• শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই

ছবি : সংগৃহীত

শিক্ষা

সরকারি অর্থ লুটের পাঁয়তারায় সংঘবদ্ধচক্র

নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ০৫ আগস্ট ২০১৯

শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই পাঠ্যপুস্তক তুলে দিয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। সরকার যেসব ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে তার মধ্যে অন্যতম বছরের প্রথম দিনই শিক্ষার্থীদের কাছে বিনামূল্যে পাঠ্য পৌঁছে দেওয়া। তবে এই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের কাগজে বই ছাপিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ লোপাটের চেষ্টা করছে সংঘবদ্ধ ও অসাধু চক্রটি। এর আগেও চক্রটি নিম্নমানের কাগজে বই ছাপিয়ে সরকারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।

২০২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন বই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এরই মধ্যে। নতুন বছরের শুরুতে প্রায় ৩৫ কোটি নতুন বই পাবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনেই বই উৎসব করে প্রাক্-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদরাসা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নতুন বই দেওয়া হবে। সরকারের চাহিদা মোতাবেক বিপুল পরিমাণ বই ছাপতে প্রায় ৬০ হাজার টন কাগজ দরকার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দরপত্র অনুযায়ী এ পর্যন্ত সরবরাহ করা কাগজের প্রায় ৬০ শতাংশই নিম্নমানের। শেষ পর্যন্ত এই পরিমাণ নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করা হলে প্রায় ২১ কোটি বই ছাপার জন্য নিম্নমানের কাগজ সরবরাহের পাঁয়তারা করছে একটি অসাধুচক্র।

আন্তর্জাতিক মান মোতাবেক একটি পাঠ্যবইয়ের কাগজে যে পরিমাণ ঔজ্জ্বল্য থাকা দরকার সেটি নেই। দরপত্রের কারিগরি নির্দেশনা ও নিয়ম মোতাবেক, উজ্জ্বলতা থাকা দরকার ৮৫ শতাংশ। কিন্তু রয়েছে মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। একইভাবে কাগজের পুরুত্ব (জিএসএম) ৬০ থেকে ৬৪ গ্রামের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও নমুনায় আছে অনেক কম। আর ব্যবহূত কাগজ কতখানি মজবুত, তার নির্দেশনাকারী ‘বার্স্টিং ফ্যাক্টর’ যেখানে ন্যূনতম ১২ শতাংশ থাকার কথা, তা আছে ৭ থেকে ৮ শতাংশ।

অসাধু চক্রটি সস্তা দামের এসব নিম্নমানের কাগজে নতুন বছরের বই ছাপানোর কার্যক্রম শুরু করেছে ইতোমধ্যে। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করতে পারবে ওই চক্রটি। ধারণা করা হচ্ছে, এতে প্রায় ৬০ কোটি টাকা তছরুপ হতে পারে। 

সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ শুরু হয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে যেসব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বই ছাপানোর কার্যাদেশ পেয়েছে তাদের অনেকেই কাগজ কিনতে শুরু করেছে। বস্তুত ভালো মানের উজ্জ্বল কাগজ কিনতে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা দরকার টনপ্রতি। কিন্তু অসাধু চক্রের কারসাজিতে এবার যে কাগজে ছাপানো পাঠ্যবই শিক্ষার্থীরা হাতে পাবে টনপ্রতি তার দাম ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রতি বছর নিজেরাই কাগজ কিনে কিছু মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করে থাকে বই ছাপানোর জন্য। এবারো এনসিটিবি আল নূর পেপার ও বোর্ড মিলস নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৪ হাজার টন কাগজ কিনছে। এর মধ্যে ৩০০ টন কাগজ এনসিটিবিকে সরবরাহও করেছে আল নূর। এনসিটিবি ইতোমধ্যে ওই কাগজ একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে বই ছাপার জন্য।

এনসিটিবির সরবরাহ করা ওই কাগজে বই ছাপানোর দায়িত্ব পাওয়া মৌসুমি প্রিন্টার্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যে কাগজ তাদের দেওয়া হয়েছে তার মান একেবারেই খারাপ। বিষয়টি তারা এনসিবিটিকে জানিয়েছে। তবে যেহেতু একটি শক্ত সিন্ডিকেট এখানে সক্রিয়, তাই অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে আল নূরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুল হককে টেলিফোন করলেও তিনি এমডি নন জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে আবার ফোন করলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

অবশ্য এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পাঠ্যবইয়ের মানের ব্যাপারে আমরা কোনো আপস করছি না। মান যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে তিন স্তরে। আমাদের নিজেদের টিম কাজ করছে। এছাড়া মান যাচাইয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, কোনো প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান যদি বলে থাকে নিম্নমানের কাগজ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের লিখিতভাবে জানালে আমরা অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে ছাপা বইয়ের লেখা অস্পষ্ট হতে পারে। ছাপানো ছবি থেকে কালি উঠতে পারে। স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের হাতে এমনিতেই বই বেশি ছিঁড়ে যায়। নিম্নমানের কাগজে ছাপা এ বই কতদিন টিকবে তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অসাধু চক্রের এই কারসাজির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আর সরকারকে পড়তে হবে প্রশ্নের মুখে।

কাগজ উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাগজ সরবরাহে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটে রয়েছে আল নূর, ইকো পেপার মিলস, ইথিক্যাল পাল্প ও পেপার লিমিটেড, বেস পেপারস লিমিটেড এবং বিসিএল পেপার মিলস লিমিটেডসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তারা পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের কাজ পাওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের পাঁয়তারায় সক্রিয় রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর সঙ্গে এনসিটিবির একটি চক্রও জড়িত। নিম্নমানের কাগজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তারা এসব কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করছে।

এদিকে অর্থের বিনিয়মে আবারো নিম্নমানের কাগজে বই হচ্ছে জানিয়ে এনসিটিবির এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন বেশ সক্রিয়। এখানেও দুদকের অভিযান জরুরি হয়ে পড়েছে। তাহলে সব অবৈধ কর্মকাণ্ড বেরিয়ে আসবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, বইয়ের মানের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব। এই ধরনের অনিয়ম শেখ হাসিনার সরকার কোনোভাবেই বরদাশত করবে না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads