• শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ৪ বৈশাখ ১৪২৮

সম্পাদকীয়

মাগুরার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও একজন বীরাঙ্গনা

  • প্রকাশিত ২৫ জানুয়ারি ২০২১

ওকে/বদরুল

 

 

পরেশ কান্তি সাহা

 

 

১৯৭১-এর ২৭ এপ্রিল সিদ্ধান্ত হয় মোহনপুরের সেতুটি উড়িয়ে দিতে হবে। মোহনপুর দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত। জেলা সদর থেকে ১০ মাইলের পথে সেতুটির অবস্থান। রাতে ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন বীরপ্রতীকের নেতৃত্বে আবদুল মোতালেবের দল পায়ে হেঁটে ভারতের সীমানা অতিক্রম করে পৌঁছান মোহনপুর। উদ্দেশ্য সেতুটি ধ্বংস করা। কাছেই ছিল পাকসেনারা। তারাও আক্রমণ করতে পারে। যে কারণে একটি দল প্রতিরক্ষা অবস্থান নেয়। অপর দলটি সেতু ধ্বংসের কাজে লাগে। আবদুল মোতালেব ছিলেন প্রতিরক্ষা অবস্থানে। পাখি ডাকা ভোরে দিনের আলো পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই বিকট শব্দে সেতুটি ধ্বংস হয়ে গেল। শব্দ পেয়ে কাছে অবস্থানকারী পাকসেনারা গাড়িযোগে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে শুরু করল আক্রমণ। আবদুল মোতালেবদের দল এর জন্য প্রস্তুত ছিল। শুরু হলো প্রচণ্ড যুদ্ধ। আবদুল মোতালেবের দল ভীষণ সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগল। কিন্তু পাকসেনারা ছিল অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। অব্যাহত গুলি আর বৃষ্টির কারণে ইপিআর দল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। আবদুল মোতালেবের দল জীবন পণ করে মাটি কামড়ে যুদ্ধ করতে থাকে। পাকসেনাদের আক্রমণ ক্রমান্বয়েই বেগবান হতে থাকে। শহীদ হলেন তার দুজন সহযোদ্ধা। আহত হলেন ৩-৪ জন। কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজেও গুরুতর আহত হন। প্রচণ্ড বেগে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। কয়েকজন সহযোদ্ধা তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। তাতেও রক্তক্ষরণ বন্ধ হলো না। তখন সহযোদ্ধারা গ্রামবাসীর সহযোগিতায় উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান সীমান্তের ওপারে। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। পথেই এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে সহযোদ্ধারা তাকে বাঙালপাড়ায় সমাহিত করেন।

শহীদ নায়েক আবদুল মোতালেব বীরবিক্রম ১৯৪৪ সালের ৫ জুন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার পূর্বশ্রীকোলে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা গোলাম সরোয়ার মিয়া। মা আমেনা বেগম। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। স্ত্রী হাসিনা বেগম স্বামীহারা হয়ে নানা চিন্তায় রোগগ্রস্ত হয়ে ১৯৭৫ সালে মারা যান। একমাত্র সন্তান মো. হাসান মিয়া বর্তমানে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, কালীগঞ্জে কর্মরত আছেন। শহীদ নায়েক আবদুল মোতালেব বীর বিক্রম একজন ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। ছোট ভাই আবদুর রাজ্জাক যশোর সেনানিবাসে চাকরি করতেন। তিনিও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি শহীদ হন।

১৯৬৪ সালে সেনাবাহিনীর তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন। পাকিস্তানের শিয়ালকোটেও প্রশিক্ষণ নেন। একাত্তরে তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল সৈয়দপুর সেনানিবাসে। ৩০ মার্চ ওখানে পাকসেনাদের সঙ্গে বাঙালি সেনাদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টে চারটি কোম্পানি ছিল। নায়েক আবদুল মোতালেব ছিলেন এ কোম্পানিতে। ওই কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন বীরপ্রতীক, বর্তমানে মেজর জেনারেল (অব.)। নায়েক আবদুল মোতালেব ছিলেন অসীম সাহসী যোদ্ধা। হেভি মেশিনগান চালাতেন। এপ্রিলের ৯, ১০, ১১ ও ১৯ তারিখে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি স্থানে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে সীমান্ত অতিক্রম করেন। অবস্থান নেন ভারতের কামারখালীতে। সেখানে অবস্থান করেও বাংলাদেশের ভেতরে কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ করে মোহনপুর যুদ্ধে সাহস ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শহীদ আবদুল মোতালেবকে মরণোত্তর বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। আবদুল মোতালেবের স্মৃতিকে চির ভাস্বর করে রাখার জন্য শ্রীপুরে খামারপাড়া বাজার থেকে তার নিজের জন্মস্থান পূর্বশ্রীকোল প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম নায়েক আবদুল মোতালেব সড়ক’।

 

দুই.

“যুদ্ধের শ্যাষের দিক। চারদিক পানি আর পানি। স্বামী ও দেওর দুজনই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। মিলিটারিরা ওদেরকে ধরতে আসে আমাদের বাড়িতে। ওই সময় ওরা কেউই বাড়িতে ছিল না। ছিল বুড়ো শ্বশুর। মিলিটারিদের দেখে আমি দৌড়ে যাই পাশের আনোয়ার উকিলের বাড়িতে। কিন্তু ওরা আমায় ধরে ফেলে। উকিল সাহেব আমাকে ছাড়ে দেবার জন্য অনেক অনুরোধ করে। কিন্তু কে কার কথা শোনে! বাঘের সামনে হরিণের বাচ্চা পেলে যেমনডা হয়। ওদের হাত পা জড়ায়ে ধরলাম- আমার স্বামী আসলি আপনাদের কাছে ধরায়ে দিবো- আমারে ছাড়ে দ্যান। টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গেল পাশের জঙ্গলে। তারপর যা হওয়ার, তা-ই হলো। একজন, দুইজন, তিনজন, চারজন পর্যন্ত আমার হুঁশ ছিল। এরপর কী হইছে, তা আর আমি জানিনে। পরদিন বেহুঁশ অবস্থায় পাশের লোকজন আমারে উদ্ধার করে। নিয়ে যায় সামাদ ডাক্তারের কাছে। এক মাস তার কাছে চিকিৎসা নিই। এট্টু সুস্থ হলি মিলিটারিদের খবরাখবর পৌঁছে দিতে থাকি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।”— চোখ মুছতে মুছতে এমনটাই বললেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা লাইলী বেগম।

লাইলী বেগম জন্মগ্রহণ করেন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার রায়নগর গ্রামে। বাবা মোবারেক মোল্যা। মা ফুলজান বিবি। স্বাক্ষরজ্ঞান আছে। বিয়ে হয়েছে শ্রীপুর উপজেলার পাশে মনদপুর গ্রামে। স্বামী মুক্তিযোদ্ধা মনোয়ার মোল্যা এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি। স্বামী ভ্যান চালাতো, কিন্তু এখন আর শরীর চলে না। ছেলেরা ভ্যান চালায়। পাঁচ সন্তানের জননী।

“দ্যাশ স্বাধীন হলে পাড়ার লোকজন আমাকে ছাড়ে দেবার জন্য বলেছিল কিন্তু স্বামীডা ভালো মানুষ বলে ছাড়েনি। দ্যাশের জন্য ইজ্জত গ্যাছে কিন্তু কিছুই পাইনি। এমনকি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতিটাও। আমার কষ্টডা কি দ্যাশ কোনোদিন বুঝবো?”— এমনই প্রশ্ন করলেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা লাইলী বেগম। তবে সুখের কথা, রাষ্ট্রীয়ভাবে না হলেও বেসরকারি পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে লাইলী বেগমকে দেওয়া হয় বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি। ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি তারিখে সম্মাননা উপহার হিসাবে এই বীরাঙ্গনার হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও এক লাখ টাকা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads