• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
ads
আমাদের চিকিৎসাসেবা

ছবি : সংগৃহীত

মুক্তমত

আমাদের চিকিৎসাসেবা

  • প্রকাশিত ৩০ মে ২০১৯

রিফাত মাহদী

 

 

চিকিৎসাসেবা একটি মহৎ পেশা। জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তানরাই এটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ পায়। মানুষ যখন অসুস্থতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছে দোয়া করে আর চিকিৎসকের ওপর আস্থা রাখে। অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে ডাক্তারের মুখের দিকে। মনে হয় যেন সৃষ্টিকর্তার পরে ডাক্তারই তার সর্বশেষ আস্থার ঠিকানা। অনেক ডাক্তার তার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টাও করেন। কিন্তু বর্তমানে ভালো ডাক্তারের সংখ্যা যেমন অনেক, তেমনি অসাধু ডাক্তারের সংখ্যাও কম নয়। যারা রোগীর চেয়ে নিজের স্বার্থকেই বড় করে দেখেন। ছোটবেলায় যখন হাসপাতালে যেতাম, তখন ডাক্তার দেখিয়ে বের হয়ে দেখতাম শার্ট, প্যান্ট, টাই পরে কিছু লোক বাইরে অপেক্ষমাণ। ডাক্তার দেখিয়ে যিনিই আসেন ওই ভদ্রলোকেরা তার প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে দেখেন কী কী ওষুধ দিলেন ডাক্তার। অনেক সময় প্রেসক্রিপশনের ছবিও তুলে রাখতেন তারা। তখন ভাবতাম তারা হয়তো ডাক্তারি শিখছেন। কিন্তু অনেক পরে জানলাম, এরা ওষুধ কোম্পানির নিয়োগকৃত লোক যে কোম্পানিগুলোর সাথে ডাক্তাররা চুক্তিবদ্ধ।

ওষুধের মান খারাপ জেনেও অসাধু ডাক্তাররা তাদের ওষুধগুলো লিখছেন। এর বিনিময়ে ডাক্তারদের বাসায় টিভি, ফ্রিজ, এসিসহ বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রী দিয়ে আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমানে কোনো রোগের জন্য ডাক্তার দেখাতে গেলে, ব্যাগবোঝাই করে টাকা নিয়ে বের হতে হয়। কেননা রোগীর দিকে একটু তাকিয়েই তাকে লম্বা টেস্টের লিস্ট ধরিয়ে দেন শ্রদ্ধেয় ডাক্তার। রোগীর সুবিধার জন্য ওই টেস্টগুলো কোথায় করাবে সেটাও বলে দেন ডাক্তার। এর বিনিময়ে ল্যাবরেটরিগুলোর পক্ষ থেকে ডাক্তার মশাইয়ের জন্য কিছু হাদিয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ইদানীং আমাদের দেশে আইসিইউ ব্যবসা বেশ রমরমা। রোগী গেলেই আইসিইউতে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা কাজ করে অসাধু ডাক্তারদের মধ্যে। বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইসিইউতে লাশ বাণিজ্যের অভিযোগও আছে। মানুষ মরে যাওয়ার পরও বেঁচে আছে বলে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে লাশ আটকে রেখে ওরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অথচ ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অধিকাংশ ক্লিনিকগুলোতেই মানসম্মত যন্ত্রপাতি নেই।

বর্তমানে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ান সেকশনের বাণিজ্যও বেশ জমে উঠেছে। শহরকেন্দ্রিক কিছু কিছু প্রসূতি মায়েরা ঝুঁকছে এই দিকে। আবার ব্যবসায়ী ডাক্তাররাও গর্ভবতী মাদের বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সিজার করার দিকে ধাবিত করছে। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসব হলে মা ও নবজাতক উভয়ই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে। সন্তান অপুষ্টিতে ভোগে। এমনকি পরবর্তী প্রসবে সন্তানের অপরিণত হওয়া কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে। অপুষ্টির কারণে অনেক সময় সন্তানকে প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিতেও দেখা যায়। সিজারিয়ানে সন্তান প্রসব হলে ডাক্তার অনেক টাকা হাতিয়ে নিতে পারে। আর সিজারিয়ানে বাচ্চা হলে মায়ের সুস্থ হয়ে উঠতে সময় বেশি লাগায় হাসপাতাল ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষেরও সুবিধা। তারা বেড ভাড়া কিংবা বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের অজুহাতে হাতিয়ে নিতে পারে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা।

শুধু বেসরকারি হাসপাতাল নয়, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও চলছে বিভিন্ন মাধ্যমের বাণিজ্য। এক শ্রেণির দালালচক্র সরকারি হাসপাতালে সিট বাণিজ্য করছে। এদের টাকা দিলে আগে সিট পাওয়া যায়। আবার সরকারি হাসপাতালের কিছু অর্থলোভী ডাক্তার কর্মঘণ্টার তোয়াক্কা না করে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই চলে যায় প্রাইভেটে রোগী দেখতে। যার ফলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে বঞ্চিত হতে হয় ভুক্তভোগী রোগীকে। অথচ এসব ডাক্তারকেও মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করছে। কারণ তাদের কাছে আমদের হাত-পা বাঁধা। কোথায় গেল জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তানদের মানবতা? কোথায় আজ তাদের বিবেক? চিকিৎসাসেবা যেহেতু মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি, তাই সরকারকেই এটির প্রাপ্তি নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। সরকারের হস্তক্ষেপে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ন, কঠোর নজরদারি ও তদারকির মাধ্যমে এ ধরনের অসৎ বাণিজ্য প্রতিরোধ করা অসম্ভব কিছু নয়।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads