• রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৫
ads
আর কত অগ্নিকাণ্ড, কত লাশ...

ছবি : সংগৃহীত

মুক্তমত

আর কত অগ্নিকাণ্ড, কত লাশ...

  • প্রকাশিত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মানুষের মৃত্যু কখন হয় বলা যায় না, কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু হয় যেটি কাঙ্ক্ষিত নয়; তেমনি এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে সারি সারি লাশ দেখতে হয়েছে জাতিকে। একটি অগ্নিকাণ্ডে নিমিষেই জীবন্ত মানুষগুলো পুড়ে কঙ্কাল হয়ে গেল। অগ্নিকাণ্ডের কিছুক্ষণ পর আমার এক সহকর্মী ফোনে জানায়, ঢাকার চকবাজারে আগুন লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যেই টিভি এবং বেশ কয়েকটি অনলাইনের পর্দায় চোখে পড়ল বিভীষিকাময় দৃশ্য। প্রথমে মনে হলো আগুন লাগা তো নতুন খবর নয়; এদেশে প্রায় প্রতিদিন ঘটছে এমন ঘটনা। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই সারি সারি লাশের মিছিল। একের পর এক উদ্ধার হচ্ছে নিথর ঝলসানো দেহ। স্বজনদের আহাজারিতে সারা দেশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

আমাদের আর মনেই হয় না একটি মানুষের মৃত্যু মানে শুধু তার চলে যাওয়া নয়; পাশাপাশি একটি পরিবারের সারা জীবনের হাহাকার রচিত হয়। অথচ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পাটের গুদাম পুড়েছিল বলে বঙ্গবন্ধু নিজে দৌলতপুরে গিয়ে পোড়া পাট ধরে কেঁদেছিলেন। কিন্তু এখন এত যে মানুষ মারা যায়, কে রাখে তাদের খবর? কয়েক ঘণ্টা কাঁদিয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায় মানুষ। আমরা একবারো ভাবি না, ক্রমাগত অগ্নিকাণ্ডের ফলে দেশের শুধু ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতিই হচ্ছে না, জীবন্ত মানুষগুলো মারা যাওয়ায়ও অনেক ক্ষতি হচ্ছে পরিবারের ও দেশের।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে অনেক। যার হিসাব করলে খাতা শেষ হয়ে যাবে। আমরা দেখেছি নিমতলী ট্র্যাজেডি, দেখেছি তাজরীন ফ্যাশন ট্র্যাজেডি। ঢাকা অগ্নিকাণ্ড বা তাজরীন ফ্যাশন অগ্নিকাণ্ড ঘটে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর। সংঘটিত ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মোট ১১৭ জন পোশাকশ্রমিক নিহত হয়। ভয়ানক এই দুর্ঘটনায় ওই পোশাক কারখানার নয়তলা ভবনের ছয়তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১০১ জন পোশাকশ্রমিক। আগুন থেকে রেহাই পেতে উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আরো ১০ জনের। এ উপলক্ষে ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশে শোকদিবস পালিত হয়। ২০১০ সালের জুনে পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক কারখানায় আগুন ধরে ১২৪ জন নিহত হয়েছিলেন। এরপর পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের কারখানা বা সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তাহলে কীভাবে চকবাজারে রাসায়নিকের গুদাম থাকতে পারে? নিষেধাজ্ঞার পরেও অনেকে গোপনে রেখে ব্যবসাবাণিজ্য করে। কর্তৃপক্ষের অগোচরে কাজ করে তারা। কিন্তু এর পরিণতি হচ্ছে এ ধরনের ঘটনা। ফায়ার সার্ভিসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ৮৮ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রাণহানি হয়েছে ১ হাজার ৪০০ জনের, আহত হয়েছেন অন্তত ৫ হাজার।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালেই সারা দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ১৯ হাজার ৬৪২টি। এতে নিহত হন ১৩ জন, আহত হয়েছেন ৬৬৪ জন। ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ১০৫টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, এতে নিহত হন ৪৫ জন, আহত হন ২৬৯ জন। ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ৮৫৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হন ৫২ জন, আহত হন ২৪৭। ২০১৫ সালে ১৭ হাজার ৪৮৮টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ৬৮ জন, আহত ২১৬ জন। ২০১৪ সালে ১৭ হাজার ৮৩০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হন ৭০ আর আহত হয়েছিলেন ২১০ জন। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৭৮ হাজার ৯৫টি, নিহত ১ হাজার ১২৫ জন, আহত ৫ হাজার ৩৩৫ জন। ২০০৪ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নিহত হন ৪৮০ জন এবং আহত হন ৩ হাজার ৬৮৪ জন।

হিসাবের খাতা দীর্ঘ হলেও আমাদের টনক নড়ে না। এসব অগ্নিকাণ্ড সরকারের একার পক্ষে দূর বা কমানো সম্ভব নয়। ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও দায়িত্ব রয়েছে সবার। পরিকল্পিত শহর গড়তে যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি শহর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দায়িত্বও সরকারের পাশাপাশি সবার। শহরে রাস্তা এবং বিল্ডিংগুলো পরিকল্পিত হলে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও হয়তো এত প্রাণহানি হতো না। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারলে খুব তাড়াতাড়ি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারত। এখনই সময় আমাদের সতর্ক ও সচেতন হওয়ার। আমরা চাই না এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক, চাই না এ ধরনের প্রাণহানি হোক। চাই পরিকল্পিত শহর, চাই পরিকল্পিত নগর এবং পরিকল্পিত ভবন। দূর হোক অবৈধ কারখানাগুলো। সরকার কঠোর হাতে দমন করবে- এটাই প্রত্যাশা করছি।

 

শফিকুল ইসলাম খোকন

লেখক : স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads