• বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
বুয়েট ভিসি শর্ত ভঙ্গ  করেও বহাল

বুয়েট ভিসি ড. সাইফুল ইসলাম

ফাইল ছবি

শিক্ষা

বুয়েট ভিসি শর্ত ভঙ্গ করেও বহাল

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১২ অক্টোবর ২০১৯

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে স্পষ্টভাবে উপাচার্যের (ভিসি) সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভিসি ড. সাইফুল ইসলাম থাকেন বাইরে নিজের পছন্দের বাসায়। সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলেও ভিসি তার কার্যালয়ে আসেন দুপুরে। এ ছাড়া ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আড়াই বছরে তিনি বিদেশ সফর করেছেন ২২ বার। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা নিতে শুধু দৌড়ঝাঁপই নয় আদালত পর্যন্ত যেতে হয়।

ভিসি ড. সাইফুল ইসলামের অদক্ষতা ও ব্যর্থতায় মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। তারা বলছেন, ভিসির স্বেচ্ছাচারিতার জন্য ভেঙে পড়েছে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলাও এখন প্রশ্নের মুখে। আবরার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বুয়েট নিয়ে সারা বিশ্বে যে বার্তা পৌঁছে গেছে তার পরিণতি আরো দীর্ঘদিন ভোগ করতে হবে। আর এর পুরো দায় ভিসি ড. সাইফুল ইসলামের। রোবরাত রাতে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। রাত ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত চলে তার ওপর নির্যাতন। ঘটনাটি অবহিত করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। অনেকে বলছেন, ভিসিও নিশ্চয়ই অবগত হয়েছিলেন।

রাত ২টায় আবরারের নিথর দেহ বাইরে ফেলে রাখে খুনিরা। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। চিকিৎসক এসে জানিয়েছিলেন নির্মম পিটুনির শিকার আবরার আর বেঁচে নেই। তারা ভিসিকে ফোনে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ড. সাইফুল সন্তানতুল্য ছাত্রটির জন্য ঘটনাস্থলে আসার গরজ অনুভব করেননি। বরং তিনি ফোনেই কর্মকর্তাদের সমাধান বাতলে দেন। বলেন, এটি পুলিশ কেস। পুলিশই ব্যবস্থা নেবে। হ্যাঁ, পুলিশ কেস বলেই হয়তো আবরারকে যখন পেটানো হচ্ছিল তখন পুলিশ হলের গেটে বসে অপেক্ষা করছিল। তারা কার নির্দেশ এবং কি পরিস্থিতির অপেক্ষায় ছিল এর জবাব ভিসির কাছ থেকেই চাইছেন আন্দোলনকারীরা। সেদিন রাত পেরিয়ে সকাল হলেও ঘুম ভাঙেনি ভিসি সাইফুল ইসলামের। ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখটির জানাজায় যখন সারিবদ্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তখনো গরহাজির তিনি। নানা সূত্র থেকে বলা হলো তিনি অসুস্থ তাই বাইরে আসতে পারছেন না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মুখেও এমনটি শোনা গেল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জনসমক্ষে ওই দিনই দাবি করেন ভিসি অসুস্থ নন। আবরার হত্যাকাণ্ডের রেশ সুপার সনিক গতিতে ছড়িয়ে পড়ে দেশময়, পুরো বিশ্বে।

একজন বিনয়ী, মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন নিষ্ঠুর মৃত্যুতে নাড়া দিয়েছে প্রতিটি হূদয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘটনার দিন সকাল থেকেই ঘটনার খোঁজখবর নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। ভিসির রহস্যময় নিরবতায় তিনিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ঘটনার প্রায় ৪০ ঘণ্টা পর ভিসি ক্যাম্পাসে প্রকাশ হন। শিক্ষার্থীদের সামনে এসে তিনি নিজেই জানান, অসুস্থ ছিলেন না বরং মন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেই তিনি এই সময় কাটিয়েছেন। মুখে না বললেও এ কারণেই যে তিনি ক্যাম্পাসে আসতে পারেননি এটিই তিনি ইঙ্গিত করেন। ভিসি এলেন না তাতে কি। আবরার যে ততক্ষণে ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়। ক্ষোভ আর প্রতিবাদের উত্তাল দেশ। এই ক্ষোভের বাতাস যে অনেকটা তার দিকেই ধেয়ে আসছে এটিও টের পেলেন ভিসি।

এত ঘটনার রেশ ধরেই বুয়েট ভিসির পদত্যাগ দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শিক্ষার্থীদের কারো কারো মুখে ওঠে এমন দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দাঁড়িয়ে এমন দাবি তোলেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। কিন্তু যিনি নীতি আর নিয়মের ধার ধারেন না তার কাছে এমন দাবি হয়তো নিছকই দাবি। তাই অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। তাই পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না।

ভিসি এমন দাবি করলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ অবশ্য পুরো পরিস্থিতির দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই দিয়েছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বুয়েটে এমন পরিস্থিতি এক দিনে আসেনি। আগে যদি কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিত, তাহলে আজকের পরিস্থিতি দেখতে হতো না।

বুয়েট এ্যালামনাই’র দাবি একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাকে ওই অনুষ্ঠানে অতিথি করা হলেও তিনি জাননি। বুয়েট এ্যালামনাই’র বর্তমান সভাপতি প্রখ্যাত স্থপতি ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি এ ঘটনার বিষয়ে চরম বিরক্তি ও খেদ প্রকাশ করেন তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে।

এদিকে গত ১৩ জুলাই শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বেশিরভাগ ফাইল সিদ্ধান্তহীনতার কারণে এক থেকে দুই বছর পড়ে থাকে। প্রশাসন স্থবির। প্রভাষক নিয়োগ দিতে সেমিস্টার শেষ হয়ে যায়। ভিসি নিয়মিতভাবে দুপুর সাড়ে ১২টার পর অফিসে আসেন। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভা হয় না। সাড়ে তিন বছরে মাত্র ১৪টি সিন্ডিকেট সভা হয়েছে। তার প্রশাসনিক অদক্ষতায় সাড়ে ২৪ কোটি টাকার তহবিল  ফেরত যায়। তারই অন্যায্য সিদ্ধান্তে ২১ জন শিক্ষক ও ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পেনশন আটকে যায়। হাইকোর্ট, আপিল বিভাগে ও রিভিউতে হেরে যাওয়ার পরও তিনি সহজে রায় মেনে নিতে চাননি। ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সমিতির সভার রেজ্যুলেশনেও এমন অনেক বিষয় তুলে ধরা হয়। শিক্ষকদের দাবি ভিসি আড়াই বছরে ২২ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads