• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
শিক্ষকদের পেছনে গোয়েন্দা

শিক্ষকদের বিষয়ে তদন্ত চলছে

প্রতীকী ছবি

শিক্ষা

শিক্ষকদের পেছনে গোয়েন্দা

  • অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
  • প্রকাশিত ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভোটের মুখে ঢালাওভাবে শিক্ষকদের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের খোঁজখবর বেশি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কলেজ ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের অতীত কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। তদন্তে শিক্ষকের মা, বাবা, সন্তান, ভাইবোন, চাচা, মামা, শ্বশুর, শাশুড়ি, শ্যালক, স্বামী, দেবর, ননদ ও ভাশুরের তথ্য নেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ করে কেন এ খোঁজখবর, তার জবাব কেউ দিচ্ছেন না। সম্প্রতি বিষয়টি ফেসবুকের ‘প্রাথমিক শিক্ষক কণ্ঠ’ নামের একটি পেজে তুলে ধরে শিক্ষকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।

শিক্ষকদের বিষয়ে তদন্ত চললেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানেই না। পুলিশের ওসি পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা তদন্তের বিষয়টি স্বীকার করলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো ধরনের মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন। তদন্তে কী কী তথ্য সংগ্রহ করা হবে, এ নিয়ে ছক আকারে কোনো চিঠি না পেলেও পুলিশ বলছে, বেশ কয়েকটি কমন বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ওসি জানান, শিক্ষকদের সম্পর্কে যেসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও তার বাবার নাম-পরিচয়, স্থায়ী ও কর্মস্থলের থানার রেকর্ড, তিনি কোন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন, সেখানে রাজনীতি করেছেন কি-না, রাজনৈতিক মতাদর্শ, পরিবার বা নিকটাত্মীয়দের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ইত্যাদি।

জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বিষয়টি জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আপনার (প্রতিবেদক) কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। কাল (আজ বুধবার) অফিসে এসে খবর নেব। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের অন্তত পাঁচজন ওসি বলেছেন, তদন্তে শুধু শিক্ষকদেরই তথ্য নেওয়া হচ্ছে না, তার নিজের বাড়ি, শ্বশুর ও মামার বাড়ির তথ্যও নেওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য নিয়ে কী করা হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, তথ্য থানা থেকে পাঠানো হচ্ছে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে। সেখান থেকে চলে আসছে ঢাকায় স্পেশাল ব্রাঞ্চে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে তথ্যগুলো সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বিএনপি-জামায়াত করেন কি না, তার পরিবারের কেউ বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত কি না- এসব বিষয়ে খবর নেওয়া হচ্ছে।

জামালপুর সদরের মাছিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরুজ্জামান মনি গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা ৫৩ মিনিটে ফেসবুকের প্রাথমিক শিক্ষক কণ্ঠের পেজে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেন, ‘বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয় চাওয়া হচ্ছে! সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার সুযোগ আছে কি?’ তার এমন স্ট্যাটাসের পর বহু শিক্ষক তাতে মন্তব্য করেন। সেগুলো পড়ে দেখা যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষকদের বিষয়ে পুলিশ তথ্য নিচ্ছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশালের একজন শিক্ষক বলেছেন, তার তথ্য নিতে ত্রিশাল পুলিশ তাকে গত দুদিনে দুবার ফোন করেছে। পিরোজপুরের নাজিরপুর থেকে আশিষ হালদার নামে আরেকজন শিক্ষক বলেছেন, সেখানেও তথ্য নেওয়া শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে ত্রিশালের ওসি মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘ভাই আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। গত পরশু দিন আমি জামালপুর থেকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার ওসি হিসেবে যোগ দিয়েছি।’ জামালপুরে কি শিক্ষকদের নিয়ে তদন্ত শেষ- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামালপুরের ঘটনা বলতে পারব না। তবে আজকে (মঙ্গলবার) ত্রিশালে একজন শিক্ষক আমাকে ফোন করে বলেছেন- তার তদন্ত কি শেষ হয়েছে কি না? আপনি কি বললেন- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি কিছু বলিনি। কী বলব, বলুন তো?

পিরোজপুরের নাজিরপুর থানার ওসি সুলতান আহমদ বললেন, আমার নাজিরপুরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এতে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য নিয়ে রেখেছি। হঠাৎ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য কেন নিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভোট-ফোট কিছুই না। এলাকায় মাদক ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক কাজ করানোর জন্য তথ্য নিয়ে রেখেছি।

সিলেট বিভাগের একজন ওসি জানান, তার থানায় তদন্ত শেষ করে তথ্যগুলো জেলায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, শুধু প্রাথমিক নয়, মাধ্যমিক ও কলেজশিক্ষকদের বিষয়েও তথ্য নেওয়া হয়েছে। যেসব শিক্ষক কিংবা তার পরিবার বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জড়িত তাদের নাম চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের এক চিঠিতে দেখা গেছে, সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শিক্ষাজীবনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও তাদের পরিবার বা নিকটাত্মীয়দের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সব জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ সুপারকে। গত ২৭ জুন ইস্যু করা ওই চিঠিতে ১ জুলাইয়ের মধ্যে একজন ইন্সপেক্টর বা পরিদর্শক পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করতে এবং এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও সতর্কতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা-ইউএনও’রা প্রায় সবাই এটি জেনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কেউই।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সাধারণত সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার আগেই মনোনীত প্রার্থীদের বিষয়ে একটি তদন্ত করে পুলিশ। পুলিশ ভেরিফিকেশনে মূলত দেখা হয়, মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ বা মামলা আছে কি না কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে কি না।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads