচ্ছুক ও এর প্রবল সমর্থক। এ কাজে গতি আনার জন্য তিনি তার সরকারের পক্ষ থেকে ক্লাইমেট চেইঞ্জ কমিশন গঠন করেছেন।

তিনি সামাজিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, প্রগতিশীল চিন্তা ধারণ করেন, একজন রিপাবলিকান ও নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক তার রাজনৈতিক আদর্শ বা হিরো এবং নিউজিল্যান্ডের দরিদ্র শিশু ও গৃহহীনদের জন্য পুঁজিবাদের ব্যর্থতাকে দায়ী হিসেবে মনে করেন।

তিনি শুধু ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলা কিংবা করোনা মোকাবিলা করেই প্রশংসিত হননি, তিনি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে হোয়াইট আইল্যান্ডের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা খুব দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন। তিনি মানবতার পক্ষে কথা বলতে কখনোই পিছপা হন না। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন এবং শিশু দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের সরকার হবে সহানুভূতিশীল। আর এ কারণে তিনি ২০১৮ সালে ‘ফোর্বসের পাওয়ার উইমেনের’ তালিকায় জায়গা করে নেন। তিনি টাইম ম্যাগাজিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকাতেও আছেন। তিনি সত্যিকারভাবে একজন গণতন্ত্রের মডেল, মানবতার মূর্ত প্রতীক।

শুধু কি এটুকুই? না, তা মোটেই নয়। জেসিন্ডা আরডর্ন আজ বিশ্ব নেতৃত্বের উদাহরণ। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে মানুষে মানুষে ভালোবাসতে হয়, সম্প্রদায়গত ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে দেশসেবা কাকে বলে, বড় কিছু অর্জনের ক্ষেত্রে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ কেমন করে বিসর্জন দেওয়া যায়। সুতরাং আগামীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব নেতাদের তালিকায় জেসিন্ডা আরডর্ন স্বমহিমায় জায়গা করে নেবেন, এ কথা আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়।

 

লেখক : ব্যাংকার ও মুক্তগদ্য লেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads