• বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২ বৈশাখ ১৪২৭

সম্পাদকীয়

উন্নয়নশীল দেশের অগ্রযাত্রায় পালিত হোক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

  • প্রকাশিত ০৪ মার্চ ২০২১

ইউসুফ শরীফ

 

 

 

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস জাতির আত্মার প্রতিধ্বনিতে মুখরিত আলোকিত দিবস। আত্মশক্তি অর্জন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বোধ-চেতনা জাগ্রত রাখার এই দিবসে গোটা জাতি নতুন শপথে উদ্দীপ্ত হয়। আজ শপথ নেওয়ার দিন, সামনে এগোনোর দিন। এবার জাতি এই দিবস পালনের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় জাতির জীবনে এ এক বড় প্রাপ্তি। এরও আগে বিশ্বসভায় একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি জাতীয় মর্যাদাকে প্রশংসনীয়ভাবে উদ্দীপ্ত করেছে, তা হলো জাতির পিতার সাত মার্চের ভাষণ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বস্তুত আনুষ্ঠানিক এই স্বীকৃতির আগেই ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় এই ভাষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিনন্দিত-প্রশংসিত হয়েছে। সাড়ে চার দশকের বেশি সময় পরে জাতিসংঘের এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি সম্পর্কে প্রচলিত কথাটিই বলতে হয়, যা দেরিতে আসে, তা স্থায়ী হয়।

বঙ্গবন্ধুর এই অনন্য ভাষণ নিছক কোনো ভাষণমাত্র নয়—এ হলো জাতির আত্মার ধ্বনি—যিনি জাতির আত্মাকে ধারণ করেছিলেন, সেই মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে তাৎক্ষণিক ধ্বনিত হলেও তা ছিল জাতির চিরকালীন আকুলতায় স্নাত। এই ভাষণ ছিল জাতির পিতার কণ্ঠে জাতির আত্মার সঙ্গীত। গোটা জাতির আত্মাকে তিনি ধারণ করেছিলেন। একটি জাতির সমুদয় বোধ-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আছে যে ভাষণ, তা নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ এবং চিরকালীন বিশ্ব ঐতিহ্য। বাঙালি জাতির মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব রক্ষায় দৃঢ়চিত্ততায় সিক্ত এই অবিস্মরণীয় ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যে অমলিন হয়ে থাকবে অনন্তকাল। মানবজাতির ইতিহাসে এমন কিছু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে, যা কোনোদিন মুছে যায় না—গোটা মানবজাতির স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকে।

জাতির পিতা সাত মার্চের জগদ্বিখ্যাত এই ভাষণ শেষ করেছিলেন ‘...এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই বাক্য দিয়ে। জাতির জীবনে এ এক চূড়ান্ত ঐতিহাসিক ঘোষণা। তিনি সেদিন যে মুক্তির কথা বলেছিলেন, সে মুক্তি শুধু জাতির রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক মুক্তিও। বাক্যের শেষাংশে তিনি যে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উচ্চারণ করেছেন, তার অর্থ রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তিও। বাঙালি জাতির প্রতি এই ভাষণ যুগ যুগের পথনির্দেশ, এতে সন্দেহ নেই। বলতে হয়, এই অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের পথযাত্রার স্বীকৃতির সূত্রপাতও ঘটল উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রার মাধ্যমে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতির সম্মানজনক ধাপে উত্তরণ করেছে। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি  আনুষ্ঠানিকভাবে আগেই জানিয়েছে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য সব শর্ত পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন করেছে।

উন্নয়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বাধীনতা— এই তিনটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। আবার বিন্যাস এভাবেও করা যায়, স্বাধীনতা-উন্নয়ন-অর্থনৈতিক মুক্তি। এই বিন্যাস যেভাবেই করা হোক না কেন, স্বাধীনতার পরম্পরায় আসে উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। অর্থনৈতিক মুক্তির মূলকথা উন্নয়ন-কর্মসংস্থান-জীবন মান বৃদ্ধি বা সুখ-সমৃদ্ধি।

দীর্ঘকাল স্বল্পোন্নত পর্যায়ে থেকে অভ্যস্ত দেশ-জাতির অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন শিথিল বা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়া বিচিত্র নয়। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে স্বল্পোন্নত অভিধার ছায়াতলে অনেকটা নিশ্চিন্ত থেকেছে। এই পরিস্থিতিতে যে সচেতন তাগিদ উচ্চারিত হয়েছে, তা হলো মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে অগ্রযাত্রা। বিগত এক দশকে দেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ বিদ্যুৎ-অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যগ্রাহ্য অগ্রগতি হয়েছে। তৈরি পোশাক রফতানি এবং প্রবাসী আয়ে অগ্রগতি অলক্ষ্যে দেশের মানুষের জীবন-মান ও জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্র-কর্ষণে যে কাজ করে যাচ্ছে, তা এই সময়কালে নানাভাবে সরকারি সহযোগিতা-প্রণোদনা লাভ করছে। এই প্রণোদনা কতটা মজবুত প্রক্রিয়া-সমর্থিত তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন, তবে এতে করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে ধারাক্রম স্পষ্ট  হয়ে উঠেছে, তা এক্ষেত্রে প্রশ্নাতীতই বলতে হয়। আর এরই প্রত্যক্ষ ফলোদয় জাতিসংঘের এই স্বীকৃতি। এর আগে সামাজিক উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতির স্বীকৃতিও লাভ করেছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির গাড়িটা চলতে শুরু করেছে। এখন গতি বৃদ্ধি করতে হবে— সমৃদ্ধ মান অর্জন করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপ্রতিহত শক্তির প্রমাণ আজকের এই বাংলাদেশ। যে কোনো আবেগ-চেতনাকে বাস্তব কর্মপ্রবাহে প্রয়োগের কৌশল যথাযথভাবে নির্ধারিত হতে হয়। কর্মক্ষেত্রে সাফল্য নিশ্চিত করার জন্যই তা হতে হয় শতভাগ নিশ্চিত। যে কোনো পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে সামগ্রিক বিষয়ে সুষ্ঠু গবেষণা, জুতসই প্ল্যান অব অ্যাকশন বা কর্ম-পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ বা কর্মতৎপরতা গ্রহণের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন সম্ভব।

আজ থেকে দুই বছর আগে এলডিসি থেকে ‘বাংলাদেশের উত্তরণ : সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক যে সেমিনার আয়োজন করে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, তা ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। কেননা এতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। জাতিসংঘ কর্মকর্তা, সরকারের সচিব-কর্মকর্তা, বেসরকারি খাতের নেতারা তাদের মতামত ব্যক্ত করেন তখন। এই সেমিনার মুক্ত আলোচনার একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। সরকারের ইআরডি বিভাগ আয়োজিত এই সেমিনার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্যের বিবেচনায় বলতেই হয়, আলোচনার মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো সামনে উঠে এসেছে, সেগুলোর পর্যালোচনা ও পুনঃপর্যালোচনার মাধ্যমে গৃহীত কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আগামী ৬ বছর ধরে অব্যাহত রেখে প্রয়োজনীয় ধাপগুলো উত্তরণের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৬ মার্চ উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্ত উত্তরণ উদযাপন করবে জাতি।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হওয়ার মূল বিষয় অর্থনীতির উন্নয়ন আর এজন্য অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার-এ তাগিদ সংশ্লিষ্ট দেশের ক্ষেত্রে বরাবর কমবেশি উচ্চারিত হয়ে থাকে—বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হচ্ছে এবং হবে। তবে সে উদ্যোগই সফল হয়, যা নিজস্ব বাস্তবতার নিরিখে পরিচালিত হয়। এজন্যই যেসব বিষয়ে জনসম্পৃক্ততা আছে অথচ বৃহত্তর স্বার্থে উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার, সেসব ক্ষেত্রে সতর্ক পদক্ষেপ দরকার। এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার আগেই অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন আনা এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ হলে অল্প সুদের ঋণ কমবে। তাই বেসরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ আনতে হবে। ন্যায়নীতিভিত্তিক নিরপেক্ষ নীতিমালা অর্থাৎ নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপরিহার্য। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটা ফলদায়ক। সম্পদ ব্যবহার ও উৎপাদনের মান বজায় রাখা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা— এই উভয় ক্ষেত্রে সক্ষমতার বিকল্প নেই। এজন্যে মানবসম্পদের উৎকর্ষ সাধন করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে যোগ্যতা-দক্ষতার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চীনের মতো দেশ বিদেশে কর্মরত মেধাবী প্রযুক্তিবিদ ও দক্ষ ব্যবস্থাপকদের দেশে ফিরিয়ে এনে সম্পদ-ব্যবহারে ঈর্ষণীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে। প্রতিবেশী ভারত ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের অগ্রগতিও এক্ষেত্রে লক্ষ করার মতো।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশ ২০২৭ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিভিন্ন ধাপ পার হতে হবে। আর এ সময়টা আগামী ৬ বছর অর্থাৎ ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এখানে ৩ বছরের একটি বর্ধিত সুবিধা থাকবে। তবে এই সুবিধার ওপর নির্ভর করে ন্যূনতম শৈথিল্য দেখানোর কোনো সুযোগ থাকবে না।

আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের একটি সফল অভিজ্ঞতা রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প খাতে। নানা সমস্যার মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে ওই সেমিনারে বলা হয়, যখন কোটাপ্রথা উঠে যায়, তখন বলা হয়েছিল এদেশের পোশাক শিল্প টিকবে না। বাংলাদেশ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তৈরি পোশাক খাতের এই অভিজ্ঞতার অনুশীলন আগামী ৬ বছর করতে হবে। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিবেচনায় সামাজিক খাতে অর্জিত প্রশংসনীয় সাফল্যের গতিও ধরে রাখতে হবে।

বাড়তি বিনিয়োগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারে সক্ষমতা, বর্ধিত উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্তমান সরকারের গতিশীল নেতৃত্বে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশস্ত ক্ষেত্রে উপনীত হবে বাংলাদেশ, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads