• মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬
ads
রাবি উপ-উপাচার্যের দরকষাকষির ফোনালাপ ফাঁস

সংগৃহীত ছবি

শিক্ষা

শিক্ষক নিয়োগ

রাবি উপ-উপাচার্যের দরকষাকষির ফোনালাপ ফাঁস

  • রাবি প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ০২ অক্টোবর ২০১৯

শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়ার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে-যেখানে তিনি সাদিয়া সম্বোধন করে একটি মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। মেয়েটির সঙ্গে নূরুল হুদা নামে একজনকে চাকরি নিয়ে দরকষাকষি করতে শোনা গেছে উপ-উপাচার্যকে। তবে সেখানে টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

জানা গেছে, উপ-উপাচার্যের সঙ্গে ফোনালাপ করা সাদিয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। সম্প্রতি রাবির আইন বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চাকরিপ্রার্থী ছিলেন তার স্বামী ও আইন বিভাগের সাবেক (বিভাগের ৩৪ ব্যাচের) শিক্ষার্থী নূরুল হুদা। তিনি আইন বিভাগ থেকে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে অনার্সে ৩.৬৫ ও মাস্টার্সে ৩.৬০ সিজিপিএ পেয়ে পাস করেন। আইন অনুষদে সেরা হওয়ায় ২০১৭ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক এবং ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পান। তার বাড়ি উপ-উপাচার্যের এলাকা লালমনিরহাটে।

এখানে ফোনালাপটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো-

উপ-উপাচার্য চৌধুরী জাকারিয়া : হ্যাঁ সাদিয়া, আমি প্রফেসর জাকারিয়া, প্রোভাইস চ্যান্সেলর।

সাদিয়া : আসসালামু আলাইকুম স্যার।

উপ-উপাচার্য : ওয়ালাইকুম আসসালাম। আচ্ছা মা, একটা কথা বল তো। আমার খুব শুনতে ইচ্ছা, এখানে তোমরা কত টাকা দেওয়ার জন্য রেডি আছো?

সাদিয়া : স্যার সত্যি কথা বলতে...

উপ-উপাচার্য : না না, সত্যি কথাই তো বলবা। ওপরে আল্লাহতায়ালা, নিচে আমি। 

সাদিয়া : অবশ্যই, অবশ্যই। স্যার, আপনি যেহেতু তার অবস্থা জানেন, আরেকটা বিষয় এখানে স্যার। সেটা হচ্ছে, আপনি হুদার...মানে, এমনিতে সে কতটা স্ট্রিক্ট...। আপনি বোধহয় এটাও জানেন স্যার, একটু রগচটা ছেলে।

উপ-উপাচার্য : আচ্ছা রাখো, এখান থেকে কথা বলা যাবে না।

রেকর্ডের বিষয়ে জানতে উপ-উপাচার্য জাকারিয়াকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এম এ বারীকে ফোন করা হলে তিনি জানান, যেখানে ভিসি, প্রোভিসি রয়েছেন, সেখানে আমি কোনো মন্তব্য করব না। নূরুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আপনারা সাংবাদিক, অনেক কিছুই জানেন। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।

উপ-উপাচার্য ফোন রিসিভ না করলেও এ বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার লিখিত এক বক্তব্যে বলেন, নূরুল হুদা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার ছাত্রজীবনের শুরু থেকে আমি স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে দেখভাল করছি। তার লেখাপড়ার চলমান রাখতে তাকে দুটি স্কলারশিপেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পারি সে চাকরি পেতে অসাধু কিছু ব্যক্তির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছে। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে ইসলামী ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার একটি স্লিপও আমার নজরে আসে। স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে তার এহেন কর্ম রোধে খোঁজ নেওয়ার জন্যই তার স্ত্রীকে ফোন দিয়েছিলাম। কারণ হুদার স্ত্রীর বাড়ি সৈয়দপুরে। হুদার স্ত্রী সে সময় ব্যাংক লেনদেনের বিষয়টি স্বীকারও করে বিস্তারিত বলতে রাজি হয়নি। ফাঁস হওয়ার অডিও এডিট করা হয়েছে বলেও দাবি করেন উপ-উপাচার্য জাকারিয়া।

জানা যায়, সম্প্রতি ওই বিভাগে প্রভাষক পদে তিনজন শিক্ষকের নিয়োগ হয়েছে। যার বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চে এবং ওই বছরের ১৩ নভেম্বর নিয়োগের ভাইবা অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ নভেম্বর সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ অনুমোদিত হয়। পরদিন ১৮ নভেম্বর নিয়োগপ্রাপ্তের উপ-উপাচার্যের মেয়ের জামাই সাইমুন তুহিন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম ঠাণ্ডুর মেয়ে নূর নুসরাত সুলতানা ও রাবির আইন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী বনশ্রী রানী বিভাগে যোগদান করেন। নুসরাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছে। এই তিনজনের চেয়ে বেশি পয়েন্ট থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ পাননি মোহাম্মদ নূরুল হুদা।

৫ সদস্যবিশিষ্ট ওই নিয়োগ ভাইবা বোর্ডে সভাপতি ছিলেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান। এ ছাড়া সিনেট সদস্য রুস্তম আলী, বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শাহাজান মণ্ডল এবং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল হান্নান ও উপ-উপাচার্য।

এ বিষয়ে অধ্যাপক শাহাজাহান বলেন, ওই নিয়োগের ভাইবা হওয়ার দু’একদিন আগ থেকে রাবির কয়েকজন শিক্ষক আমাকে সজাগ থাকতে বলেন। নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন হতে পারে বলে তারা জানিয়েছিলেন। স্বর্ণপদক পাওয়া নূরুল হুদাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হলো জানতে চাইলে বলেন-অনেক দিন আগের বিষয় তো, ভুলে গেছি।

জানা গেছে, নূরুল হুদার নিয়োগ না হওয়ার বিষয়টি জানার পর ওই সময় কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্য নিয়োগপ্রাপ্তদের জীবনবৃত্তান্ত খোঁজ নিতে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রেজিস্ট্রার তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, হুদা নিয়োগ না পাওয়ায় আমরা বিস্মিত হই। যে তিনজন প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্য তাদের বিষয়ে তথ্য চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রেজিস্ট্রার জানান, ওই ফাইলগুলো ক্লোজ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ৫৫ সেকেন্ডের ওই অডিও ফাঁস হওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। উপাচার্যের দেশবিরোধী বক্তব্য ও উপ-উপাচার্যের অডিও ফাঁস থেকে প্রমাণ হয়-এরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যর্থ। এদের পদত্যাগের দাবি জানান তারা। বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তৈরি করা হয়। সেখানেও যদি নিয়োগ বাণিজ্য চলে, তবে এর চেয়ে লজ্জার কিছু হতে পারে না। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের ডাক্তার থেকে শুরু করে কয়েকটি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সেখানেও বিশাল অঙ্কের দুর্নীতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া রাকসুর অর্থের কোনো হিসাব নেই। সার্বিকভাবে এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ঘোলাটে পরিবেশ তৈরি করেছে। এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে অতিদ্রুত সব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে যাবে বলেও জানান তারা।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads