• শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
কনডেনসেট নিয়ে হরিলুট

ছবি : সংগৃহীত

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি

কনডেনসেট নিয়ে হরিলুট

নিম্নমানের জ্বালানি দিয়ে রেহাই

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২০ জুন ২০১৯

গ্যাসক্ষেত্রের কনডেনসেট (গ্যাস উৎপাদনকালে উঠে আসা বিশেষ তরল) নিয়ে হরিলুট চলছে। সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ও পেট্রোবাংলার উদাসীনতায় বিপুল লোকসান হচ্ছে গ্যাসক্ষেত্রে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে শৃঙ্খলা ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টের সামগ্রিক লোকসান নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ কী পরিমাণ কনডেনসেট নিয়ে কী পরিমাণ পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন হবে, তার একটি নির্ধারিত হিসাব থাকতে হবে। অন্যথায় হরিলুট বন্ধ করা যাবে না।

জানতে চাইলে সরকারের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেমা মো. রহমাতুল মুনিম বাংলাদেশের খবরকে গতকাল বলেন, অনেক চেষ্টার পর কনডেনসেট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরেছে। তবে তদারকি থাকতে হবে। তদারকির ঘাটতি হলেই শৃঙ্খলা থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে সতর্ক। নীতিমালা আছে। তবে সেটি যাতে মেনে চলে প্রতিষ্ঠানগুলো, তার জন্য সরকারের কার্যক্রম থাকতে হবে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আলাপকালে বলেন, বেসরকারি কনডেনসেট প্লান্টগুলো প্রতি মাসে বিপিসিতে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে পৃথক লস (লোকসান) উল্লেখ করা হচ্ছে। প্লান্টভিত্তিক লস হিসাব করে পরিপত্র জারি করা দরকার, যাতে সেই হিসাবে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে বিপিসি।

এই কর্মকর্তা আরো বলেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে কনডেনসেট মজুত কমে যাবে। তাই এখন নতুন করে বেসরকারি কোনো রিফাইনারি প্লান্ট অনুমোদন করা যাবে না। এ ছাড়া জ্বালানির মান উন্নত করতে সরকারি-বেসরকারি সব ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টকে নির্দেশ দেওয়া জরুরি।

জানা গেছে, বর্তমানে কনডেনসেট থেকে যে পেট্রোল ও ডিজেল বিপিসি পাচ্ছে, তার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিএসটিআই মানে পেট্রোলের অকটেন নম্বর ৮৭। আর ডিজেলের সিটেন নম্বর ৪৫। কিন্তু রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রাপ্ত এই দুটি পণ্য বিএসটিআই মানের অনেক নিচে। কনডেনসেট থেকে প্রাপ্ত পেট্রোলের অকটেন নম্বর ৮০-এর মধ্যে বিরাজমান। আর ডিজেলের সিটেন নম্বর ৩৫ থেকে ৪০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা নির্ধারিত মানের নিচে। বিপিসি আমদানি করা উচ্চমানের ডিজেলের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিজেল মিশিয়ে মান রক্ষা করে থাকে। তবে পেট্রোলের ক্ষেত্রে এটি করা সম্ভব নয়।

সরকারি সক্ষমতা বাড়াতে গাজীপুরের রশীদপুর কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট কেন শতভাগ পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন করা হচ্ছে না- এই প্রশ্নে সচিব বলেন, আমি মনে করি এটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ এটি দীর্ঘদিন ধরে চললেও পরিশোধন ক্ষমতার ১০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে না। কিন্তু বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে এখানে।

সূত্রগুলো বলছে, গ্যাসের সঙ্গে মাটির গভীর থেকে উঠে আসে এই কনডেনসেট। এগুলো কিছুটা পরিশোধন করলেই পেট্রোল কিংবা ডিজেল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পেট্রোবাংলা এসব কনডেনসেট সরকারি ও বেসরকারি রিফাইনারি প্লান্টগুলোকে সরবরাহ করে থাকে। রিফাইনারি প্লান্টগুলো কনডেনসেট পরিশোধন না করে সরাসরি বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে বিক্রি করে দেয়। রিফাইনারিগুলো পেট্রোবাংলা থেকে প্রতি লিটার ৪২ টাকা দরে সংগ্রহ করে থাকে। আর কালোবাজারে এগুলো পেট্রোল কিংবা ডিজেলের দামেই বিক্রি করে বড় আকারের মুনাফা করে যাচ্ছিল রিফাইনারিগুলো। কিন্তু শর্ত মোতাবেক, রিফাইনারি প্লান্টগুলো কনডেনসেট পেট্রোল ও ডিজেলে রূপান্তর করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) সরবরাহ করার কথা।

কিন্তু বছরের পর বছর তদারকির অভাবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। ফলে সরকারের অর্থ লোকসান হয়েছে। এ ছাড়া মানহীন জ্বালানি গাড়িতে ব্যবহার হয়েছে। এতে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের এক অনুসন্ধানে এই বড় অনিয়ম বেরিয়ে আসে। বিষয়টি এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত গড়িয়েছে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে দৈনিক উৎপাদিত কনডেনসেটের পরিমাণ ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার ব্যারেল। এই কনডেনসেট থেকে পেট্রোবাংলার ৮টি ইউনিট ও ইস্টার্ন রিফাইনারিকে দৈনিক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার ব্যারেল থেকে ৬ হাজার ব্যারেল। আর বেসরকারি খাতে এরই মধ্যে ১৪টি কনডেনসেট রিফাইনারি প্লান্টের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেগুলো এরই মধ্যে পরিশোধন কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে একটি রিফাইনারি প্লান্ট সরকারের সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে পড়েছে। সেটিকে আর কনডেনসেট সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে ১৩টি প্লান্ট উৎপাদিত কনডেনসেটের অর্ধেক বরাদ্দ পাচ্ছে। সে হিসাবে বেসরকারি প্লান্টগুলো পাচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার ব্যারেল। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের বড় দুটি রিফাইনারি পেট্রোম্যাক্স ও সুপার পেট্রোকেমিক্যাল সাড়ে ৪ হাজার ব্যারেল কনডেনসেট পাচ্ছে। আর বাকি ১১টিকে প্রতিদিন অবশিষ্ট অংশ দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে কী পরিমাণ কনডেনসেট নিয়ে বিপরীতে কী পরিমাণ পেট্রোল ও ডিজেল বিপিসিকে দিতে হবে, তার পরিমাণ নির্ধারণ করা আছে। সে মোতাবেক বিপিসি জ্বালানি নিচ্ছে। তবে বিপিসির মত, কারিগরি সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকার কারণে অনেক রিফাইনারি মান অনুযায়ী পেট্রোল জোগান দিতে পারছে না। এ ছাড়া এসব রিফাইনারিতে কনডেনসেট লোকসান হচ্ছে বেশি। প্লান্ট মালিকরা এর দায় নিতে চাচ্ছেন না। এতে সরকারের লোকসান হচ্ছে। তাই সামগ্রিক লোকসান নির্ধারণ করতে হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। লস হিসাব করে এ ব্যাপারে একটি পরিপত্র জারি করতে হবে। তা না হলে রিফাইনারিগুলোর টালবাহানা শেষ হবে না। তারা অজুহাত দেখিয়ে যতটা ফাঁকি দেওয়া যায়, সেটি দিয়ে যাবে।

সরকারিভাবে গাজীপুরের রশীদপুর প্লান্টটির পরিশোধন ক্ষমতা ১ লাখ ৬৫ হাজার টন। আর ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা হচ্ছে ৬০ হাজার টন। গত মাসের ১৯ তারিখ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কনডেনসেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে একটি উপকমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি এরই মধ্যে স্থায়ী কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উঠে আসা সুপারিশগুলো পরিপালন করতে তা এখনো মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads