• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
ads
নারী কোথাও নিরাপদ নয়

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

নারী কোথাও নিরাপদ নয়

  • রহিমা আক্তার মৌ
  • প্রকাশিত ১২ জুন ২০১৯

ইবনে সিনা হাসপাতালে নার্স হিসেবে চাকরি করত কিশোরগঞ্জের শাহিনূর। পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে বাড়ির উদ্দশে রওনা হয়। টিকেট কাটে এয়ারপোর্টের পাশে স্বর্ণলতা বাস কাউন্টার থেকে। সেই টিকেট কাটাই কাল হয়ে গেল তার জীবনে। বাসে উঠে বাবা বা ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। রাত সাড়ে আটটার দিকে বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলে তখনো তার ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। জানায় পাঁচ-সাত মিনিট লাগবে পৌঁছতে। কিন্তু কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে বাসের সব যাত্রী নেমে যায়। এ সময় বাসের ড্রাইভার ও হেলপার কৌশলে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড থেকে চার-পাঁচজনকে যাত্রীবেশে গাড়িতে তোলে।

কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে দুই কিলোমিটার দূরে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের গজারিয়া জামতলীর একটি নির্জন এলাকায় পৌঁছলে তারা শাহিনূরকে চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ করে এবং গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে বলে স্বজনরা ধারণা করছেন। তার মৃত্যুর পর ধর্ষণকারীরা রাত পৌনে এগারোটার দিকে কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে দুর্ঘটনার কথা বলে লাশ ফেলে রেখে যায়। ড্রাইভার ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনার জের খুব একটা এগোবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ আমাদের আইনের ঘরে যেভাবে মাকড়সা বাসা বেঁধেছে তা সরে যাওয়া এত সোজা নয়।

প্রায়ই বলি— ‘সব পুরুষ মানুষ নয়, তবে সব পুরুষ কিন্তু পুরুষই।’ আজ আবার বলতে বাধ্য হচ্ছি, নারী নারীই— সে মানুষ নয়, মানুষ হলে তার জন্যে একটা নিরাপদ ঘর থাকত, নিরাপদ পথ থাকত, নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকত, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র থাকত, নিরাপদ যাতায়াত হতো। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। দেশের প্রতিটি লড়াইয়ে তারা অংশগ্রহণ করে। দেশের হেড চেয়ারে নারীর অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও আজ আমাদের বলতে হচ্ছে নারীর নিরাপত্তা কোথাও নেই। তবে কি নারীর অগ্রযাত্রা শুধুই লোক দেখানো?

তেজগাঁও থেকে সাভার যাওয়ার পথে সেদিন বাসের শেষ যাত্রী ছিলাম আমরা চারজন। বাসে আরো আছে দুই পুরুষ। সাভার রেডিও কলোনিতে নামব আমরা। হঠাৎ চোখ পড়ে মাঝামাঝি সিটে ২০-২২ বছরের বোরকা পরা একটি মেয়ে ঝিমুচ্ছে। নজর পড়তেই ডাক দিই। সে যাবে বিশমাইল। রেডিও কলোনিতে আমাদের সঙ্গে সেই দুই পুরুষ নামলে বাসের একমাত্র যাত্রী ওই মেয়েটি। নিজেই মেয়েটিকে নামিয়ে নিয়ে আসি। রিকশাওয়ালাদের বিশমাইল যাওয়ার কথা বললে তারা বলে, ‘রিকশায় যাওয়া নিরাপদ হবে না, উনাকে লোকাল বাসে তুলে দিন।’ তাই ওকে অন্য লোকাল বাসে উঠিয়ে দিই। বাসায় ফিরছি আর ভাবছি, আমার অসচেতনতায় হয়তো পরের দিন মিডিয়ার নিউজ হতো একা পেয়ে ২০-২২ বছরের মেয়েটিকে বাসে... থাক আর বলতে পারছি না।

দেশে গণপরিবহনগুলোতে ৯৪ ভাগ নারীযাত্রী মৌখিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। নিপীড়িতদের অধিকাংশই প্রতিবাদ করেন না আরো হয়রানি হওয়ার ভয়ে। ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপরিবহনে নারীর সুরক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে নিচে। শ্রীলঙ্কায় ৯০ এবং পাকিস্তানে ৮৫ শতাংশ নারীযাত্রী গণপরিবহনে নিপীড়নের শিকার হন। এই চিত্র কতটা ভয়াবহ এই অবস্থান দেখে স্পষ্ট। এই জঘন্য অপরাধ যে মাত্রায় বেড়েছে, লাগাম টেনে না ধরা গেলে তা সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেবে।

গণপরিবহন নারীদের জন্য মোটেই আর নিরাপদ নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংগঠনের পরিসংখ্যানেও বিষয়টি স্পষ্ট। সর্বশেষ যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ১৩ মাসে গণপরিবহনে ২১ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি নারীর চলার পথের প্রশস্ততা। বাড়েনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদযাত্রা বেড়েছে মানেই নারীকে বের হতে হচ্ছে, হবে। কিন্তু চলার পথ যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে এই পদযাত্রা পঙ্গু হয়ে পড়বে। সংসারের নানা ধরনের প্রয়োজনে নারীদের ঘরের বাইরে বের হতেই হয়। তাদের বেশির ভাগের যাতায়াতের মাধ্যমই গণপরিবহন। অথচ আমাদের সেই গণপরিবহনে যাতায়াত করতে গিয়ে তারা প্রতিনিয়ত হেনস্তা ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। হেনস্তা ও যৌন হয়রানির জন্যে পুরুষ যাত্রীরা তো আছেনই, পাশাপাশি চালক ও সহকারীরা একা নারীযাত্রী পেলেই হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।

গণপরিবহনে নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছেন না নারীরা। বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়ন সাপেক্ষে নারীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দে গণপরিবহন ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। মূলকথা এটাই, বিচার বিভাগের দুর্বলতাই নারীদের চলার পথ নির্বিঘ্ন করতে পারছে না। গণপরিবহনে মেয়েদের চলাচল নিরাপদ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে অপরাধ তদন্তে ও অপরাধীদের বিচারাধীন করায় পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তার সঙ্গে সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে ব্যক্তি-সংগঠনকে।

গত বছর মে মাসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় গণপরিবহনে নারী নির্যাতন বন্ধে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি রেবেকা মমিনের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় এ সুপারিশ করা হয়। কমিটির সদস্য এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, বেগম ফজিলাতুন নেসা, মিসেস আমিনা আহমেদ এবং মনোয়ারা বেগম অংশগ্রহণ করেন। সভায় গণপরিবহনে নারী নির্যাতন বন্ধে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং তা মনিটর করা, চালক ও তাদের সহযোগীদের ইউনিফরম বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সভায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সব ধর্মের পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতাবিষয়ক একটি পৃথক অধ্যায় প্রস্তুতপূর্বক আগামী শিক্ষাবর্ষেই সংযোজন করার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিশু একাডেমিকে পরামর্শ দেওয়া হয়।

সভায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাস্তবায়নাধীন উপজেলা পর্যায়ে মহিলাদের আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ (আইজিএ) প্রকল্প, নগরভিত্তিক প্রান্তিক মহিলা উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আগামী অর্থবছরের (২০১৮-১৯) বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মন্ত্রণালয় ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন। অথচ বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

মিরপুর থেকে ছেড়ে আসা শাহবাগ হয়ে মতিঝিলের একটি বাসে উঠি। ড্রাইভারের সামনে একটি সাইনবোর্ড দেখি, তাতে ড্রাইভার, হেলপার ও কন্ডাক্টরের নাম, মোবাইল নম্বর দেওয়া। দেখে কিছুটা হলেও ভালো লেগেছে। এর আগেও এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে বলেছি, প্রতিটি বাসের ড্রাইভার, হেলপার ও কন্ডাক্টরের গলায় পরিচয়পত্র রাখার নিয়ম হোক। কিন্তু গণপরিবহনে চালক ও সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনো নিয়ম মানা হয় না। মালিকপক্ষ তাদের ইচ্ছামতো পরিবহন শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। গাড়িতে চালক ও সহকারী নিয়োগের বিষয়টি শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। তাদের নিয়োগপত্র দিতে হবে, যেখানে বিভিন্ন শর্তের উল্লেখ থাকবে। তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে এবং অতীতের কর্মকাণ্ড যাচাই করে ছবি ও দরকারি সব তথ্য নিয়ে তবেই নিয়োগ দিতে হবে, যাতে কোনো অপরাধ করলে তাদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

সদ্যপ্রয়াত সাংবাদিক ও শিক্ষক মাহফুজ উল্লাহ তার এক লেখায় বলেন, ‘বাংলাদেশের নারীরা কোথায় নিরাপদ? ঘরে-বাইরে, পরিবারে, লোকালয়ে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা এখন বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন। এই নিরাপত্তাহীনতার অবসান কীভাবে ঘটবে, এ প্রশ্নের জবাব কেউ জানে না। রাজনৈতিক স্লোগানে বাংলাদেশের নারীর জীবন অনেকাংশে নিশ্চিত হলেও বাস্তব চিত্রটি পুরোপুরি আলাদা। এখানে ভিন্নমতের প্রতীকে ভোট দেওয়ার কারণে নারী গণধর্ষিত হয়, সামান্য কারণে শিকার হয় হিংসার। নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সমাজের বিভিন্ন পরিমণ্ডলে বিভিন্নভাবে আলোচিত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি সমাজে বহুল আলোচিত; কিন্তু অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনা করে তর্কে জেতা যাবে হয়তো, সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত নারীর প্রতি সহিংসতার সংখ্যা বাড়ছে। সম্প্রতি আইন ও সালিশ কেন্দ্র প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার ৬৩ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন। প্রতিদিন নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। সিনেমার পর্দায় ট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্তক ছবি দেখলে মনটা ক্ষণিকের জন্য খারাপ হয়। কিন্তু এই সমাজে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটছে; সেসব ঘটনা আমাদের আন্দোলিত করে না।’

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছর পরও নারীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি রাষ্ট্র। অথচ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭-এ বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ পশ্চাৎপদ নারী জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংবিধানের ২৮(১), (২), (৩) এবং (৪) ধারায় নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এটাই কাম্য।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads