• মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
শিল্পায়ন ও বেকার সমস্যা

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

শিল্পায়ন ও বেকার সমস্যা

  • শাহ আহমদ রেজা
  • প্রকাশিত ০৮ মে ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠিত হওয়ার পর জনগণের নানামুখী আকাঙ্ক্ষা যেমন বেড়েছে, তেমনি শুরু হয়েছে সম্ভাবনা সম্পর্কিত আলোচনাও। সঙ্গত কারণেই এসব আলোচনায় প্রাধান্যে রয়েছে অর্থনীতি। আলোচনায় আসছে বিশেষ করে চাকরি তথা কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের মতো বিষয়গুলো।

প্রথমে কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে বলা দরকার। দেশে বেকারের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে, বেকার সমস্যা দিন দিন আরো মারাত্মক হচ্ছে। কোনো কোনো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে এমনকি একথা পর্যন্ত বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে বেকার তথা কর্মহীন মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটিরও বেশি। শুধু তা-ই নয়, মোট কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি জানিয়ে এসব রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ প্রবেশ করে। কিন্তু সাত লাখের বেশি মানুষ কোনো চাকরি বা উপার্জন করার মতো কোনো কাজ পায় না। ফলে প্রতি বছর ১৫ লাখ করে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, একদিকে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। তাছাড়া আট শতাংশের বেশি হারে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির যে তথ্য শোনানো হচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন ও সংশয় তো রয়েছেই। পাশাপাশি এ সত্যও প্রমাণিত হয়েছে যে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে চাকরির তথা কর্মসংস্থানের সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ জিডিপির কথিত প্রবৃদ্ধি চাকরির সুযোগ সৃষ্টির ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে না। একই কারণে প্রবৃদ্ধির কথিত হার নিয়েও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তথ্যাভিজ্ঞরা মনে করেন না যে, প্রবৃদ্ধির বিষয়ে সঠিক তথ্য জানানো হচ্ছে। উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়ার নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গেই প্রাধান্য পেয়েছে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্য-পরিসংখ্যান। মাত্র মাসখানেক আগে, গত ৭ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক রিপোর্টে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আট দশমিক ১৩ শতাংশ হবে বলে সরকার যে আশার কথা শুনিয়েছে, সেটা বাস্তব বিভিন্ন কারণেই সম্ভব নয়। বলা দরকার, নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব পেলেও জিডিপির প্রবৃদ্ধিসহ জাতীয় অর্থনীতির মৌলিক প্রায় সব ব্যাপারেই দেশকে এখনো সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দায়ভারই টানতে বা বহন করতে হচ্ছে। একই কারণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্পর্কিত অভিমতের মূলকথা তথা ব্যর্থতার জন্যও দায়ভার চাপানো হচ্ছে মিস্টার মুহিতের ওপরই।

কেন আট দশমিক ১৩ শতাংশ হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে না— তার প্রধান কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধির হিসাব জানানো হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে নিকট অতীতে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়নি, এখনো হচ্ছে না। উল্টো প্রতি বছর চাকরির বাজারে আসছে আট লাখ কর্মক্ষম মানুষ। এ প্রসঙ্গে অবশ্য অন্য রকমের পরিসংখ্যান তথা ভিন্নমতও রয়েছে। যেমন একটি গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ প্রবেশ করে। কিন্তু সাত লাখের বেশি মানুষ কোনো চাকরি বা উপার্জন করার মতো কাজ পায় না। ফলে দেশে প্রতি বছর ১৫ লাখ করে বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ এগিয়ে যাওয়ার নামে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও স্থায়ী চাকরি বা কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগই সৃষ্টি হচ্ছে না। ফ্লাইওভার এবং মেট্রোরেলের মতো বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ব্যয়িত অর্থের কিছু অংশও যদি শিল্প-কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে একদিকে অসংখ্য মানুষের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হতো, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও উৎপাদনসহ রফতানি আয়ের দিক থেকে দেশও অনেক এগিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকার শিল্প-কারখানা স্থাপনে কোনো বিনিয়োগ করেনি, এখনো করছে না। সরকার বরং এমন সব খাতেই বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, যেগুলোর মাধ্যমে স্থায়ী চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে কমে আসার পরিবর্তে বেড়ে চলেছে বেকার মানুষের সংখ্যা।

অন্যদিকে পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল কিন্তু আট দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে ঘোষণা করেছেন। পূর্বসূরি মিস্টার মুহিতের রেখে যাওয়া হিসাবের ভিত্তিতে মন্ত্রী একই সঙ্গে জানিয়েছেন, চলতি বছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেড়ে এক হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে— যা গত অর্থবছরে নাকি ছিল এক হাজার ৭৫১ ডলার। অর্থমন্ত্রী বললেও পাঠকরা ভেবে দেখতে পারেন, গত অর্থবছরে দেশের ঠিক কতজন মানুষ এক হাজার ৭৫১ ডলার আয় করতে পেরেছেন। কারণ প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্য গড়ে ৮২ টাকা ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৪৩ হাজার ৫৮২ টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ গড়ে ১১ হাজার ৯৫৬ টাকা আয় করেছে বলে অর্থমন্ত্রী যে দাবি করেছেন, সেটা আদৌ গ্রহণযোগ্য কি-না তাও ভেবে দেখা দরকার। চিন্তা ও বিশ্লেষণের একই দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও না ভেবে উপায় থাকে না যে, চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু আয় বেড়ে এক হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব কি-না। কারণ সেক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষের মাসিক আয় দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৪৪ টাকা!

এ প্রসঙ্গেই এসেছে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের প্রশ্ন। কারণ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট বিনিয়োগ শুধু যে হয়নি তা-ই নয়, গণমাধ্যমের রিপোর্টে বরং বারবার বলা হয়েছে, ‘বিনিয়োগের খরা’ কোনোভাবেই কাটছে না। ২০১৭ সালের জুন-জুলাইয়ের দিকে বিনিয়োগ একেবারে তলানিতেও এসে ঠেকেছিল। এ অবস্থা ছিল দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগের উভয় ক্ষেত্রেই। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডা’র উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, ওই অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ৫১০টি প্রতিষ্ঠান মোট ৩৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করিয়েছিল। এই পরিমাণ পূর্ববর্তী তিন মাস তথা আগের বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের চাইতে ৩১ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা কম।

মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বিনিয়োগ প্রস্তাব ৩১ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। উদ্বেগের কারণ হলো, বাস্তবে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে এখনো কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার ফলেও দেশের ভেতরে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। এখনো হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও। বিশিষ্টজনদের মতে অবকাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়া এবং জমি রেজিস্ট্রি করার প্রক্রিয়ায় ঘুষ-দুর্নীতি ছিল বিনিয়োগ না হওয়ার বড় কারণ।

অথচ চাকরির সুযোগ সৃষ্টিসহ জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য শিল্পায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর শিল্পায়নের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। বিভিন্ন সমস্যার কারণে দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তারা তো বটেই, বিদেশি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে উৎসাহ দেখাতে পারছেন না। বলা দরকার, দেশের ভেতরে বিনিয়োগ বাড়লে এবং উৎপাদনসহ বাধাহীন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে নিশ্চয়তা পেলেই সাধারণত বিনিয়োগের জন্য বিদেশিরা এগিয়ে আসেন। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই চরম হতাশাজনক অবস্থা বিরাজ করছে।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যাভিজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, একদিকে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। তাছাড়া আট শতাংশের বেশি হারে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির যে আশার কথা শোনানো হচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন ও সংশয় তো রয়েছেই, পাশাপাশি এ সত্যও প্রমাণিত হয়েছে যে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে চাকরির তথা কর্মসংস্থানের সমন্বয় করাও সম্ভব হয়নি। একই কারণে প্রবৃদ্ধির কল্পিত হার নিয়েও প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

এভাবে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, দেশে বেকার সমস্যা আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার মূল কারণ বিনিয়োগ না হওয়া। দেশীয় পুঁজিপতি বা শিল্প মালিকরা কোনো কারখানায় বিনিয়োগ করার পরিবর্তে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণখেলাপিদের সংখ্যা, যাদের আবার মাফ করে দেওয়ার ঘোষণাও আসছে! সব মিলিয়েই বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। এই অবস্থা দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগের উভয় ক্ষেত্রেই বিরাজ করছে।

এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দরকার সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যই চেষ্টা চালানো। বিশেষ করে দরকার বিদেশে টাকা পাচার প্রতিহত করার পদক্ষেপ নেওয়া। সরকারকে একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার জন্যও ব্যবস্থা নিতে হবে, আগ্রহী শিল্প উদ্যোক্তারা যাতে সহজে শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে এবং নির্বিঘ্নে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে পারেন। বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কট কাটিয়ে ওঠারও পদক্ষেপ নিতে হবে। সব মিলিয়ে এমন অবস্থা সৃষ্টি করা দরকার, যাতে বিনিয়োগের ‘খরা’ কেটে যায়, দেশে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণ ফিরে আসেনি। তেমন অবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই দেশে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেকারের সংখ্যা নিয়ে যেমন অসত্য তথ্য জানাতে হবে না, তেমনি প্রবৃদ্ধির কল্পিত হার নিয়েও কেউ সংশয় প্রকাশ করবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও ইতিহাস গবেষক

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads