• শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
ads

শিক্ষা

প্রভাবশালীদের প্রতাপ বেড়েছে

নিয়মিত চলছে প্রকৌশলী ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে হুমকি

  • জুবাইর উদ্দিন, (চবি)
  • প্রকাশিত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রায় ৫০০ একর জায়গা দখল করে প্রভাবশালীরা বানিয়েছিলেন বিশাল অট্টালিকা। কেউ বা আবার দোকানপাট। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৫০ বছর পর প্রভাবশালীদের দখল থেকে মুক্ত করে তৎকালীন প্রশাসন নির্মাণ শুরু করে বহুল প্রতীক্ষার সীমানা প্রাচীর। কিন্তু প্রশাসনের পালা বদলেই সেই প্রভাবশালীদের প্রতাপ আবারো বেড়েছে। শেষ পর্যায়ে এসে থমকে গেছে নির্মাণকাজ। বর্তমান প্রশাসন সমঝোতার কথা বললেও প্রশাসনের অবহেলায় অনুমতি না নিয়েই বিভিন্ন জায়গায় প্রাচীর ভেঙে ফেলেছেন তারা।

জানা গেছে, বেহাত হওয়া এই জমির পরিমাণ প্রায় ৫০০ একর। যার বাজার মূল্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে দীর্ঘ ১৩ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইখতেখার উদ্দিন চৌধুরী। এরপর থেকে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় ভূমিদস্যুরা সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ঠেকাতে উঠেপড়ে লাগে। তবে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে তৎকালীন প্রশাসনের শক্ত অবস্থানে এগিয়ে যাচ্ছিল সীমানা প্রাচীরের নির্মাণকাজ। কিন্তু সম্প্রতি উপাচার্য পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সীমানা প্রাচীর নির্মাণে আবারো বাধা দিচ্ছেন স্থানীয় ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা। নিয়মিতভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে প্রকৌশলীকে। বর্তমান প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে তার বেতনও। নিয়মিত হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কাজ পরিচালনায় অপারগতা প্রকাশ করে পত্র দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও।

যেসব জায়গায় ভাঙা হয়েছে সীমানা প্রাচীর : সরেজমিন নির্মিত সীমানা প্রাচীরের তিনটি স্থান ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হল এবং বন ও পরিবেশ বিদ্যা ইনস্টিটিউটের পাশে কিছু অংশ ভেঙে তৈরি করা হয়েছে চলাচলের গেট। এ ছাড়া শাহ আমানত ও শাহজালাল হলের সামনে ৭২১ থেকে ৭৪৭নং পিলারের মধ্যে সীমানা প্রাচীরের বেশিরভাগ লোহার গ্রিল খুলে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় এস্টেট শাখার প্রশাসক অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদ হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিদায়ী উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিনের সময়ে সিন্ডিকেটের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য সীমানা প্রাচীরের গ্রিল খুলে রাস্তা তৈরি করার অনুমতি দিয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রকৌশলীকে হুমকি, উল্টো প্রশাসনের শোকজ : চলতি বছরের ১৬ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানের অফিস কক্ষ ভাঙচুর ও মুঠোফোনে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার ও প্রক্টরকে মৌখিকভাবে অবহিত করেন ওই ভুক্তভোগী প্রকৌশলী। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে প্রধান প্রকৌশলীর পরামর্শে কিছুদিন অফিস করা থেকে বিরত থাকেন তিনি। ঘটনার ৯ দিন পর ‘নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অফিস করতে পারছেন না’ এ মর্মে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার বরাবর একটি চিঠিও দেন প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান। আবেদন পেয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে উল্টো অফিসে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি প্রদান করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের এমন হঠকারী সিদ্ধান্তকে নেতিবাচক বলে মনে করছেন অনেক সিনিয়র শিক্ষক। তারা বলেন, একজনের জীবন ঝুঁকিতে। তাকে নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো শোকজ করা দুর্ভাগ্যজনক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কমিটির সদস্য প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় আমার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু জমি উদ্ধার করা হয়। এটার জের ধরেই সম্প্রতি একটি চক্র আমার রুম ভাঙচুর করে তালা এবং মুঠোফোনে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে না আসার হুমকি দেয়। ঘটনার কয়েক দিন পর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত জানায়। এরপরও আমার জন্য কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়।’

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবশালীদের বাধা : সম্প্রতি সীমানা প্রাচীর নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এস অনন্ত বিকাশ ত্রিপুরার প্রতিনিধিদের নির্মাণকাজে বাধা দিয়ে হুমকি দিয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছেন। একই সঙ্গে চলতি বছরের ৭ জুলাই সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কার্যক্রমে বিভিন্নভাবে একাধিকবার হুমকির শিকার হয়েছেন তারা।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ঠিকাদার জামাল খাঁন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রথম থেকে আমরা স্থানীয়দের বাধার সম্মুখীন হয়েছি। সম্প্রতি স্থানীয়রা কাজ না করতে হুমকিও দেয়। তাই আপাতত সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ এখন বন্ধ রেখেছি। কর্তৃপক্ষ বিষয়টা মীমাংসা করলে আমরা কাজ শুরু করব।’

প্রশাসনের বক্তব্য : সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কার্যক্রম সম্পর্কে প্রকৌশলী আবু সাঈদ হোসেন বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণকাজের বরাদ্দকৃত অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণ কার্যক্রমে বাধার বিষয়টিও সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার বলেন, ‘যারা সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কার্যক্রমে বারবার বাধা দিচ্ছে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমঝোতা করে সমাধানের চেষ্টা করছি। আশা করছি, অতি শিগগিরই বিষয়টি সমাধান করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করব।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads